মেরিডিথ স্পষ্টভাবে, জানালেন পোয়ারোর এই প্রশ্নের উত্তরে, না, নেয়নি। ভীষণ রেগে গিয়েছিলো অ্যামিয়াসের ওপর। এবং বোনের পক্ষ নেওয়া সত্ত্বেও ক্যারোলিন, গোঁ ধরে বসে রইলো অ্যামিয়াস, বোর্ডিংয়ে পাঠাবেই অ্যাঞ্জেলাকে। এমনিতে বেশ সাদাসিধে মানুষ ছিলো অ্যামিয়াস, কিন্তু ক্ষেপে গেলে একবার আর তাকে শান্ত করা যেতো না, হার মানতে হয়েছিলো ক্যারোলিন আর অ্যাঞ্জেলা দুজনকেই।
বোর্ডিংয়ে পাঠাবার কথা ছিলো অ্যাঞ্জেলাকে, তাই না, কবে?
যে সেসন শুরু হয় শরৎকালে, তাতে। ওরা গোছগাছ করছিলো ওর জিনিসপত্র। আর কয়েকদিন পরেই হয়তো যেতো ও দুর্ঘটনাটা না ঘটলে। ঐদিন সকালে কিছু জিনিসপত্র বাঁধাছাদা করার কথা ছিলো।
হঠাৎ এখানে প্রশ্ন করলো পোয়ারো, আর ঐ গভর্নেস?
আপনি কি বলতে চাইছেন…গভর্নেস?
গভর্নেস কি চোখে নিয়েছিলো অ্যাঞ্জেলাকে বোর্ডিংয়ে পাঠানোর ব্যাপারটা। তার তত চলে যাবার কথা চাকরি? তাই না?
ও হ্যাঁ, তাই তো দাঁড়ায় একদিক দিয়ে। তখন কার্লার বয়স পাঁচ কি ছয়, গভর্নেসের কাছে পড়াশুনা করতো একটু আধটু। একজন নার্স ওর জন্য ছিলো বটে। তবে মিস উইলিয়ামসকে ওর জন্যে ওরা রাখতো কিনা সন্দেহ। ওই নামটা এই তো মনে পড়ে গেছে। সিসিলিয়া উইলিয়ামস। কেমন মজার ব্যাপার দেখছেন, নামটা মনে পড়ে গেলো কথা বলতে বলতে।
তা ঠিক, এখন আপনি অতীত জগতে চলে গেছেন। তাই না? আপনার চোখের সামনে নতুন করে দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছে, তখন যেভাবে কথা বলছিলো লোকেরা হাত-পা নেড়ে ছিলো কিভাবে, সবই নিশ্চয়ই মনে পড়ছে?
ধীরে ধীরে মেবিডিথ ব্লেক বললেন, বলতে পারেন তা। তবে বাদ পড়ে যেতে পারে মাঝে মাঝে হয়তো মনে পড়তে পারে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলোই। ধরুন ক্যারোলিনকে ছেড়ে দিতে চাইছে অ্যামিয়াস একথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম ভীষণ, অথচ মনে পড়ছে না আমার ঐ ছাড়াছাড়ির কথাটা আমি শুনেছিলাম কার কাছ থেকে অ্যামিয়াস, না এলসা? অবশ্য মনে আছে এটাও যে এলসাকে আমি চেষ্টা করেছিলাম বোঝাবার ও কিন্তু হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলো আমার কথা সেকেলে পন্থী নাকি আমি। ঠিক কথাটা, সেকেলে পন্থা আমি, তবে ভুল ছিলো না আমার বক্তব্যটাও, স্ত্রী মেয়েকে ছেড়ে বিয়ে অন্য কাউকে করতে চাওয়াটা ঠিক হয়নি অ্যামিয়াসের পক্ষে।
হ্যাঁ, ঘটনাটা তবে মনে রাখবেন ষোলো বছর আগেকার, এখনকার মতো সহজে তখনকার দিনে বিবাহ বিচ্ছেদ হতো না। অথচ আধুনিক হতে চেয়েছিলো এলসা, ওর মতে স্বামী-স্ত্রী যদি একসঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারে তাহলে বিচ্ছেদ হওয়াই ভালো। যেহেতু একদিনও ঝগড়া না করে অ্যামিয়াস আর ক্যারোলিন কাটাতে পারছিলো না, তাই ছাড়াছাড়ি হওয়াটাই মঙ্গলজনক সন্তানের মুখ চেয়েই।
