দুটি কমবয়েসী ভাই এখানে এই হ্যাণ্ডক্রশ ম্যানরে থাকতেন, অ্যাল্ডারবেরিতে প্রায়ই যেতেন, ঠাট্টা তামাশা, গল্প করতেন, টেনিস খেলতেন, অ্যামিয়াস ক্রেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গাঢ় করে তোলবার চেষ্টা করতেন, এমনকি ক্যারোলিনের সঙ্গেও। এই জমিদারী প্রাসাদ থেকেই সেই অভিশপ্ত সকালে অল্ডারবেরিতে গিয়েছিলেন মেরিডিথ, প্রায় সোল বছর আগে। যে মানুষটা খানিকটা অস্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে তাকে ভদ্রভাবে স্বাগত জানাচ্ছেন তাকে পোয়ারো খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করতে লাগলো।
অনুমান করেছিলো যা ঠিক তাই–মেরিডিথ ব্লেক ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলের জমিদারদের মতোই খোলামেলা আচরণের মানুষ এবং আকর্ষণ খুব বেশি বাইরের জগতের প্রতি।
একটা পুরানো টুইড কোট গায়ে মাটি আবার ঝুলঝুলে, রোদে জলে মানুষ হওয়া হাসি খুশি একটা মানুষ, হারিয়ে গেছে গোঁফের আড়ালে মেরিডিথ ব্লেক সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। তার ছোট ভাই ফিলিপ ব্লেকের থেকে একটু দ্বিধার ভাব স্বভাবে, মনে হয় ইনি বয়সের ভাবের শ্লথ হয়ে এসেছেন যেমন, আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছেন ছোট ভাই।
তাড়াহুড়ো করলে এক্ষেত্রে ফল পাওয়া যাবে না। পোয়ারো বেশ চিন্তা করে ঢিলে-ঢালা ভাবে শুরু করলো এগোতে। মাত্র কয়েক বছরের বড় হলেও মেরিডিথকে অনেক বেশি বুড়ো দেখায়।
রক্ত আছে জমিদারী আভিজাত্য। এমন ভদ্রলোককে বশ করতে পেরেছে বেশ কায়দা করে, পোয়ারো দেখে মনে মনে খুশি। লেডী মেরী আর অ্যাডমিরাল ক্রনশ ছাড়াও প্রসঙ্গ এলো এমন কিছু নামকরা লোকের যাঁদের চেনেন দুজনেই। পোয়ারোর পরিচিতি দেখে মেরিডিথ খুশি মোটামুটি।
বেশ সভ্যভব্য ভাবে পোয়ারো ব্যক্ত করলো আগমনের উদ্দেশ্যটা। মিস ক্রেল–মিস লেমার চেণ্টের সনির্বন্ধ অনুরোধে লিখতে হবে বইটি। কোনো ভুলভ্রান্তি, অতিশয়োক্তি যাতে না হয় তার জন্যে সাবধান হয়…।
মেরিডিথ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন পোয়ারোর কথা শেষ হবার আগেই, এতো নরকঘাঁটা মশাই একেবারে, যো…লো…বছর আগে কি ঘটেছে, তা নিয়ে এতোদিন পরে খোঁচাখুঁচি করার কোনো মানে দেখি না আমি।
পোয়ারো অসহায়ের ভঙ্গীতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, আমি একমত আপনার সঙ্গে, তবে চাহিদা ঐ ধরনের জিনিসের আছে বলেই তো নতুন ভাবে অতীতের ঘটনাকে পরিবেশন করতে হচ্ছে।
এটা খুবই অপমানজনক মনে হচ্ছে আমার কাছে।
বিড়বিড় করে পোয়ারো বললো, আমি সত্যিই দুঃখিত। একটা দারুণ নিষ্ঠুর জগতে বাস করতে হচ্ছে আমাদের। মিঃ ব্লেক আশ্চর্য হবেন শুনলে এরকম কতো আসল রূপ অপ্রীতিকর ঘটনার আবিষ্কার করে জীবনকে আমি সহজতর করে তুলেছি অনেকটা। উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তার হাত থেকে এ ব্যাপারে মিস ক্রেলকে মুক্তি দিতে আমি উৎসুক ভীষণ ভাবে।
আপন মনে বললেন মেরিডিথ, সেই বাচ্চাটা ছোট্ট কার্লা। বেশ বড়সড়ো তো হয়ে উঠেছে এখন নিশ্চয়ই। বিশ্বাসই করা যায় না…।
জানি হু হু করে তো সময় কেটে যায়, তাই না?
