পোয়ারোর কাছে উঠে এলেন এলসা, চেপে ধরে কোটের হাতটা, বললেন, একটু বোঝার চেষ্টা করুন আপনি…আপনাকে করতেই হবে। আমি অ্যামিয়াস–আমরা ভীষণ ভালোবাসতাম দুজন দুজনকে…একটা জিনিস আপনাকে দেখাচ্ছি দাঁড়ান।
একটা ঘরের কোণের টেবিলের দেরাজ টেনে দোমড়ানো মোচড়ানো একটা চিঠি গুপ্ত খোপ থেকে নিয়ে এলেন এলসা। বিবর্ণ হয়ে গেছে কালিটা। উদ্ধত, প্রতিহিংসাপরায়ণা একটি মেয়ের মতো মুখ ভার করে পোয়ারোর হাতে গুঁজে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন এলসা ডিটিশাম।
পোয়ারো খুললো চিঠিটা। এলসা-স্বপ্নের খুকু সোনা আমার। পৃথিবীতে বোধহয় তোমার চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। কিন্তু আমি তবুও ভয় পাচ্ছি–অনেক বয়স হয়ে গেছে আমার-মাঝ বয়সী আমি একটা রাগী মানুষ স্থিরতা বলতে আমার মধ্যে কিছুই নেই। ভরসা রেখো না আমার ওপর, বিশ্বাস করো না আমাকে–আমি ভালো নই একটুও–শুধু ছবি আঁকা ছাড়া। ওটাই একমাত্র ভালো দিক আমার। অতএব তুমি কোনোদিনও বলতে পারবে না আমাকে যে তোমাকে সাবধান করে দিইনি।
রূপসী আমার যাই হোক না কেন, আমার চাই-ই তোমাকে, প্রয়োজনে যে আমি শয়তানের দ্বারস্থ হতেও রাজী তা জানো নিশ্চয়ই তুমি। এমন একটা ছবি আঁকবো তোমার যাতে মাথা ঘুরে যাবে মাথামোটা মানুষগুলোর,আমি পাগল তোমার জন্যে–ঘুমোতে পারছি না, ভালো লাগছে না খেতে।
এলসা…এলসা..এলসা…চিরকালের জন্যে আমি তোমারই…আমি মৃত্যুতেও তোমার। অ্যামিয়াস।
ষোল বছর আগেকার লেখা, বিবর্ণ হয়ে গেছে কালি, ছিঁড়ে পড়ার জোগাড় পাতাটা, অথচ জীবন্ত ভাষাটা, যেন থরথর করে কাঁপছে প্রাণশক্তিতে…
পোয়ারো তাকালো এলসার দিকে, কিন্তু না, কোনো নারীকে চোখের সামনে দেখতে পেল না। দাঁড়িয়ে আছে তার বদলে প্রেমে পড়া একটি বালিকা। আবার পোয়ারোর মনে পড়ে গেলো জুলিয়েটের কথা।
.
নবম অধ্যায়
কিছুই জোটেনি এই ছোট্ট শূয়োর ছানার–
কিন্তু কেন, মিঃ পোয়ারো তা কি জানতে পারি আমি?
কি উত্তর হওয়া উচিত প্রশ্নটার পোয়ারো চিন্তা করতে লাগলো, একজোড়া ধূসর রঙের তীক্ষ্ণ চোখ যে লক্ষ্য করে চলেছে তাকে এটা বুঝতে পারছিলো।
পোয়ারো বিরাট একটা ফ্ল্যাট বাড়ির ওপর তলায় এসেছে। এখানে ছোট্ট ছোট্ট এক কামরার ফ্ল্যাট। ঐ এক চিলতে ঘরের মধ্যে রান্না করা, খাওয়া-বসা, শোয়া, সবই করা হয়। এতো সুন্দর করে তারই মধ্যে সাজিয়ে রেখেছেন, যে মনে মনে মিস সিসিলিয়া উইলিয়ামসকে তারিফ না করে পোয়ারো থাকতে পারলো না। সুন্দর রঙ লাগানো। দেওয়ালে কিছু নাম করা ছবির কপি ঝুলছে। পারিবারিক ফটোও আছে, তবে ঝাপসা হয়ে এসেছে সেগুলো।
কার্পেট, ফার্নিচার সবেরই দৈন্যদশা, সিসিলিয়া উইলিয়ামস খুব অভাবের মধ্যে আছেন বুঝতে অসুবিধে হলো না।
আবার তীক্ষ্ণ ও সুস্পষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে উঠলো মিস উইলিয়ামসের, আমার যা মনে আছে ক্রেল মামলা সম্বন্ধে সেটা জানতে চান আপনি? কিন্তু কেন?
