স্বীকার করলো পোয়ারো, সত্যিই অসাধারণ। তারপর সিগারেট ধরালেন দুজনে।
এবং এই সেই অসাধারণ শিল্পী…এই গোলাপের ছবি যে এঁকেছিলো, কয়েকটা আরও বিখ্যাত ছবি সৃষ্টি করেছিলো–এমন অকাল মৃত্যু কিনা তার? শেষ পর্যন্ত ওর মতো প্রাণবন্ত শিল্পী কিনা ঈর্ষা আর হিংসার যূপকাষ্ঠে বলি হয়ে গেলো…।
আমি খুব কড়াকড়ি কথা বলছি আপনি বলবেন–বলবেন আমি অকারণে অকরুণ হচ্ছি ক্যারোলিনের প্রতি। ওর ছিলো মোহিনী শক্তি সেটা আমি নিজেই অনুভব করেছি। তবে সূক্ষ্ম আবরণের আড়ালে তার যে আসল একটা কুটিল নিষ্ঠুর মন লুকিয়ে আছে আমি সেটা বুঝতে পেরেছিলাম…।
হঠাৎ পোয়ারো বলে উঠলো, অথচ বলা হয়েছে আমাকে যে ক্যারোলিনের বিবাহিত জীবনে ক্রেলকে অনেক দুঃখকষ্ট সহ্য করতে হয়েছিলা?
ঠিক তাই, আর ঠিক এটাও যে সবাইকে সে কথা জানাতেও ক্যারোলিন কসুর করেনি। সে যেন সব সময়েই শহীদের ভূমিকা নিয়ে থাকতো। বেচারি অ্যামিয়াস, নরকের মতো ছিলো ওর বিবাহিত জীবন, অসাধারণ শিল্প প্রতিভা ছবি আঁকার মতো না থাকলে হয়তো ও পাগল হয়ে যেতো। অ্যামিয়াস তার মুক্তি শিল্প সৃষ্টির মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলো। যখন ও ছবি আঁকার মধ্যে ডুবে যেতো তখন ওকে স্পর্শ করতে পারতো না সাংসারিক কোনো কিছুই। চেঁচামেচি ঝগড়া-ঝাটি ক্যারোলিনের সব কিছুকেই ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে নিজেকে সপে দিতো ছবির মধ্যে। আর ঝগড়া? সাতদিন তো সপ্তাহে হতোই। ক্যারোলিন ওতে আনন্দ পেতো। ক্যারোলিন প্রতিবার ঝগড়ার পর পুঁদ হয়ে থাকতো এক অনাস্বাদিত তৃপ্তির মধ্যে। আর যেন অ্যামিয়াস নিজের মধ্যে থাকতে পারতো না, বিশৃঙ্খলায় ভরে যেতো সব কিছু। শান্তি চাইতো ও, তার বদলে পেতো শুধু অশান্তিতে ভরা জীবন যা কিনা অকারণে তৈরি করা। উচিতই ছিলো না ওর মতো মানুষের বিয়ে করা। বিয়ের বাঁধনে ধরা দেওয়া এই ধরনের শিল্পীদের উচিত নয়।
আপনি কি এলসা গ্ৰীয়ারের সঙ্গে ওর সম্পর্কের কথা জানতেন?
মিঃ পোয়ারো দেখুন ও আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। আর অভিযোগ করার, এসব ব্যাপারে প্রশ্ন ওঠে না, সবই দেখা যায় চোখ থাকলে। তাছাড়া অ্যামিয়াসের লাগানো স্বভাব ছিলো না। তবে মাঝে মাঝে বলতো, যতো নষ্টের গোড়া এই মেয়ে মানুষগুলোই কিংবা; বিয়ে কোরো না ভুলেও, নরক এর থেকে অনেক ভালো।
আপনি কি এলসা গ্ৰীয়ারের সঙ্গে ওর সম্পর্কের কথা জানতেন?
