পোয়ারো মন্তব্য করলো, এতো বেশি দুঃখ কষ্টের বোঝা সতোর জন্যে।
এই মন্তব্যটার মানে মেরিডিথ ঠিক মতো বুঝতে না পেরে একটু দ্বিধার সঙ্গে বললেন, সেই সময়টা আমাদের কাছে ছিলো খুবই খারাপ।
একমাত্র অ্যামিয়াস ক্রেলকে ঐ পরিস্থতিটা প্রভাবিত করেনি, বললো পোয়ারো।
এবং কেন, এই জন্যে যে ও ভীষণভাবে অহংকারী ছিলো। এখন মনে পড়ছে ওর একটা কথা, ও আমায় হাসতে হাসতে বলেছিলো মেরিডিথ চিন্তা কোরো না, মিটে যাবে সব সমস্যাই।
পোয়ারো আপন মনে বললো, আশাবাদী অবিশ্বাস্য রকমের।
সেই ধরনের পুরুষ ছিলো অ্যামিয়াস যারা কখনই যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে মেয়েদের গ্রহণ করে না। ওকে জানিয়ে দেওয়া আমার উচিত ছিলো যে মরিয়া হয়ে উঠেছে ক্যারোলিন।
আপনাকে কি ক্যারোলিন তেমন কোনো কথা বলেছিলেন?
না ঐ ভাষায় ঠিক নয়। তবে বিকেলবেলায় সেদিন যেমন থমথমে ওর মুখ দেখেছিলাম ওই রকম প্রতিদিন দেখতাম। বেশি বড় হাসছিলো আর কথা বলছিলো। কিন্তু মানসিক যন্ত্রণার ছাপ চোখের তারায় ফুটে উঠেছিলো। আহা বেচারি!
মিনিট দুই কোনো কথা বললো না এরকুল পোয়ারো। পরের দিন যে মহিলাটি তার স্বামীকে খুন করতে চলেছেন তার ছবিটি ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন মেরিডিথ।
মেরিডিথ এতক্ষণে অনেক স্বচ্ছন্দ হয়ে এসেছেন, কথা বলে চলেছেন অনর্গল আর পোয়ারো শুনে চলেছে নিবিষ্ট মনে। যেন নিজের মনে মেরিডিথ কথা বলছেন। বলতে লাগলেন এভাবে, উচিত ছিলো আমার সন্দেহ করা। প্রথমে ক্যারোলিনই ঐ নেশা নিয়ে আমার সাথে আলোচনা শুরু করেছিলো। দোষ নেই স্বীকার করতে, তাতে আমি খুব উৎসাহিত হয়েছিলাম। আলাদা একটা নেশা আছে গাছগাছড়া নিয়ে গবেষণা করার। এককালে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো এমন অনেক লতাপাতা আছে। কিন্তু এখন ঔষধ বিজ্ঞানের পাতা থেকে বাতিল হয়ে গেছে। কোনো কোনো গাছপালার কাঁথ দিয়ে করা যায় অসাধ্য সাধন, আশ্চর্য লাগে ভাবলেও। এসব জানা থাকলে অর্ধেকের বেশি রোগে ডাক্তারই ডাকতে হয় না।
এই তো কাগজে সেদিন পড়েছিলাম কতো ভেষজ বাতিল ঔষুধ ব্যবহার করছেন ডাক্তাররা। আর পাচ্ছেন সুফলও। কিন্তু আমি সাধনা করে যাচ্ছিলাম নিজের জন্যে, সমাজের যেটুকু উপকারেই আসি না কেন। তাছাড়া শেকড়-বাকড় সংগ্রহ করা, জাল দেওয়া সেগুলো থেকে নির্যাস বের করা, কম আনন্দ পাওয়া যায় না এই ধরনের বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকর্মে। মনে আছে আমার আমি সেদিন চিতি বিষলতার কথা বলেছিলাম। দুবার ফুল ফোটে বছরে, পেকে ফলগুলো হলদে সবার আগই তুলে নিতে হবে। আজকাল উঠে গেলেও কোনাইনের ব্যবহার, অব্যর্থ ফল দেয় হুপিংকাশি, হাঁপানিতে।
পোয়ারো প্রশ্ন করলো, এতো কথা নিয়ে আপনার ল্যাবরোটারিতে আপনি আলোচনা করেছিলেন।
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হ্যাঁ সব দেখিয়েছিলাম, কি কি কাজ নানা ওষুধের তা বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম। বিষের কথা উঠলো কথা প্রসঙ্গে। নাম করলাম বেলেডোনা অ্যাট্রোপিনের। খুব আগ্রহ দেখাচ্ছিলো ওরা।
ওরা? কাদের কথা বলছেন ওরা বলতে, যেন একটু আশ্চর্য হলেন মেরিডিথ ব্লেক, ধারণা ছিলো তার সেদিনের কথা পোয়ারো সবটাই জানে।
ওহ, পুরো দলটা। বলছি, দাঁড়ান, ফিলিপ, অ্যামিয়াস, ক্যারোলিন, অ্যাঞ্জেলাও ছিলো। আর এলসা গ্ৰীয়ার ছিলো।
ব্যাস, মাত্র এই ক’জন?