এবং আপনার মনোমত হয়নি এলসার যুক্তিটা? প্রশ্ন করলে পোয়ারো।
ধীরে ধীরে মেরিডিথ ব্লেক বললেন, সব সময়ে আমার কেমন যেন মনে হয়েছিলো নিজেই জানে না এলসা সে কি বলছে। কিছু বইপড়া, কিছু শোনা কথা বন্ধু-বান্ধবের মুখে তোতাপাখির মতো আওড়ে যেতো। কথায় একটা গভীর দুঃখের ব্যাপার ছিলো ওর ব্যাপারে। অথচ কম বয়সী খুব আত্মবিশ্বাসী খুবই। একটা নিজস্ব ধর্ম আছে যৌবনের, মিঃ পোয়ারো তাই না–সব কিছুকে দারুণভাবে নাড়িয়ে দেয়।
অথচ কাজটা ভালো করছে না অ্যামিয়াস, বয়সের তফাৎ দুজনের মধ্যে প্রায় কুড়ি বছর…ওদের ব্যাপারে এইসব মনে করে নাক গলাতে গিয়েছিলাম। হয়নি ফল, কখন হতও না। আমি কাউকে ঠিক মত কিছু বোঝাতে পারি না।
নিজের যে দুর্বলতার সমালোচনা মেরিডিথ করছেন বুঝতে পেরে পোয়ারো পাল্টাতে চাইলো প্রসঙ্গটা–এখনও আপনার ঐ ওষুধ বিষুধের ল্যাবরেটরিটা আছে?
কড়া জবাব এলো সঙ্গে সঙ্গে, না। নষ্ট করে ফেলেছি সব, ওসব ঐ ঘটনার পর আর কেউ রাখে। বলতে পারেন আপনিও তো আমি ওই ব্যাপারটার মুলে ছিলাম।
না, না মিঃ ব্লেক। দেখছি আপনি বড় বেশি স্পর্শকাতর। কিন্তু বুঝতেই বা-আপনি পারছেন না কেন যদি আমি ঐ নোংরা জিনিসগুলো সংগ্রহ করে রাখতাম তাহলে তো ঘটতো না দুর্ঘটনাটা। আমি উল্টে অহংকার করে জাহির করার জন্যে নিজের বিদ্যে লেকচার দিয়েছিলাম কোনাইন সম্বন্ধে। কাজ করেছিলাম কী বোকার মতোই না। এমনকি লাইব্রেরি ঘরে ফিরে গিয়ে একটা অংশ পড়ে শুনিয়েছিলাম ওদের বই থেকে, যেখানে ফিডো সক্রেটিসের মৃত্যু বর্ণনা করছে। রচনাটা অসাধারণ। কিন্তু ঐ দৃশ্যটা তারপর থেকে আমায় হানা দিয়ে আসছে বারবার।
কার আঙুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছিলো কোনাইনের বোতলে।
ক্যারোলিন ক্রেলের।
আপনারটা নয় কেন?
সেদিন আমি বোতলটা ধরিনি, তাছাড়া এর ৫-৬ দিন আগেই ঝাড়ামোছা করেছিলাম সব। আমার সব কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা স্বভাব।
তালা বন্ধ রাখতেন ঐ ঘরের দরজা?
অবশ্যই।
আপনার ল্যাবরেটারি থেকে কখন ক্যারোলিন ক্রেল কোনাইন চুরি করেছিলেন?
মেরিডিথ ব্লেক খুব অনিচ্ছা নিয়ে উত্তর দিলেন, সবার শেষে ঘর থেকে বেরিয়েছিলো। ক্যারোলিনই। ওকে ডেকেছিলাম আমি। খুব তাড়াতাড়ি হেঁটে এলো ও, চোখে মুখে উত্তেজনা।
আচ্ছা, আপনার সঙ্গে সেদিন ওদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছিলো?
মেরিডিথ গলা নামিয়ে উত্তর দিলেন, সোজাসুজি হয়নি। ও যে মনের দিক দিয়ে খুব বিপর্যস্ত ছিলো আগেই একথা তো বলেছি। এক সময়ে আমরা দুজনে যখন শুধু একটু একলা ছিলাম, ক্যারোলিনকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিছু কি ঘটেছে নাকি, ও বলেছিলো তার উত্তরে, ঘটে গেছে তো সবকিছুই……বুঝতে পারতেন ওর কথাটা শুনলে কেমন হতাশ হয়ে গিয়েছিলো ও।
