বিড়বিড় করে লর্ড ডিটিশাম বললেন, তা জানি, তা জানি…।
বুঝতে পারছেন তাহলে…লেখা হবে বইটা। কর্তব্য হলো আমার দেখা যাতে কোনো ভুল তথ্য ঢুকে না যায়, বিকৃত যেন না হয়ে যায় কোনো ঘটনা।
ধারণা ছিলো আমার তো সত্য ঘটনা জনসাধারণের সম্পত্তি, লর্ড ডিটিশাম বললেন।
তা ঠিক, কিন্তু নিশ্চয়ই তার ব্যাখ্যাগুলো নয়।
রাগতভাবে হঠাৎ ডিটিশাম বললেন, মিঃ পোয়ারো জানতে পারি কি এ কথার মানে?
লর্ড ডিটিশাম দেখুন, নানা পন্থা আছে, ঐতিহাসিক কোনো সত্য ঘটনাকে দেখার। যেমন ধরুন মেরী কুইন অফ স্কাটস–ওঁকে কেউ শহীদ বলেছে, বা কেউ নীতিজ্ঞানহীন স্বার্থপর মহিলা হিসেবে ওঁকে এঁকেছেন, কেউ বলেছেন একজন সরলমনা দেবী ছিলেন মেরী, ওঁকে কেউ খুনী ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে দেখেছেন। উনি ছিলেন অনেকের মতে ভাগ্য আর পরিস্থিতির শিকার। মনে করতে পারে যার যা খুশি।
কিন্তু এক্ষেত্রে, তার স্ত্রী খুন করে অ্যামিয়াস ক্রেলকে। অবশ্য সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিচার চলাকালীন এবং অবাঞ্ছিভাবে বেশ কিছুটা ঝঞ্ঝাটে আমার স্ত্রী জড়িয়ে পড়েন। খুব বিরূপ হয়ে উঠেছিলো সাধারণ মানুষ তার প্রতি।
একটু প্রখর ইংরেজদের নীতিজ্ঞানটা। পোয়ারো বললো।
আপনার?
আমার, সুস্থ নৈতিক জীবনযাপন আমি করি। তবে নীতিজ্ঞানের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই তার সঙ্গে।
লর্ড ডিটিশাম বললেন, আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কেমন ছিলেন ঐ মিসেস ক্রেল মহিলাটি। শুধু কি স্ত্রীর অপমানিত ব্যাপার, না অন্য কিছু ছিলো এর পেছনে?
সেটা জানতে পারেন আপনার স্ত্রী, জানালো পোয়ারো।
ঐ মামলাটা সম্বন্ধে আমার স্ত্রী একটা কথাও আজ পর্যন্ত বলেনি।
যেন দ্বিগুণ হয়ে গেলো পোয়ারোর আগ্রহ, যেন দেখতে পাচ্ছি মনে হচ্ছে…।
আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন? তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো লর্ডের গলার স্বর।
কবির সৃজনধর্মী মানস কল্পনা…। উঠে গিয়ে লর্ড ডিটিশাম ঘণ্টা বাজালেন, আপনার জন্যে আমার স্ত্রী অপেক্ষা করছে…।
পোয়ারো খানসামার সঙ্গে পা ডুবে যাওয়া নরম কার্পেটের ওপর হাঁটতে লাগলো। পোয়ারো দু থাক সিঁড়ি ভেঙে একটা ঘরের মধ্যে এলো। শুধু অর্থের প্রাচুর্য চারপাশে। চারদিকে মায়াজাল সৃষ্টি করেছে স্তিমিত আলোয়, ফুলের বাহার সিঁড়ির বাঁকে বাঁকে। দামী জিনিস লর্ড ডিটিশামের ঘরটায় থাকলেও তাতে রুচির পরিচয় ছিলো। এখানে কিন্তু বড় বেশি স্থূলভাবে প্রকট হয়ে আছে অর্থের প্রাচুর্য। এখানে অহংকারটাই প্রধান রুচির বদলে। মনে মনে পোয়ারো বললো, মাংস রোস্ট করা,…হ্যাঁ, রোস্ট করা মাংস।
