আর তা না করলে, একটু খোঁচা মারলো পোয়ারো।
থেকে যায় সব কিছুই তো…আগের মতোই ঠিক..যদি জোর করে একবার বেরিয়ে আসা যায় সব বাধা ছিঁড়ে। পেরেছিলাম আমি। তাই আমার কাছে ওটা ততো আর বড় হয়ে ওঠেনি। চিন্তা করে দেখেছিলাম আমি এগিয়ে যেতে হবে আমাকে পরের ধাপে পা ফেলে।
হ্যাঁ, পরের ধাপ। বুঝতে পারলো পরিষ্কার পোয়ারো এই মহিলা পরের ধাপে পা ফেলেছেন প্রচণ্ড মানসিকতা দৃঢ়তা নিয়ে। মহিলা এখনও সুন্দরী, পুরুষের মনোহারিণী, তীক্ষ্ণ নখ নিয়ে শিকারী পাখির মতো আঁকড়ে ধরে জীবনের যে অংশটা শূন্য হয়ে গিয়েছিলো হঠাৎ তা ভরিয়ে তুলতে চাইছেন। বীর পূজা–বিয়ে হয়েছিলো নাম করা বৈমানিকের সঙ্গে। বিখ্যাত একজন অভিযাত্রী। অ্যামিয়াস ক্রেলের মতো নিশ্চয়ই ছিলেন আরনল্ড স্টিভেনসন। অন্ততঃ শরীর স্বাস্থ্যে-সৃজনধর্মী শিল্পী এলেন তারপরেই ডিটিশাম।
এলসা ডিটিশাম বললেন, কখনও ভণ্ডামি দেখা যায়নি আমার মধ্যে। আমি ভীষণ পছন্দ করি স্পেন দেশের প্রবাদ বাক্যটা–বলেছেন ঈশ্বর, চাও যা গ্রহণ করো, এবং মূল্য দাও তার যথোচিত, তা সারা জীবনে আমিও করে এসেছি। যা পেয়েছি চেয়েছি, আর সব সময়ে তার মূল্য দিতে আমি প্রস্তুত।
এরকুল পোয়ারো বললো, সেটা আপনার জানা নেই, তা হলো এই যে অনেক এমন জিনিস আছে যা কেনা যায় না টাকা দিয়ে।
পোয়ারোর দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন, বললেন, শুধু টাকা পয়সার কথা আমি কিন্তু বলিনি।
না, না, আমি বুঝেছি সেটা। তবে এমন অনেক জিনিস পৃথিবীতে আছে সেগুলো বিক্রি করার জন্যে নয়।
বাজে কথা।
পোয়ারোর ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠলো, হঠাৎ বড়লোক হয়ে উঠলে কারখানার শ্রমিকের যে ঔদ্ধত্য ফুটে ওঠে, এলসার গলায় ফুটে ওঠে সেই সুরটাই।
পোয়ারোর মনের আকাশে নেমে এলো বিষাদের ছায়া–এক রূপসী নারী সামনেই বসে, তাকে কলুষিত করতে পারেনি কালের হস্তাবলেপ, অথচ অসীম ক্লান্তির ছাপ চোখের দৃষ্টিতে সে আর যেন জীবনের ভার বইতে পারছে না। অ্যামিয়াস ক্রেল এই মেয়েটিরই ছবি এঁকেছিলেন।
এলসা ডিটিশাম বললেন, আপনার বইয়ের কথা শুনি, বলুন। লিখছেন কেন, কি উদ্দেশ্যটা।
কি বলি বলুন তো…সাড়া জাগানো অতীতের ঘটনাকে বর্তমানের মাদক রসে জারিত করে পরিবেশন করা ছাড়া আর অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে?
কিন্তু লেখক তো আপনি নন? না অপরাধতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ।
তার মানে লেখকরা অপরাধ সংক্রান্ত বই লিখতে গেলে পরামর্শ নেন আপনার?
সব সময়ে না। দায়িত্ব এক্ষেত্রে কাঁধে চেপেছে।
কে চাপিয়েছে?
মানে, একজনের ইচ্ছাপূরণ করার জন্যেই বলা যেতে পারে যে বইটা প্রকাশ করার চেষ্টা চলছে।
সেই একজন কে?
মিস কার্ল লেমারচেন্ট।
মেয়েটি কে?
