মেরিডিথ আদৌ কান দিলেন না পোয়ারোর কথায়, তার সমস্ত মনোযোগ অতোগুলো কথার মধ্যে একটি শব্দ দাবী করছিলো, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, ফিলিপ।
হা।
ওর সঙ্গেও আপনি কথা বলেছেন?
নিশ্চয়ই।
হঠাৎ মেরিডিথ কড়া সুরে বলে উঠলেন, আপনার সবার আগে আসা উচিত ছিলো আমার কাছে।
পোয়ারো নম্র-ভদ্র-ভঙ্গী করে বললো, আমার জ্যেষ্ঠত্বের অগ্রাধিকার সূত্রানুসারে উচিত ছিলো আগে আপনার কাছেই আসা। জানতাম আমি মিঃ ফিলিপ ব্লেকের চেয়ে আপনি বড়ো। তবে পারছেন তো বুঝতে, লন্ডনের কাছে থাকে আপনার ভাই, তাই সহজ হয়েছিলো আগে দেখা করাটা।
তখনো কমেনি মেরিডিথের রাগটা, বিরক্তির ভাব ঠোঁটে ফুটিয়ে বললেন, আপনার তবুও উচিত ছিলো আগে আমার কাছে আসা।
পোয়ারো কোনো উত্তর দিল না এবার, ফলে আবার বলতে শুরু করলেন মেরিডিথ, পক্ষপাতিত্ব আছে ফিলিপের।
তাই নাকি?
আসলে এই ধরনের পক্ষপাতিত্বের দোষ ওর মনের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি, চট করে আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে পোয়ারোকে আবার বললেন, আপনার কাছে ক্যারোলিনের বিরুদ্ধে বলেনি?
এতোদিন পরে, বিশেষ কোনো দরকার আছে কি তার?
মেরিডিথ চট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, জানি। এতোদিন আগের ঘটনা, চুকে বুকে গেছে সবকিছুই। সব লাভ লোকসানের ঊর্ধে ক্যারোলিনও। তবুও একটা ভুল ধারণা আপনি নিয়ে থাকবেন আমি এ চাই না।
এবং মনে হয় আপনার ছোট ভাই একটা ভুল ধারণা আমার মনে জন্মে দিতে পারেন?
সত্যি কথা বলতে কি, হয় কথাটা কিভাবে বলি…ওদের মধ্যে…মানে এক অদ্ভুত ধরনের শত্রুতা ছিলো ফিলিপ আর ক্যারোলিনের মধ্যে।
কেন? মেরিডিথকে বেশ বিরক্ত আর চঞ্চল করে তুললো পোয়ারোর প্রশ্নটা।
কেন কি করে জানবো আমি কেন? এভাবেই ঘটে এগুলো। ফিলিপ সুযোগ পেলেই খোঁচা মারতো ক্যারোলিনকে। ওকে অ্যামিয়াস বিয়ে করার পর বেশ রেগেই গিয়েছিলো ফিলিপ। ওদের ছায়া এক বছরেরও বেশি মাড়াতো না। অথচ সব সময়েই অ্যামিয়াস ছিলো ওর প্রাণের বন্ধু। ক্যারোলিন ফাটল ধরিয়ে দিতে পারে ওদের মধ্যে বন্ধুত্বের, ফিলিপ এই ধরনের আশংকা করতো।
ফাটল ধরেছিলো কি?
না, নিশ্চয়ই না। ভীষণ ভালোবাসতো ফিলিপকে, অ্যামিয়াস। ঠাট্টা নিজেদের মধ্যে করলেও শেষ দিন পর্যন্ত চিড় খায় না বন্ধুত্বে।
আপনার ভাই এলসা গ্ৰীয়ারের ব্যাপারটা কি চোখে নিয়েছিলেন?