বড় বেশি হু হু করে..দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেরিডিথ বললেন।
চিঠিটাতো মিস কার্লার আপনি পড়লেন, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আপনি ঐ অতীতের ঘটনাটা সম্বন্ধে বিস্তারিত সব কিছু জানবার জন্যে খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন উনি।
মেরিডিথ বিরক্ত হয়ে বললেন, কেন? নতুন করে খোঁচানো কেন আবার? কি প্রয়োজন অতীতকে নতুন করে জানবার?
ভালো করে অতীতটাকে জানেন বলেই আপনি একথা বলতে পারছেন মিঃ ব্লেক। কিন্তু মিস কার্লা একবার ভেবে দেখুন কিন্তু জানে না কিছুই। কতটুকু আর থাকে সরকারী নথিপত্রে।
সত্যি আমি একেবারে বেচারি মেয়েটার কথা গিয়েছিলাম ভুলে। সত্যিই খুব খারাপ ওর অবস্থাটা। নিশ্চয়ই মনে খুব দুঃখ পেয়েছে সত্যি কথাটা জানার পর।
আইনের কচকচানিতে শুধু কিন্তু সত্যের প্রতি সুবিচার করা যায় না। সবচেয়ে বেশি যে জিনিসগুলো দরকার সেগুলোকেই দেওয়া হয় বাদ–মনের আবেগ, অনুভূতি, নাটকের পাত্রপাত্রী, কমাতে পারে অপরাধের গুরুত্ব এমন অবস্থা…।
পোয়ারো চুপ করলো এতোটা বলে, সহ অভিনেতার মতো সঙ্গে সঙ্গে কথার খেই ধরে শুরু করলেন বলতে মেরিডিথ, এমন অবস্থা কমাতে পারে অপরাধের গুরুত্ব। ঠিক তাই। যদি সত্যি ঐ ধরনের অবস্থা থাকে, তবে নিশ্চয়ই এক্ষেত্রে তা ছিলো। আমার পুরানো বন্ধু ছিলো অ্যামিয়াস ক্রেল, আমাদের পরিবারের পরিচয় ওদের পরিবারের সঙ্গে বহু যুগের, তবে খোলাখুলি একথা স্বীকার করতেই হবে যে ভালো ছিলো না ওর স্বভাব, শিল্পী ছিলো, সে বিষয়ে সন্দেহই নেই কোনো, এবং বোধহয় সেইজন্যই তার ঐ ধরনের চরিত্র ছিলো। ঐ ধরনের অদ্ভুত পরিস্থিতি মাঝে মাঝে ও সৃষ্টি করে ফেলতো। সাধারণ ভদ্রলোক সে পরিস্থিতি কখনই কল্পনা করতে পারে না।
আমার আগ্রহ বাড়ছে আপনার মুখে একথা শুনে। মাঝে মাঝে আমি তালগোল পাকিয়ে ফেলছিলাম, মানে ঐ পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে, তবে মানুষ ভাল বংশের। জাগতিক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ নিশ্চয়ই ওঁর মতো করবেন না।
মেরিডিথের রোগা মুখটার মধ্যে এতক্ষণ দ্বিধার ভাব ছিলো, এবার কেটে গিয়ে সেটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললেন, তবে আসল ব্যাপারটা হলো সাধারণ মানুষ ছিলো না অ্যামিয়াস। শিল্পী মানুষ, শিল্পকে জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতো। আমি এইসব শিল্পী-টিল্পীদের ঠিক বুঝতে পারিও না, পারিনি। তবে ক্রেলকে আজীবন বন্ধুত্ব সূত্রে বুঝতে পারতাম একটু-আধটু। ওকে জন্ম থেকে চিনি তো, আমাদের খুব মিল আছে ওদের আচার-ব্যবহারের সঙ্গে। ও ষোলআনা খাঁটি মানুষ শিল্পী অ্যামিয়াসকে বাদ দিলে, আমাদেরই মতো পুরোপুরি। তাছাড়া সৌখীন শিল্পী ও আবার ছিলো না, অ্যামিয়াস একটা প্রতিভা সবাই বলতো। হয়তো ঠিক, এবং সেই কারণেই বোধহয় ও ছিলো অস্থিরচিত্ত একটু বেশি। ও অন্য জগতের মানুষ হয়ে যেতো ছবি আঁকার সময়, ঘুরে বেড়াতো স্বপ্নের রাজ্যে। অ্যামিয়াস আবার বাস্তব জগতে ফিরে আসতে ছবি শেষ হলে।
