তাহলে এখানেই ঘটনাটা ঘটেছিলো? আগ্রহের সুর পোয়ারোর গলায়।
হ্যাঁ, ওখানে বেঞ্চটা ছিল, ঐ শেডটার পাশে। অ্যামিয়াসকে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিলো ওটার ওপরেই। এমনিতে ছবি আঁকার সময় মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে গা এলিয়ে দিয়ে বেঞ্চটার ওপর একমনে ইজেলের ওপর দেখতো ছবিটাকে। তারপর এক সময় হঠাৎ লাফিয়ে উঠে ক্যানভাসের ওপর তুলি বোলাতে শুরু করতো পাগলের মতো।
মেরিডিথ আবার শুরু করলেন একটু থেমে, ব্যাপারটা সেই জন্যেই খুব স্বাভাবিক লেগেছিলো। মনে হচ্ছিলো যেন অ্যামিয়াস বিশ্রাম করছে চোখ বুজে। কিন্তু ভোলা চোখ আর শক্ত হয়ে ওঠা দেহটাকে দেখেই বাড়ে সন্দেহ। ঐ ভাবে…ঐ ভাবেই তো ঘটে।…ব্যথা নেই কোনো…
যে প্রশ্নটা পোয়ারো করলো যেন সেটা আশা করেছিলেন মেরিডিথ, প্রথম কে দেখেছিলো?
ও দেখেছিলো। ক্যারোলিন, লাঞ্চ খাবার পর। দেখেছিলাম সব শেষে আমি আর এলসা, মানে জীবিত অ্যামিয়াসকে। মনে হয় তখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিলো বিষের ক্রিয়া। যাই হোক সবটা তো আমি লিখেই দিচ্ছি। আমার পক্ষে সহজ হবে সেটাই।
তারপর হুড়মুড় করে কোনো কথা না বলে মেরিডিথ হাঁটতে লাগলো ওর পেছনে পেছনে।
দুজনে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে আর একটা উঁচু মতন জায়গায় পৌঁছলেন। মেরিডিথ গাছগাছালির মধ্যে একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন, এখানে ছিলো একটা বেঞ্চ তার টেবিল। আমি এখানে সেদিন সকালে বসেছিলাম। তখন অবশ্য এখানে এতো গাছপালা ছিলো না পরিষ্কার দেখা যেতে কামান বসানোর দেওয়ালটা। ঘাড় বেঁকিয়ে ঐখানে বসে এলসা পোজ দিয়েছিলো। মেরিডিথ নিজের ঘাড়টা বেঁকিয়ে দেখিয়ে দিলেন।
ওখান থেকে বাড়ির দিকে এগোলেন। জর্জিয়ান প্যাটার্নের। আগেকার দিনের বাড়ি। প্রায় পঞ্চাশটা খুপরি করা হয়েছে কাঠের সবুজ লনের ওপর। এগুলো নতুন। কমবয়সী ছেলেমেয়েরা এখানে থাকে। হৈ চৈ লেগে থাকে বোর্ডিং বাড়ির। সকলেই নতুন এখানকার বাসিন্দারা, অতএব কিছু দেখার নেই। ফেরা যাক চলুন। আবার হ্যাণ্ডক্রশ ম্যানরে ফিরে এলেন মেরিডিথ আর পোয়ারো।
মেরিডিথ হঠাৎ বলে উঠলেন, জানেন, আমি ঐ ছবিটা কিনে নিয়েছিলাম। অ্যামিয়াস যে ছবিটা আঁকছিলো। যদি ছবিটা নোংরা মনের লোকর হাতে পড়তো তাহলে কেচ্ছা কাহিনী ফলাও করে প্রচার হতোই নানারকম, যাতে সেটা না হয় তার জন্যে ওটা আমি নিজেই কিনে নিই। চমৎকার ছবি। এটাই ওর সেরা শিল্পকর্ম তা বলতো অ্যামিয়াস। শেষ হয়ে এসেছিলো প্রায়। মাত্র দু-একদিনের কাজ বাকি ছিলো। দেখতে চান…দেখবেন নাকি একবার ছবিটা।
দেখবো নিশ্চয়ই।