কঠিন বলা। তবে বেশ বিরক্ত হয়েছিলো অ্যামিয়াসের পাগলামির জন্যে। শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না প্রায়ই বলতো। অ্যামিয়াসকে মাঝখান থেকে কষ্ট পোয়াতে হবে। তবে ক্যারোলিনকে আমার ধারণা ঐভাবে অপদস্থ হতে দেখে বোধহয় ফিলিপ ক্ষীণ একটা আনন্দ উপভোগ করতো মনে মনে।
চমকে উঠলো পোষারো, সত্যি কি ওরকম কিছু ভাবতেন উনি? না না, আমায় ভুল বুঝবেন না। বড়জোড় বলতে পারি আমি ওই ধরনের একটা চিন্তা অগোচরে ওর মনের মধ্যে থাকতে পারতো। নিজেও ও বুঝতে পারতো কিনা সন্দেহ। ফিলিপের সঙ্গে আমার কোনো মিল নেই, তবে একই রক্ত দুজনের শরীরে বইছে তো। মোটামুটি বুঝতে পারে এক ভাই অন্য ভাইয়ের চিন্তাভাবনা।
আর ঐ দুর্ঘটনা ঘটার পরে? মেরিডিথ ব্লেক জোরে মাথা নাড়লেন, ব্যথার ঢেউ মুখের ওপর বয়ে গেলো। বললেন, বেচারি ফিলিপ কষ্ট পেয়েছিলো ভীষণ মানসিক। খুবই ভালবাসতো অ্যামিয়াসকে। বছর দুয়েকের ছোট্টো ছিল ফিলিপ, ফলে একটু বেশিই পেয়েছিলো আঘাতটা। এবং দারুণ ক্ষেপে গিয়েছিলো ক্যারোলিনের ওপর।
তাহলে ফিলিপের মনে তখন অন্ততঃ কোনো সন্দেহ এ ব্যাপারে ছিলো না।
কারুরই ছিলো না আমাদের। ..এতদিন পরে আজ আপনি এসে খুঁচিয়ে তুলতে চাইছেন পুরানো ব্যাপারটা।
আমি না, ক্যারোলিন ক্রেল? মেরিডিথ ব্লেক বোবার মতো তাকিয়ে থেকে বললেন, ক্যারোলিন? মানে বুঝতে পারছি না আপনার কথা।
পোয়ারো, মেরিডিথের চোখে চোখ রেখে বললো, দ্বিতীয় ক্যারোলিন ক্রেল।
আস্তে আস্তে মেরিডিথের মুখে উত্তেজনার ভাবটা মিলিয়ে গেলো, ও হ্যাঁ, বাচ্চা মেয়েটা, কার্লা–আপনাকে ভীষণ ভুল বুঝছিলাম একটুর জন্য আমি।
আসলে আমি ক্যারোলিনের কথা বলছি আপনি ভেবেছিলেন? ভেবেছিলেন আপনি কিছুতেই ক্যারোলিন-কি ভাবে বলি?–শান্তি পাচ্ছেন না কবরের মধ্যে।
কেঁপে উঠলেন মেরিডিথ, না মশাই, না, চুপ করুন।
ঐ মহিলা একটা চিঠি লিখেছিলেন মেয়েকে আপনি জানেন, শেষ চিঠি, আর উনি নির্দোষ তাতে লিখেছিলেন।
অবিশ্বাসের সুর গলায়, মেরিডিথ বলে উঠলেন, ক্যারোলিন ঐ কথা লিখেছিলো?
হা বললো পোয়ারো, কেন আশ্চর্য লাগছে খুব?
আদালতে ওকে দেখলে একথা শুনে আপনিও আশ্চর্য হতেন। অসহায়, বেচারী, ওকে সবাই তাড়া করে চলেছে ব্যাধের মতো। এবং সামান্যতম চেষ্টা পর্যন্ত বাঁচবার জন্যে ও করছে না।
তবে কি হার মেনে নিয়েছিলেন উনি?
্না, না, ওর এই ধরনের পরাজিতের মনোভাব ছিলো না। আমার মনে হয়েছিলো সে যে মানুষটিকে ভালবাসতো সে তাকেই খুন করে ফেলেছে জানতে পেরে এটা হয়ে গিয়েছিলো ওই রকম। জেনেশুনেই নয়তো করেছে।
আপনি কি এখনও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন।
ও, এই ধরনের চিঠি লেখার কথা বলছেন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আপনি?
মিথ্যা ভাষণ তো হতে পারে সৎ উদ্দেশ্যে, আভাস দিলো পোয়ারো।
হতে পারে, মনের দ্বিধাভাব কাটিয়ে কথাটা বলেই মেরিডিথ বলে উঠলেন, না, হতে পারে না তা, ও ধরনের কাজ ক্যারোলিনের চরিত্রে সম্ভব নয়…।
