লেডি ডিটিশাম একটু চিন্তা করতেই শুরু করলেন। হঠাৎ পোয়াবোর তাই দেখে মনে হলো অত্যন্ত খোলামেলা মনের মহিলা এলসা। মিথ্যে কথা প্রয়োজনে বলতে পারেন, আদৌ ইচ্ছাকৃতভাবে নয়।
ধীরে ধীরে এলসা বললেন, না, কষ্ট হবে না। তবে বোধহয় হলে ভালো হতো…।
কেন?
ধৈর্য্যের বাঁধ যেন এলসা ডিটিশামের ভেঙে পড়লো, বললেন, কত বেদনার অনুভূতি না থাকাটা…।
এবং মনে হলো এরকুল পোয়রোর হ্যাঁ, মরে গেছে এলসা গ্ৰীয়ার।
অবশ্য মুখে বললো, লেডি ডিটিশাম যাই হোক, এতে কিন্তু বেশ সহজ হয়ে উঠবে আমার কাজটা।
এলসা খুশি মনে প্রশ্ন করলেন, আপনি কী জানতে চান?
ম্যাডাম আপনার স্মৃতিশক্তি তো ভালোই?
ভালো বলেই তো মনে হয় মোটামুটি।
এবং আপনি পুরানো দিনের কথা তুললে কষ্ট পাবেন না এটাও ঠিক তো?
না হবে না। মানুষ তো ব্যথা পায় ঘটনাগুলো ঘটার সময়েই। পরে নয়।
…কিছু কিছু লোকের জানি তাই হয় বলে।
কিছুতেই এডওয়ার্ড এ কথাটার মানে বুঝতে চায় না আমার স্বামী। ওর ধারণা মামলা, বিচার আর ঐসব ব্যাপারগুলো দারুণ ক্ষতির ছিলো আমার পক্ষে।
ছিলো নাকি?
উত্তরে এলসা ডিটিশাম বললেন, না বরং ওগুলো বেশ উপভোগ আমি করেছিলাম।…ওহ ভগবান, স্যার মন্টেগু ঐ বুড়ো জেরায় জেরায় আমাকে খতম করতে চেয়েছিলো। ভালোই লেগেছিলো ওঁর সঙ্গে আমার লড়তে। চেপে ধরতেও পারেননি আমাকে।
আত্মতৃপ্তির সুরটা কথাগুলো বলার সময় পোয়ারোর কান এড়ালো না। বলেই চললেন এলসা, মোহভঙ্গ করছি না তো আপনার। একটা কুড়ি বছরের মেয়ে, একেবারে ধরাশায়ী হয়ে পড়া উচিত ছিলো তার তো, মানে লজ্জায় অপমানে। আমি অথচ হইনি। ওঁরা যা বলেছিলেন আমাকে আমি গায়ে মাখিনি সেসব কথা। শুধু আমি একটা জিনিসই চাইছিলাম।
সেটা কি?
ফাঁসিতে ঝোলাতে ক্যারোলিনকে, সঙ্গে সঙ্গে এলসা ডিটিশাম বললেন।
লেডি ডিটিশামের হাত ভারী সুন্দর লম্বাটে ধরণের গড়ন হাতের তা লক্ষ্য করলো পোয়ারো। নখ বাঁকানো, শিকারী প্রাণীর থাবা।
প্রতিহিংসাপরায়ণ মনে করছেন আমাকে আপনি? ক্ষতি করলে আমার, কেউ আঘাত করলে আমাকে প্রতিশোধ নিতে আমি দ্বিধা করি না। সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণীর মহিলা ছিলো আমার চোখে ঐ মহিলাটি। অ্যামিয়াস আমাকে চাইছে ও জানতো। ওকে ছেড়ে অ্যামিয়াসের আমাকে বিয়ে করতেও ইচ্ছে আছে। আর ঠিক সেই কারণে যাতে ওকে আমি না পাই তাই খুন করে ফেললো স্বামীকে নিজের হাতে।
সুদূর প্রসারিত করে পোয়ারোর পাশ দিয়ে দৃষ্টিকে এলসা ডিটিশাম আবার বললেন, আপনি কি কাজটাকে নীচতা বলে মনে করেন না।
আপনি কি ঈর্ষার ব্যাপারটা বোঝেন না, বা বোঝার চেষ্টা করেন না সহানুভূতি দিয়ে লেডি ডিটিশাম?