অ্যামিয়াস আর ক্যারোলিন ক্রেলের মেয়ে।
এলসা একমুহূর্ত চেয়ে রইলেন হাঁ করে, ও হা, মেয়ে একটা ছিলো বটে। মনে পড়ছে। তা এখন সে তো বড় হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, একুশ বছর।
দেখতে কেমন হয়েছে?
বেশ লম্বা, গাঢ় রং মার মত সুন্দরী এবং সাহস আর ব্যক্তিত্ব তার দুইই আছে।
একটু চিন্তা করে এলসা বললেন, দেখা করতে ইচ্ছে করছে ওর সঙ্গে।
আপনার সঙ্গে মেয়েটি দেখা না করতে চাইতে পারে।
চমকে উঠলেন এলসা। কেন? ও বুঝেছি। বাজে ব্যাপার যতোসব। ওর মনে তো ওসব কথা না থাকাই উচিত। ওর বয়স তখন তো দু বছরেরও বেশি ছিলো না।
জানে মেয়েটি তার মায়ের বিচার হয়েছিলো তার বাবার হত্যাকারী হিসেবে।
আর ধারণা ওর আমারই দোষটা?
সেটাই তো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা।
কাঁধ নাচালেন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে, কখনো এরকম বেওকুফির কথা শুনিনি। যদি সামান্য বুদ্ধি দিয়ে ক্যারোলিন কাজ করতো…।
তাহলে আপনার কোনো দায়িত্ব নেই আপনি বলছেন।
কেনই বা থাকবে? আমি লজ্জা পাবার মতো কিছুই করিনি। আমি ভালোবাসতাম অ্যামিয়াসকে, ওকে চেয়েছিলাম সুখী করতে।
এলসা দূর মনস্কের মতো তাকালেন পাল্টে গেলো মুখের ভাব। ছবির এলসা গ্ৰীয়ারের চেহারাটা পোয়ারোর সামনে ভেসে উঠলো। বলে উঠলেন হঠাৎ, আপনাকে যদি দেখতে পারতাম; ব্যাপারটা যদি আপনি আমার তরফ থেকে দেখেন, তাহলে দেখতেন…।
ঝুঁকে বসলো পোয়ারো আর আমি ঠিক সেইটাই করতে চাই। এই দেখুন না, মিঃ ফিলিপ ব্লেক, তখন তো উনি বর্তমান ছিলেন, উনি তখনকার একটা খুঁটিনাটি বিবরণ কষ্ট করে লিখে দিচ্ছেন আমাকে। মিঃ মেরিডিথ ব্লেকও দেবেন বলেছেন। আপনি এখন যদি…।
এলসা ডিটিশাম জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে ব্যঙ্গ করে বললেন, ওই দুজন! এক নম্বরের হাঁদা ছিলেন ফিলিপ আর সব সময়ে ক্যারোলিনের পাশে ঘুর ঘুর করতেন মেরিডিথ। তবে ভালো মানুষটি। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা সম্বন্ধে ওঁদের লেখা থেকে কিছুই আপনি জানতে পারবেন না।
লক্ষ্য করতে লাগলো পোয়ারো। এলসার মধ্যে কীভাবে আবার সঞ্চার হচ্ছে প্রাণের, জ্বলজ্বল হয়ে উঠছে চোখ দুটো। হঠাৎ বললেন ভয় পাইয়ে দেবার মতো করে, আপনি সত্যি কথাটা জানতে চান? না, না, বই লেখার জন্য নয়, শুধু নিজের জন্যে আপনার…।
কিছুই প্রকাশ করা হবে না আপনার বিনা অনুমতিতে।
আমার নিজেই সত্যি কথাটা লিখতে ইচ্ছে করছে; উত্তেজিত হয়ে উঠলেন বলতে বলতে এলসা ডিটিশাম, যদি পুরোনো দিনের কথা লিখতে হয়…লিখবো…দেখাবো আপনাকে যে খুন করেছিলো ক্যারোলিনই। বাঁচতে চাইতো অ্যামিয়াস। উপভোগ করতে চাইতো জীবনটা। ঘৃণা কখনই ভালোবাসার চেয়ে বড় হয়ে ওঠা উচিত নয়। অথচ এটা হয়েছিলো ক্যারোলিনের ক্ষেত্রে এবং আমিও ঘৃণা করি ওকে এর জন্যে…ঘৃণা করি…ঘৃণা করি…।