হা, মনে পড়ছে তাইতো, নাহ, ভুল হচ্ছে না তো। কেন কেউ কি আর থাকতে পারে?
মনে হয়েছিলো আমার খুব সম্ভব গভর্নেস…।
ওহ বুঝেছি, নাঃ গভর্নেস সেদিন বিকেলে ছিলো না। দেখছি নামটাও ভুলে গেছি। চমৎকার মহিলা, ভীষণ সজাগ নিজের কর্তব্য সম্বন্ধে। ওকে খুব জ্বালাতো অ্যাঞ্জেলা মনে হয়।
কিন্তু কেন?
দেখুন, বেশ ভালোই ছিলো মেয়েটা। তবে ওর মাথায় মাঝে মাঝে চাপতো ভূত। একটা না একটা সব সময় পিছনে লেগে থাকতো। অ্যামিয়াস খুব পরিশ্রম করে একদিন একটা ছবি আঁকছিলো, টেবিলের ওপর অ্যাঞ্জেলা রেখে এসেছিলো একটা ছোট শামুক। অ্যামিয়াস সেদিন দারুণ ক্ষেপে গিয়েছিলো, তারপরেই তো মেয়েটাকে স্কুলে পাঠাতে হবে ঠিক করে।
স্কুলে পাঠালো অ্যাঞ্জেলাকে? হ্যাঁ, অবশ্য তার মানে আমি এ বলতে চাইছি না যে ওকে ভালোবাসতো না অ্যামিয়াস। বাসতো ঠিকই, তবে দুষ্টুমি করতো যে বড্ড। আর মনে হতো আমার…
আপনার কি মনে হতো?
অ্যাঞ্জেলাকে যেন অন্ধের মতো ভালোবাসতো ক্যারোলিন, সেটা সহ্য করতে পারতো না অ্যামিয়াস। অবশ্য একটা কারণ তারও আছে, আমি সেটা বলতে চাই না এখন, কিন্তু…।
বাধা দিলো পোয়ারো, কারণটা এই যে একাকার রেগে গিয়ে ক্যারোলিন একটা এমন কাণ্ড করেছিলেন যার ফলে বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো মেয়েটার মুখ।
ওঃ তাহলে আপনি কারণটা জানেন দেখছি। ওটা আমি আর নিজের মুখে বলতে চাইছিলাম না। অতীতের জন্যে অতীতের কথা থাকাই ভালো। হ্যাঁ, ক্যারোলিন ঐ কারণে অ্যাঞ্জেলা সম্বন্ধে ও, যা করেছে তা যেন কিছুতেই পর্যাপ্ত নয় মনে করতো।
পোয়ারো ঘাড় নাড়লো চিন্তা করতে করতে, আর অ্যাঞ্জোলা? তার কি কোনো রাগ ছিলো সৎ বোনের বিরুদ্ধে?
না, না, চিন্তা করবেন না ওসব। দিদিকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতে অ্যাঞ্জেলা। ও আদৌ পুরোনো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাতো না। বরং ক্যারোলিনই বলা যায় যেন ঘটনাটা ভুলতে পারতো না।
অ্যাঞ্জেলা বোর্ডিংয়ে পাঠানোর ব্যাপারটা কি ভালো মনে নিয়েছিলো?
