বলে উঠলো পোয়ারো, অসাধারণ–দারুণ অসাধারণ ছবি।
একটু যেন মেরিডিথের গলাটা কাপলো, এতো বাচ্চা মেয়েটা
ঘাড় নেড়ে পোয়ারো ঠিক করে নিলো মনে মনে তারপর ভাবলো, সাধারণ এই কথাটা বলার সময়, কি ভাবে পুরুষেরা, এ তো বাচ্চা। নিষ্পাপ কতো, কতো অসহায়। কিন্তু তা তো নয়, যৌবন। বড় স্থূল যৌবন, উদ্ধত বড়, নিষ্ঠুর বড়। এবং আর একটা জিনিস–কত অল্পেই ভেঙে পড়ে যৌবন।
পোয়ারো বেরিয়ে এলো মেরিডিথের সঙ্গে। নাহ এবার দেখা করতে হবে এলসা গ্ৰীয়ারের সাথে। কালের স্পর্শে এই যৌবনবতী, মোহময়ী, বিজয়িনী স্কুল প্রকৃতির মেয়েটি পাল্টেছে কতোটা দেখা দরকার তা। আগ্রহ বাড়ছে পোয়ারোর।
তাকে অনুসরণ করে চলেছে যেন মেয়েটির দৃষ্টি। পোয়ারোকে কিছু বলতে চাইছে।
যদি পোয়ারো এটা বুঝতে পারতো কী বলতে চাইছে, তাকে রক্ত মাংসের মহিলাটিই বা কি বলতে পারে, কিংবা এমন কথা বলতে চাইছে ঐ চোখ দুটো যা বলতে পারবে না সত্যিকারের মহিলাটি?
বিজয়িনীর অস্মিতা চোখের ভাষায় জগতকে তুচ্ছ করা। অথচ তার হাত থেকে মৃত্যু এসে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে করায়ত্ত শিকারটিকে।
হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ফলে কামনার ধন, চোখের আলোয় কি পাওয়া যাবে এখনও বঞ্চিতের, হতাশার শেষ ম্লান আভাটুকু।
শেষবারের মতো পোয়ারো ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে আর একবার ছবিটা দেখে নিলো।
একবারে যেন জীবন্ত।
হঠাৎ পোয়ারোকে এক অজানা আশংকা এসে গ্রাস করলো…।
.
অষ্টম অধ্যায়
রোস্ট করা মাংস পেয়েছিলো এই ছোট্ট শূকরছানাটি..
ডারউইন টিউলিপ ফুলের বাহার ব্রুকস্ট্রীটের বাড়িটার জানলা বাক্সে। দরজা দিয়ে সাদা লাইলাব ফুলের সুগন্ধ ভেসে আসছে হল ঘরে রাখা পবরাট ফুলের পাত্রের থেকে।
পোয়ারোর হাত থেকে একজন মাঝবয়সী খানসামা টুপি আর ছড়িটা নিলো। ওটা নিয়ে গিয়ে আর একজন চাকর যথাস্থানে রাখলো। আস্তে আস্তে খানসামা পার্থক্য বজায় রেখে বললো, স্যার এই পথ দিয়ে আসুন।
হলঘর পার হয়ে একটা ঘরের দরজা একটু খুলে নিখুঁত ভাবে এরকুল পোয়ারোর নামটা উচ্চারণ করে তার আগমন বার্তা খানসামা ঘোষণা করলো।
একজন রোগা লম্বা মতন ভদ্রলোক উঠে এসে পোয়ারোকে স্বাগত জানালেন।
এখনও চল্লিশ পার হননি লর্ড ডিটিশাম। শুধু তিনি লর্ড খেতাবধারী জমিদারই নন, কবিও বটে একজন। প্রচুর অর্থব্যয়ে তার লেখা ছুটি কাব্যনাটিকা মঞ্চস্থ করা হয়েছিলো এবং দুটিই মঞ্চসফল। বেশ উঁচু কপালটা, ধারালো ভাব চিবুকে, অপ্রত্যাশিতভাবে চোখ আর মুখটা সুন্দর। লর্ড ডিটিশাম বললেন, মিঃ পোয়ারো বসুন।
পোয়ারো বাড়ানো সিগারেটটা নিলো, সযত্নে দেশলাই জ্বেলে লর্ড ডিটিশাম ওটা ধরিয়ে দিলেন, তারপর বললেন চিন্তা করতে করতে, আমার স্ত্রীর সঙ্গে আপনি যে দেখা করতে এসেছেন আমি তা জানি।
পোয়ারো বললো, লেডি ডিটিশাম আমাকে দয়া করে সাক্ষাৎকারের অনুমতি দিয়েছেন। ওহ হ্যাঁ।
বেশ কিছুক্ষণ লর্ডকে অস্বস্তিকর ভাবে চুপ করে থাকতে দেখে পোয়ারো বললো, আপনার আশা করি তাতে আপত্তি নেই, লর্ড ডিটিশাম।
হঠাৎ স্বপ্নালু মুখে হাসি ফুটে উঠলো চকিতে, মিঃ পোয়ারো আজকাল স্বামীদের আপত্তিতে ততো আর গুরুত্ব কেউ আরোপ করে না।
আপনার তাহলে আপত্তি আছে?