মেরিডিথ হলঘর পার হয়ে একটা ছোট্ট ঘরের দরজা খুললেন। ঘরটা বোধহয় তেমন ব্যবহার করা হয় না। ধুলোময়লার ভ্যাপসা বন্ধ। বেশ কষ্ট করে মেরিডিথ একটা জানলা খুললেন। এঁটে গিয়েছিলো। সঙ্গে সঙ্গে ঘরটাকে এক ঝলক মিষ্টি গন্ধ এসে ভরিয়ে দিলো। বলার দরকার পড়লো না ঘরটা যে কি তা। বেশ তাক কয়েকটা, সেখানে এখনও শিশি-বোতল রাখার ছাপগুলো আছে। একটা বেসিন গাঁথা দেওয়ালে। কিছু অকেজো রাসায়নিক গবেষণার যন্ত্রপাতি।
নিঃশ্বাস বুক ভরে নিয়ে মেরিডিথ বাইরের দিকে তাকাতে তাকাতে বললেন, সব কথা কত সহজে মনে পড়ে যায়। জুইফুলের গন্ধ পেয়েছিলাম এইখানে দাঁড়িয়ে–আর নির্বোধের মতো কথার জাল বুনে চলেছিলাম। গুণাগুণ ব্যাখ্যা করেছিলাম আমার ওষুধ পত্রের।
পোয়ারো জানলা দিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে হাত বাড়িয়ে জুই ফুলের একটা ছোট্ট ডাল ছিঁড়ে নিলো। মেরিডিথ বড় বড় পা ফেলে হেঁটে গেলেন একটা দেওয়ালের দিকে। ছবি ঝুলছে একটা, যাতে ময়লা না পড়ে তার জন্য এটা একটা বড় কাগজ দিয়ে ঢাকা।
মেরিডিথ কাগজটা একটানে সরিয়ে দিলেন। পোয়ারোর নিঃশ্বাস সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেলো। অ্যামিয়াস ক্রেলের এর আগে পোয়ারো মোট চারটে ছবি দেখেছে। দুটো স্টেট গ্যালারীতে, লণ্ডনের একটা ছবির দোকানে অন্য একটা আর একটা গোলাপ গুচ্ছের। আর চোখের সামনে এখন ভেসে উঠেছে এমন একটা ছবি, যেটাকে শিল্পী নিজে সবার সেরা বলেছেন। এবং বুঝতে পারলো পেয়ারোও সত্যিই অ্যামিয়াস এক অত্যন্ত উঁচুদরের শিল্পী।
ছবিটাকে একটা ভাসা-ভাসা জিনিস বলে মনে হচ্ছিলো প্রথম নজরে, যেন ভালো একটা পোস্টার। সুস্পষ্ট উল্টোপাল্টা রঙের স্কুল ব্যবহারের চিহ্ন। কটকটে হলদে রঙের জামা একটা মেয়ের পরনে প্যান্ট গাঢ় নীল রঙের। উত্তাপ নীল রঙের সমুদ্রের পটভূমিতে ধূসর রঙের দেওয়ালের ওপর বসে।
বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে কিন্তু প্রথম দর্শনে। সূক্ষ্ম বিকৃতি সামান্য সামান্য নানা জায়গায় ঘটানো হয়েছে। মনের মধ্যে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগায় অসাধারণ উজ্জ্বল আর স্বচ্ছ আলোর খেলায় ছবিটা। আর মেয়েটি…।
..এবং প্রাণবন্ত অদ্ভুত। যৌবনের প্রাণপ্রাচুর্যে যেন জ্বলজ্বল করছে ছবিটার সব কিছুই। যেন কথা বলছে মুখটি আর চোখ…।
প্রাণের স্পন্দন অতিমাত্রায় স্পষ্ট সেখানেও। মোহময়ী যৌবনের প্রতীক। তাহলে অ্যামিয়াস ক্রেল এটাই প্রত্যক্ষ করেছিলেন এলসা গ্ৰীয়ারের মধ্যে যার ফলে শান্তির প্রতিমূর্তি ক্যারোলিনকেও উপেক্ষা করার জন্যে উনি অন্ধ হয়ে উঠেছিলেন। এক অফুরন্ত প্রাণশক্তি এলসা, যেন এলসাই যৌবন।
অপূর্বসুন্দর দেহলতা, উদ্ধত, অহংকারী, হেলানো মাথাটা, জয়ের আনন্দের জিগীষা চোখের দৃষ্টিতে, যেন তাকিয়ে আছে আপনার দিকে, লক্ষ্য করছে…করছে অপেক্ষা…।
