ওঁর কথা পোয়ারো বুঝতে পারছে কিনা ঐভাবে তাকাতেই ঘাড় নাড়লো সে, অর্থাৎ বুঝেছে।
বুঝতে পেরেছেন দেখছি আপনি। এবার মনে হয় বুঝতে পারছেন আপনি ঐ রকম, কেন হয়েছিলো পরিস্থিতিটা, ঐ মেয়েটার প্রেমে পড়েছিলো অ্যামিয়াস, পাগল হয়ে উঠেছিলো বিয়ে করার জন্যে। মেয়েটার জন্য এমনকি বৌ-মেয়েকেও রাজী ছাড়তে। কিন্তু ছবি আঁকতে যেহেতু শুরু করেছে তাই শেষ না করা পর্যন্ত ওটা অন্য কোনো চিন্তায় ঠাই পাচ্ছিলো না ওর মাথায়। আর ওর ঐ ব্যবহারের সঙ্গে যে জড়িত দুটি মহিলা অ্যামিয়াস সেটাও খেয়াল করতে চেষ্টা করেনি।
মিঃ ক্রেলের মনের কথা মহিলা দুজনও কি বুঝতে পারেননি? জানতে চাইলো পোয়ারো।
হ্যাঁ, একদিক দিয়েই তো বটেই। বোধহয় এলসা মেয়েটি বুঝতে পেরেছিলো। ও পাগলের মতো ভালোবাসতো অ্যামিয়াসের ছবি আঁকার ব্যাপারটাকেও এবং স্বভাবতই বেশ কঠিন হয়ে উঠেছিলো ওর অবস্থা। আর ক্যারোলিন…।
…ক্যারোলিন, দেখুন…আমি সব সময়ই ক্যারোলিনকে পছন্দ করতাম। সময় ছিলো একটা…আমি যখন…ওঁকে আমি চেয়েছিলাম বিয়েও করতে। কিন্তু অঙ্কুরেই সে ব্যাপারটা বিনাশ হয়ে গিয়েছিলো। তবুও…তবুও…ওর কাজে লাগতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করতাম।
মাথা নাড়িয়ে পোয়ারো সায় দিলেও চিন্তা করতে লাগলো মনে মনে মেরিডিথের শেষ কথাটা নিয়ে। প্রাচীনপন্থী একটু অভিব্যক্তি হলেও প্রেমের ব্যাপারে উনি যে দারুণ রোমান্টিক আর আত্মনিবেদিত একথা তার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রেমে প্রতিদান পাবার আশা না করেই, নিজেকে সমর্পণ করতে পারার মতো মানুষ এই মেরিডিথ। পোয়ারো বললো খুব সাবধানে, এই যে মহিলাটির প্রতি…অবিচার যে করা হচ্ছিলো…আপনি তার প্রতিবাদ নিশ্চয়ই করেছিলেন?
হা করেছিলাম। আমি বলতে গেলে অ্যামিয়াসকে এ ব্যাপারে বেশ বকাবকিও করেছিলাম।
কবে?
ঐ ঘটনাটা যেদিন ঘটালো ঠিক তার আগের দিন। আমার এখানে ওরা এসেছিলো চায়ের নেমন্তন্ন রাখতে। অ্যামিয়াসকে আমি আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলাম খোলাখুলি। এমন কি বলেছিলাম এও যে, ও ভালো করছে না কাজটা।
এই কথাই তাহলে আপনি বলেছিলেন?
হা, কথাটা ওর কানে ঢুকেছিলো আমার মনে হয় না।
ঢোকেনি সম্ভবতঃ, বললো পোয়ারো।
ব্যাপারটা ক্যারোলিনের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে আমি বলেছিলাম। যদি বিয়ে করতেই চাও ঐ মেয়েটাকে, কেন এক বাড়িতে রেখেছে, নির্লজ্জের মতো ক্যারোলিনের চোখের সামনে এমনভাবে নিজেকে কেন জাহির করছো? কেউ সহ্য করতে পারে না এ অপমান।
কৌতূহল বাড়ছে পোয়ারোর।
অ্যামিয়াস তার উত্তরে কী বলেছিলেন?