না, করি না। যদি হেরে যান আপনি, হেরে গেছেন। যদি না পারেন স্বামীকে বেঁধে রাখতে, তাকে যেতে দিন ভদ্রভাবে। এই মুঠোর মধ্যে জিনিসটা পুরো রাখা একেবারেই পছন্দ করি না আমি।
হয়তো আপনি অ্যামিয়াস ক্রেলকে বিয়ে করলে তা বুঝতে পারতেন।
আমার তো মনে হয় না তা, আমরা…এলসা হঠাৎ একটু হাসলেন। মনে হলো পোয়ারোর ঠিক হাসি নয় হাসিটা, তাতে ভয়ের ছাপ আছে। যেন বাস্তব অনুভূতির সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই তার। কথাটা ঠিক মতো আপনাকে বলে রাখা ভালো। কখনই একথা মনে করবেন না যে এক সরল মেয়েকে অ্যামিয়াস ক্রেল ভুলিয়ে তার সর্বনাশ করেছিলো। ব্যাপারটার জন্যে আমাদের মধ্যে আমার দায়িত্বই বেশি ছিলো। আমি ওকে পাবার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছিলাম একটা পার্টিতে দেখা হবার পর থেকেই।
এক হাস্যকর অনুকরণ–এ এক অসম্ভব ভাবে হাস্যকর প্রচেষ্টা অনুকরণ করার অথচ
আমার সর্বস্ব আমি নিবেদিত তোমার চরণে
হে আমার প্রভু, সঙ্গে যাব যেথা লয়ে যাবে…
জানতেন যদিও বিবাহিত অ্যামিয়াস,
অনুপ্রবেশকারীরা অবৈধভাবে দণ্ডিত হবে, ছাপানো নোটিশ ছাড়া বাস্তব জগতে কিন্তু আরও বেশি কিছু প্রয়োজন। যদিও তার স্ত্রীকে নিয়ে সুখী না হতে পারে, আর সুখী হয়। আমাকে পেলে, তবে বাধা থাকবে কেন তা হবার পথে? একটাই তো মাত্র জীবন।
কিন্তু অ্যামিয়াস তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সুখীই ছিলেন একথা তো শুনেছি।
না। ঝগড়া করতে কুকুর-বেড়ালের মতো। স্বামীর খুঁত ধরে বেড়াতো সব সময়। ওঁর স্ত্রী কি জঘন্য মেয়েমানুষ ছিলো।
একটা সিগারেট ধরালেন এলসা উঠে গিয়ে, তারপর বললেন মৃদু হেসে, হয়তো ক্যারোলিনের প্রতি অবিচার করেছি আমি। কিন্তু সত্যিই বলছি সে বড়ো কদর্য মনের মেয়েমানুষ ছিলো।
ভীষণ দুঃখের কিন্তু ঘটনাটা, ধীরে ধীরে বললো পোয়ারো।
হ্যাঁ, সত্যিই ভীষণ দুঃখের ঘটনাটা, কথাটা বললেন এলসা আগেকার সেই ক্লান্ত সুর, তারপর যেন হঠাৎ উজ্জীবিত হয়ে বলে উঠলেন, আমাকেও কিন্তু দুর্ঘটনাটা শেষ করে দিয়েছিলো। মরণ হয়েছিলো আমারও। আমার জীবনে তারপর থেকে আর কিছু নেই অসীম শূন্যতা ছাড়া। আমি যেন…যেন আমি কাঁচের পাত্রে রাখা একটা খড়পোড়া মাছ, বেশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন এলসা শেষের কথাটা বলতে বলতে।
আপনার জীবনে কি তাহলে অ্যামিয়াস ক্রেল অতোটা জুড়ে ছিলেন?
এলসা কথাটা ঘাড় নেড়ে স্বীকার করে নিলেন। কিন্তু একটু বিষাদের যেন ছায়া আছে সেই…স্বীকৃতির মধ্যে।
মনে হয় এক পেশে মন নিয়ে সব সময় আমি চলতাম,..মনে হয় উচিত সবারই জুলিয়েটের মতো অবসান ঘটিয়ে দেওয়া নিজের জীবনের। কিন্তু…কিন্তু লোকে ধরে নেবে সেটা করলে পরে আপনি হেরে গেছেন, পরাজিত হয়েছেন জীবনের যুদ্ধে।