না, আমি তা বলতে পারি না। তবে আমি অস্বীকার করতে পারছি না যে একটু আতঙ্কের প্রতিক্রিয়া যে আমার স্ত্রীর মনের ওপর হবে তা নয়, বলছি খোলাখুলি ভাবেই। অনেক বছর আগে তখন আমার স্ত্রীর বয়েস অনেক কম, তখন তাকে যেতে হয়েছিলো এক দারুণ অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে। আমার ধারণা যে সেই আঘাতটা কাটিয়ে উঠেছে বলেই। সে সেটা ভুলেও গেছে আমার বিশ্বাস। আপনি এতোদিন পরে এলেন এবং পুরোনো স্মৃতি যে জাগিয়ে তুলবে আপনার প্রশ্নাবলী একথা অস্বীকার করা যায় না।
সত্যিই আমি খুব দুঃখিত এর জন্যে। বিনীতভাবে পোয়ারো বললো।
বুঝতে পারছি না ঠিক, এর ফল কি হবে।
লর্ড ডিটিশাম আপনাকে আমি কথা দিচ্ছি, যত সংক্ষেপে কাজটা সারা যায় সারবো। এবং যতোটা সম্ভব কম দুঃখ দেবার চেষ্টা করবো লেডি ডিটিশামকে। উনি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কোমল এবং কাতর হয়ে ওঠেন অল্পে।
হঠাৎ পোয়ারোকে চমকে দিয়ে লর্ড ডিটিশাম জোরে হেসে উঠলেন, এলসা? এলসা ঘোড়ার মতো শক্তি রাখে।
তাহলে…? পোয়ারো খুব বুদ্ধিমানের মতো প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।
লর্ড ডিটিশাম বললেন, যে কোনো মানসিক আঘাত সহ্য করবার ক্ষমতা রাখে আমার স্ত্রী। কেন সে আপনার সাথে দেখা করতে রাজী হয়েছে আপনি কি তা জানেন?
ধীর ভাবে পোয়ারো বললো, কৌতূহল?
শ্রদ্ধার ভাব ফুটে উঠলো লর্ডের চোখে, তাহলে ধরতে পেরেছেন?
এটাই তো স্বাভাবিক। সব সময়েই মহিলারা বেসরকারী গোয়েন্দাদের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের নরকে যাবার পরামর্শ দেন পুরুষেরা।
নরকে যাবার পরামর্শ কিছু মহিলাও দিতে পারেন।
হ্যাঁ, তবে দেখা করার পর, আগে নয়।
ঠিক হয়তো, একটু থামলেন লর্ড ডিটিশাম, তা আসল উদ্দেশ্যটা কি এই বইটি লেখার পেছনে?
কাঁধ ঝাঁকালো পোয়ারো, পুরানো দিনের সুর লোকে খুঁজে বেড়ায় সন্ধান করে পুরানো দিনের নাটকের, পোক চায় পুরানো দিনের, আবার অনেকে পুরানো দিনের কথা জানতে চায় নতুন করে।
ফুঃ! বললেন লর্ড ডিটিশাম, যদি তা বলেন তবে আমিও বলবো ফুঃ। কিন্তু তাই বলে আর পাল্টে দিতে পারেন না মানুষের স্বভাব। এক ধরনের নাটক খুন করা। মানবজাতির আগ্রহ নাটক সম্বন্ধে সেই অনাদিকাল থেকেই চলে আসছে।
