মাথা নেড়ে সায় দিলো পোয়ারো। সে কথা কার্লা লেমারচেন্টও বলেছিলো। তবে শৈশবের স্মৃতির ওপর নিজের করে ওর বক্তব্য বলা। মেরিডিথ ব্লেক সেদিক দিয়ে অনেক ভাল ভাবে ক্যারোলিনকে চিনতেন। পোয়ারো এই প্রথম সমর্থন পেলে কার্লার বিশ্বাসের।
যেন নিজের মনে মেরিডিথ বলতে লাগলেন, যদি…যদি ক্যারোলিন নির্দোষ হয়…তবে তো একটা বিরাট পাগলামি পুরো ব্যাপারটাই।…না, না, অন্য কিছু আমি ভাবতে পারছি না। পোয়ারোর দিকে ফিরে হঠাৎ বললেন, আপনি? কী মনে করেন আপনি?
পোয়ারো সামান্য নিস্তব্ধতার পর বললো, আমি এখনও পর্যন্ত কিছু ভাবিনি। আমি এখন শুধু অতীত সম্পর্কিত ধারণাগুলোকে সংগ্রহ করে চলেছি। কেমন ছিলেন ক্যারোলিন। কেমন ছিলেন অ্যামিয়াস ক্রেল। অন্য যারা ঐ সময়ে ছিলেন, কেমন মানুষ ছিলেন তাঁরা। ঠিক কি কি ঘটেছিলো ঐ দুদিন। আমার দরকার এগুলো। তারপর বিশ্লেষণ করতে বসবো ঘটনাগুলোকে নিয়ে। আপনার ভাই ও ব্যাপারে সাহায্য করছেন। ওঁর মনে আছে ঘটনা সম্বন্ধে যেটুকু আমাকে তার একটা বিবরণ লিখে দিচ্ছেন।
মেরিডিথ কড়া গলায় বললেন, আপনার ও থেকে লাভ হবে না তেমন কিছু। খুব ব্যস্ত মানুষ ফিলিপ। ওর মনে থাকে না অতীতের সব কথা। হয়তো তথ্য ভুল দিয়ে বসবে।
বাদ পড়ে যেতে পারে ফাঁক থেকে, যেতে পারে, বুঝি সেটা। হঠাৎ কথার মধ্যে কথা বলে উঠলেন মেরিডিথ। বলছিলাম কি আমি…একটু লাল হয়ে গেলেন লজ্জায়, আপনি যদি চান–পারি আমিও মানে ওর লেখাটা আমার লেখার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে আপনি পারবেন। ভালো হবে না?
পোয়ারো খুব খুশি হয়ে বললো, হবে, আমার কাছে আপনার লেখাটাও ভীষণ মূল্যবান হবে। একেবারে পরিকল্পনা পয়লা সারির।
ঠিক তাই। লিখবো আমি। কিছু পুরানো ডাইরি আছে আমার। আমার ভাষা-টাষা তেমন ভালো নয়, ভুল লিখি বানানও। অতএব আমার কাছে খুব ভালো একটা আশা করবেন না।
আহা, আপনার কাছ থেকে আমি তো কোনো সাহিত্য চাইছি না, স্রেফ সরল বর্ণনা ঘটনার। কি বলেছিলো কারা, কেমন কে দেখতে, ঠিক ঘটেছিলো কি এই সব চাই জানতে। এমন কি জানাবেন অপ্রাসঙ্গিক মনে করলেও। পরিবেশটাকে সব কিছু মিলিয়ে জানা সম্ভব হবে।
মিঃ পোয়ারো বুঝতে পারছি, যে সব জায়গা বা মানুষদের দেখেননি আপনি একটা কল্পনা তাদের সম্বন্ধে হবে আপনার পক্ষে।
ঘাড় নেড়ে স্বীকার করলো পোয়ারো, আপনার কাছে আর একটা অনুরোধ আছে। এরই লাগোয়া অ্যাল্ডারবেরির জমিদারীটা, ওখানে সম্ভব হবে কি একবার চাওয়া। মানে দুর্ঘটনাটা যেখানে ঘটেছিলো সেটা আমি নিজের চোখে একবার দেখতে চাই।
তা যেতে পারি নিয়ে, কিন্তু বদলে গেছে অনেক।
কিছু তৈরি করা হয়নি তো নতুন করে? উদগ্রীব হলো পোয়ারো।
না, অতো খারাপ হয়ে যায়নি ঘর বাড়ির অবস্থা। এখন ওটা একটা হোস্টেল হয়ে গেছে। ছেলে-ছোকরা থাকে অনেক। ঘরগুলো ছোট করা হয়েছে পাটিশন করে। কিছু কিছু বদলেছে। উঠোনগুলোও।
কেমন ছিলো আগে নিশ্চয়ই আমাকে আপনি বুঝিয়ে দিতে পারবেন?