এরকুল পোয়ারো সম্বন্ধে তার বন্ধু-বান্ধবদের ধারণা যে নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে তার ডাহা মিথ্যে কথা বলতে বাধে না। অথচ সে অন্যরকম সিদ্ধান্ত নিলো এক্ষেত্রে। মিস উইলিয়ামস হলেন সেই ধরনের জবরদস্ত ইংরেজ গভর্নেস যারা অসাধারণ এক কর্তৃত্বের অধিকারী। এবং অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়া তাদের যায় না।
ফলে বই লেখার মিথ্যে কথাটা পোয়ারো না বলে আসল উদ্দেশ্যটা সরাসরি সংক্ষেপে বললেন।
মিস উইলিয়ামস মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনলেন, খুব ইচ্ছে করছে মেয়েটার কথা শুনতে, কেমন হয়েছে ও, কতো বড়টি হয়েছে জানতে ইচ্ছে করছে।
দেখতে হয়েছে ভারী সুন্দর, সাহস আর মানসিক দৃঢ়তাও সমান আছে।
ভালো, মিস উইলিয়ামস সংক্ষেপে উত্তর দিলেন।
জেদীও আছে একটু, একবার ধরে যেটা তার শেষ না দেখে ছাড়ে না।
গভর্নেস চিন্তা করতে করতে প্রশ্ন করলেন, শিল্পীভাব ওর মধ্যে আছে কি?
মনে হয় না।
মিস উইলয়ামস নীরস ভাবে বললেন, একটা ব্যাপারে অন্ততঃ থাকা গেলো নিশ্চিন্ত।
যে মহিলার শিল্পীদের সম্বন্ধে বিরূপ মনোভাব আছে সেটা বোঝা গেল এই কথা থেকে।
আবার একটু থেমে বললেন, মনে হচ্ছে আপনার বর্ণনা থেকে তার মায়ের মতোই দেখতে হয়েছে।
খুব সম্ভব। আপনি হয়তো ওকে দেখলে বলতে পারবেন। দেখতে চান নাকি?
দেখতে তো নিশ্চয়ই চাই। চেনাজানা মেয়ে এককালের এখন কতো বড়ো হয়ে উঠেছে দেখতে মন চায় বৈকি। যখন শেষ দেখি ওকে তখন ওর বয়েস মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর। দেখতে ছিলো ভারী মিষ্টি, শান্ত, বড় বেশি খেলনা নিয়ে খেলতো নিজের মনে। নিষ্পাপ, সরল শিশু ছিলো।
বলতে হবে ভাগ্য ভালো, তার ভীষণ কম ছিলো বয়েসটা, তা না হলে সহ্য করতে পারতো না ঐ মানসিক আঘাতটা। কিন্তু একটা ঘটেছে ও এটা বুঝতে পেরেছিলো। তবে নিশ্চয়ই সঠিকভাবে কিছুই জানতে পারেনি। বাচ্চাদের পক্ষে ওগুলো তো সুখের নয়।
মিস উইলিয়ামস বললেন, যতোটা ভাবছেন আপনি ততোটাতো নাও হতে পারতো।
কার্লা লেমারচেন্ট…আলোচনা ছোট্ট কার্লা ক্রেলের বিষয়টা নিয়ে শেষ করার আগে একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করবো যদি কেউ বলতে পারে তা আমার ধারণা তবে সে আপনিই।
বলুন? জানবার ইচ্ছেটা প্রবল কথার মধ্যে।
পোয়ারো নিজের বক্তটাকে বোঝাবার জন্যে হাত নেড়ে বলতে শুরু করলো, একটা খুব মুগ্ধ তারতম্য আছে, তবে আমি তা ঠিক মতো বুঝতে পারি না।