মেরিডিথ নাক কুঁচকে বললেন, অ্যামিয়াস বলেছিলো–এটা মেনে নিতে হবে ক্যারোলিনকে।
ভ্রূ বেঁকে উঠলো পোয়ারোর, উত্তর কী নিষ্ঠুরের মতো।
ঘেন্না ধরে গিয়েছিলো তো আমার। ঠিক রাখতে না পেরে মেজাজে বলেছিলাম যেমন সে বুঝতে পারে না নিজের স্ত্রীকে কতটা কষ্ট দিচ্ছে, ঠিক তেমন চিন্তা করছে না কেন ঐ এলসা মেয়েটার কথাও। অবস্থাটা যে ওর পক্ষে বেশ ঘোরালোলা? আমিয়াস তার উত্তরে বলেছিলো, এটা মেনে নিতে হবে এলসাকেও …তারপর বলেছিলো অ্যামিয়াস, মেরিডিথ তুমি জানো, এখন যে ছবিটা আমি আঁকছি, আমার এটাই হবে সবার সেরা ছবি। এটা অসাধারণ ছবি হচ্ছে, কাজ বন্ধ করতে পারি না দুজন ঈর্ষাকাতর মহিলার জন্যে, না বন্ধ করবো না।
তর্ক করেও কোনো লাভ ছিলো না ওর সঙ্গে। সামান্য ভদ্রতা বোধটুকু পর্যন্ত ভুলে গেছো তুমি, আমি বলেছিলাম। জীবনের সব নয় ছবি আঁকাটাই। আমার কথার মাঝখানে বাঁধা দিয়ে ও বলেছিলো, কিন্তু নিশ্চয়ই আমার কাছে।
আমার রাগ তখনও পড়েনি। বলেছিলাম ওঁকে ওর ব্যবহারটা ক্যারোলিনের সঙ্গে আদৌ ভদ্র নয়। অ্যামিয়াস দুর্বিষহ করে তুলেছে ক্যারোলিনের জীবনটাই। ও বলেছিলো তার উত্তরে, আমি দুঃখিত ওর জন্যে, সত্যিই দুঃখিত। মেরিডিথ আমি জানি আমার কথা তুমি বিশ্বাস করছে না। কিন্তু সত্যি কথাটা। আমি নরক করে তুলেছি ক্যারোলিনের জীবন। তবে দেবীর মত সর্বংসহা ও যেন। ওকে আমি আমার সব কথাই বলেছি উচ্ছঙ্খল জীবনের।
তারপর কড়াভাবে আমি অ্যামিয়াসকে বলেছিলাম, আর যাই করুক যেন নষ্ট না করে বিবাহিত জীবনটা। মেয়েটার কথাতো সবার ওপরে চিন্তা করতে হবে। আরও বলেছিলাম আমি, এলসার মতো মেয়েরা বুঝতে পারছি মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে পুরুষের। তবুও বিয়ের মতো ব্যাপারটাকে তার জন্যে নষ্ট করা উচিত নয়। খুবই কম এলসার বয়স। হয়তো এখন ওর পছন্দ হচ্ছে এই টাক মাথাকেই। নিশ্চয়ই এর জন্যে পরে পস্তাবে। এই সম্পর্কটা তুমি ভেঙে দিয়ে ফিরে যাও স্ত্রীর কাছে।
অ্যামিয়াস তার উত্তরে কি বললেন? ও যেন বেশ অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে মনে হচ্ছিলো। আমার কাঁধ চাপড়ে বললো, মেরিডিথ তুমি খুব ভালো মানুষ, তবে আবেগে ভরা বড় বেশি। অপেক্ষা করো ছবিটা শেষ হওয়া পর্যন্ত। স্বীকার করবে তখন আমি ভুল করিনি।
গোল্লায় যাক তোমার ছবি। আমি বলেছিলাম। অ্যামিয়াস চাপা হাসি হেসে বলেছিলো যে সব মানসিক বিকারগ্রস্ত ইংল্যান্ডের মেয়ে মানুষরা তা করতে পারে না। আমি তখন বললাম –অন্ততঃ ক্যারোলিনকে ছবিটা শেষ হওয়া পর্যন্ত এর থেকে দূরে রাখতে পারতে। আমার কোনো দোষ নেই এতে। বলেছিলো অ্যামিয়াস। নিজেই গোপন ব্যাপারটা এলসা ফাস করে দিয়ে লজ্জায় ফেলতে চেয়েছিলো ক্যারোলিনকে। কেন, অ্যামিয়াস প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলো সব কিছু খোলামেলাভাবে এলসা করতে চাইতো। একথা ঠিকই যত খারাপই হোক না কেন ওর আচরণে এলসা নিজের সততা বজায় রাখতে চেয়েছিলো।