হ্যাঁ, এটা বুঝতে পারতাম যে ক্রমশঃ ওরা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এক অসাধারণ সুন্দর মেয়ের সঙ্গে ও বলেছিলো ওর আলাপ হয়েছে। এর আগে এই ধরনের মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়নি ওর। ওর কথায় আমি যে গুরুত্ব দিতাম তা নয়, কারণ মাঝে মাঝে ও এই ধরনের কথা বলতো। ওর সঙ্গে মাঝে মাঝে এই ধরনের অসাধারণ মহিলার পরিচয় ঘটতো।
আবার মাসখানেক পরে হাঁ করে চেয়ে থাকতো অ্যামিয়াস সেই মেয়েটির কথা তুললে কারণ সে ভুলে বসে আছে ইতিমধ্যে। তবে সত্যিই অন্য ধরনের মেয়ে ছিল এলসা গ্ৰীয়ার, যখন আমি কিছুদিন অ্যাল্ডারবেরিতে কাটাতে এসেছিলাম, তখন দেখা হয় ওর সঙ্গে এবং আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরেছিলাম অসাধারণ মেয়ে। অ্যামিয়াসকে মেয়েটা ভালোমতোই ফেলেছিলো গেঁথে।
তাহলে এলসা গ্ৰীয়ারকেও দেখছি পছন্দ হয়নি আপনার, বললো পোয়ারো।
পছন্দ হয়নি। পুরোদস্তুর শিকারী মেয়ে ও, একেবারে গ্রাস করে নিতে চেয়েছিলো অ্যামিয়াসকে। তবে আমার মতে এলসা মেয়েটা অনেক ভালো হতো অ্যামিয়াসের জীবনে ক্যারোলিনের তুলনায়। আর ঠিক এটাও নিজেকে না জড়ানোই ভালো হতো মেয়েদের ব্যাপারে আমার বন্ধুর পক্ষে। অথচ ঐ ভুলই করে এসেছিলো ও বার বার। অবশ্য অন্য কোনো মহিলা এলসা আর ক্যারোলিন ছাড়া তেমনভাবে জীবনে ছাপ ফেলতে পারেনি অ্যামিয়াসের জীবনে।
জানতে চাইলো পোয়ারো তার মেয়েকে অ্যামিয়াস ভালোবাসতেন কিনা।
অ্যাঞ্জেলাকে? আহ। অ্যাঞ্জেলাকে সবাই আমরা ভালোবাসতাম। দারুণ ফুটফুটে মেয়ে। রোজ ওর গভর্নেসের জীবন দুর্বিষহ করে তুলতো। হ্যাঁ, অ্যাঞ্জেলাকে ভালোবাসতো অ্যামিয়াসও তবে রেগে যেতো খুব বাড়াবাড়ি করলে। আর কি আশ্চর্য ক্যারোলিন এসে তখন অ্যাঞ্জেলাকে আড়াল করে দাঁড়াতো। ক্যারোলিন আর অ্যামিয়াসের মধ্যে তাই নিয়ে মাঝে মাঝে মন কষাকষি হতো। আবার খবরদারী খুব বেশি করতো বলে অ্যাঞ্জেলাও আমিয়াসের ওপর চটে থাকতো। ঐ বছরের শরৎকালে অ্যামিয়াস নিজে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, ফলে আরও ক্ষেপে ওঠে মেয়েটা। মেয়েটা স্কুলে যেতে ভালোবাসত না তা নয়, কিন্তু অ্যামিয়াস যেভাবে জোর করে অ্যাঞ্জেলাকে পাঠাচ্ছিলো, তার ফলে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে মেয়েটা। অ্যাঞ্জেলা বদলা নেবার জন্য নানারকম বদমাইসিও করছিলো। মেয়েটাকে সামলানো যাচ্ছে না গভর্নেস সিসিলিয়াও বলেছিলেন।
পোয়ারো বললো ফিলিপ একটু থামতেই, জানতে চেয়েছিলাম আমি তার মেয়েকে অ্যামিয়াস ভালোবাসতেন কিনা, মেয়ে বলতে তার নিজের মেয়ের কথা আমি বলছিলাম।
ও। আপনি কার্লার কথা বলছিলেন, ওকে ভীষণ ভালোবাসতো। ভালো মেজাজ থাকলে মেয়ের সঙ্গে খুব খেলতো। তবে যদি আপনি ভেবে থাকেন তেমন ভালোবাসলে মেয়েকে এলসাকে আটকাতো বিয়ে করাটা? না, অ্যামিয়াস মেয়েকে তেমনভাবে ভালোবাসতো না।