চেষ্টা করবো যতোটা সম্ভব। মেরিডিথ পোয়ারোকে একটা ঢালু লনের পথ দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন।
কে বিক্রি করলো অ্যাল্ডারবেরির বাড়িটা?
যে একজিকিউটার ছিলে কার্লার পক্ষে তারা। অ্যামিয়াস মারা যায় উইল না করেই, ফলে মেয়েরই প্রাপ্য এখন সব সম্পত্তি। কারণ মেয়েকে ক্যারোলিনও তার অংশ দিয়ে যায়।
কিছু দেননি সৎ বোনকে?
মোটামুটি ভালোই টাকাকড়ি রেখে গেছেন অ্যাঞ্জেলার বাবা।
ঘাড় নাড়লো পোয়ারো, বুঝেছি।..কিন্তু আপনি আমায় এ কোথায় নিয়ে চলেছেন? সমুদ্রের তীর তো সামনেই দেখতে পাচ্ছি।
আপনাকে এখানকার ভূগোলটা একটু বুঝিয়ে দিতে হবে দেখছি। সব দেখতে পাবেন একটু এগোলেই।…একটা খাঁড়ি ঐ যে দেখতে পাচ্ছেন…ওটাকে লোকে উটের খাঁড়ি বলে কারণ উটের গলার মতো দেখতে বলে। ছোটখাট একটা নদীর মুখের মতো। অ্যাল্ডারবেরিতে ড্যাঙ্গা দিয়ে যেতে গেলে যেতে হয় অনেকটা ঘুর পথে। যাতায়াত এই খাড়ি নৌকো করে করলে সময় ও পথ দুটোই কম লাগে। অ্যাল্ডারবেরি হল খাঁড়ির উল্টো পাড়ে। এই তো দেখা যাচ্ছে গাছের ফাঁক দিয়ে।
ওরা একটা সরু তীরের কাছে এসে পড়েছে কথা বলতে বলতে, ছোট্ট একটু জঙ্গল সামনে, তার পাশ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাল্ডারবেরির চুড়ো।
দুটো নৌকো তীরের ওপর তোলা। একটা নৌকো ঠেলাঠেলি করে জলে ভাসিয়ে দুজনে এগোতে লাগলেন উল্টো পাড়ের দিকে দাঁড় বেয়ে।
আগে আমরা খুব একটা ঝড় বৃষ্টি না হলে এইভাবেই যেতাম। গাড়ীতে গেলে প্রায় তিন মাইল লাগে ঘুরপথে।
দুজনে ওপাড়ে পৌঁছে আবার একটা সরু পথ দিয়ে শুরু করলেন হাঁটতে। গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে পথটা বেরিয়ে এগিয়ে গেছে পাথর বসানো দেওয়ালের গা ঘেঁষে। মেরিডিথ বললেন সেটা দেখিয়ে, ওরা ঐটাকে কামান বাগান বলতো। একটা বাঁক নেবার পর একটা দরজা দেখা গেলো দেওয়ালের গায়ে। দুজনে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন।
গাছের ছায়ায় ছায়ায় আসছিলেন এতোক্ষণ বেশ, ফাঁকা জায়গায় এখানে ঢুকে হঠাৎ পোয়ারোর চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। খোলামেলা সুন্দর উঁচু জমি কামান বসানো দেওয়ালের ফোকরে ফেঁকরে। দূরে সমুদ্র গাঢ় নীল রঙের।
জায়গাটা চমৎকার। বললেন মেরিডিথ। সিমেন্ট কংক্রিটের একটা নতুন বাড়ি বাগানের পেছন দিকটায়। আগে কিন্তু এটা ছিলো না, ওখানেই অ্যামিয়াস ছবি আঁকতো। তখন বেঞ্চ, টেবিল পাতা থাকতো। দেখছি খুব একটা বদলায়নি।