এটা বসবার ঘর লেডি ডিটিশামের উনি দাঁড়িয়ে ছিলেন একটা ম্যান্টলপীসের পাশে।
পোয়ারোর মাথার মধ্যে একটা কথা ঝিলিক দিয়ে উঠলো, তা সরাতে পারলো না শত চেষ্টাতেও যৌবনেই মৃতা…।
পোয়ারোর–এ কথাটাই মনে হলো এলসা ডিটিশামের দিকে তাকিয়ে।
তার পক্ষে এলসাকে চেনা সম্ভব হতো না মেরিডিথ ব্লেকের বাড়িতে দেখা ছবিটা দিয়ে। ঐ ছবিটা ছিলো, যৌবনের প্রাণশক্তির মূর্ত প্রতীক। পোয়ারো যাঁকে এখন দেখছে, তার মধ্যে চিহ্নমাত্র নেই যৌবনের, যৌবন কোনো কালে ছিলো বলে মনে হয় না। তবে অস্বীকার করা যায় না একথা যে এলসা সুন্দর এবং সুন্দরী আছেন এখনও, পোয়ারোকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে এগিয়ে এলেন এলসা। খুব বেশি নয় বয়সও, বড়জোর ছত্রিশ। সযতনে কুচকুচে কালো চুল বাঁধা। অপূর্ব সুন্দর দেহের বাঁধুনী।
মনের মধ্যে পোয়ারোর একটা অব্যক্ত ব্যথার সুরে গুমরে উঠলো। বৃদ্ধ বলেছিলেন জোনাথন জুলিয়েটের কথা। কিন্তু এলসার মধ্যে সেই জুলিয়েটের ছিটেফোঁটা দেখা যাচ্ছে না। জুলিয়েট, রোমিওকে হারিয়ে মরে গিয়েছিলো যৌবনেই।
অথচ মরেনি এলসা গ্ৰীয়ার…। মিঃ পোয়ারো আমার খুবই আগ্রহ আছে। বসুন, আমাকে কি করতে হবে বলুন, কোনো উত্থান পতন নেই এলসা ডিটিশামের জানায়, কথাগুলো বলে গেলেন এক সুরে।
মনে হলো পোয়ারোর, ওঁর কিন্তু কোনো আগ্রহই নেই। এঁকে কোনো কিছুই আর আকর্ষণ করে না।
বড় বড় ধূসর রঙের চোখ–নিষ্প্রাণ হ্রদের মতো। পোয়ারো এসব ক্ষেত্রে সাধারণতঃ করে থাকে যা তাই করলো, গেয়ে উঠলো সম্পূর্ণ উল্টো সুরে, ম্যাডাম সব গুলিয়ে ফেলছি আমি, গুলিয়ে যাচ্ছে সব।
না, না, কেন তা হবে? লেডি ডিটিশাম বললেন।
কারণ মনে হচ্ছে আমার নতুন করে অতীতের নাটকটাকে গড়ে তোলার চেষ্টাটা ভীষণ বেদনার হবে আপনার পক্ষে।
কথাটা শুনে এলসা বেশ খুশি হলেন। হ্যাঁ, বেশ আনন্দ, মুখে সত্যিকারের আনন্দের আভা ফুটে উঠলো।
মনে হচ্ছে আপনার মাথার মধ্যে কথাটা আমার স্বামী ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ওঁর সঙ্গে আগেই তো দেখা হয়ে গেছে। তবে কিছুই বুঝতে পারেন না উনি। কখনও পারেনওনি। আমাকে যতোটা স্বামী স্পর্শকাতর মনে করেন আমি অতোটা নই।
তখনো এলসার খুশির আমেজটা কাটেনি, বললেন, জানেন কারখানার মজুর ছিলেন আমার বাবা। অনেক টাকা পয়সা করেন প্রচুর খেটে। মোটা চামড়া না হলেও কাজটা করা যায় না। আমারও তাই।
মনে হলো পোয়ারোর ও কথাটা সত্যি। মোটা চামড়া না হলেও কেউ ও ভাবে এসে উঠতো না ক্যারোলিন ক্রেলের বাড়িতে।
লেডি ডিটিশাম বললেন, কি করতে হবে বলুন আমাকে?
ম্যাডাম আর একবার বলছি, আপনার কষ্ট হবে না তো পুরানো দিনের স্মৃতিচারণ করতে?
