ফিলিপ ব্লেক উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ালেন, পায়চারি করতে করতে বললেন, কী ভাবছেন মশাই এ ব্যাপারটা নিয়ে? আপনার কি ধারণা আমি চিন্তা করিনি? আমি জানতাম, আমার ওকে বাঁচাবার সুযোগ ছিলো। তা না করে অকারণে দাদার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে রইলাম। চুরি করেছে বিটা ক্যারোলিন, এবং ওটাকে কাজে লাগাবেই সে দেরী না করে। আর ঠিক হলোও তাই। ক্যারোলিন প্রথম সুযোগেই কাজ সেরে ফেললো। জানতাম আমি জানতাম যে বেশ বিপদ ঘনিয়ে আসছে অ্যামিয়াসের, অথচ আমি কিছুই করিনি…।
মিঃ ব্লেক অযথা দোষ দিচ্ছেন নিজেকে, আপনার হাতে যথেষ্ট সময় ছিলো না…।
ফিলিপ মাঝপথে বাঁধা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, আমার হাতে যথেষ্ট সময় ছিলো। বলতে পারতাম অ্যামিয়াসের কাছে গিয়ে, অবশ্য ও হয়তো বিশ্বাস করতো না। হেসে উড়িয়ে দিতো নিজের বিপদের কথা উঠলে। কত বড় যে শয়তান ছিলো ক্যারোলিন একথা কোনোদিনও বুঝতে পারেনি অ্যামিয়াস। বোঝার চেষ্টাও করেনি। অবশ্য আমি ক্যারোলিনের কাছে গিয়েও বলতে পারতাম কোনাইন চুরি গেছে দাদার ল্যাবরেটরি থেকে, যদি অ্যামিয়াস বা এলসা কেউ মরে তবে কেউ ওকে বাঁচাতে পারবে না ফঁসীর দড়ি থেকে, কাজ হতে পারতো এতে। তাছাড়া জানিয়ে দেওয়া যেত পুলিশকেও যে চুরি গেছে বিষ। করা যেতো অনেক কিছুই। শুধু করা যায়নি দাদার জন্যে। বাড়ির বড় ছেলে দাদা। পেয়ে গিয়েছিলো বেশ খানিকটা সম্পত্তিও, কুঁড়েমি আর নড়বড়ে ভাব সব কাজে। এই ঘটনাটা ঘটে গেলো দাদা দেরী করলো বলেই।
আপনার মনে তাহলে একটুও সন্দেহ নেই যে কে চুরি করেছিলো বিষটা? প্রশ্ন করলো পোয়ারো।
নিশ্চয়ই না এটা ক্যারোলিনের কাজ সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরেছিলাম। আমি যে খুব ভালোভাবে ক্যারোলিনকে চিনি।
ব্যাপারটা ভারী ইন্টারেস্টিং তো। কি ধরনের মহিলা ছিলেন ক্যারোলিন ক্রেল একটু বলবেন কি মিঃ ব্লেক?
লোকে মনে করেছিলো মামলা চলার সময় ও একটা নিষ্পাপ মহিলা অকারণে আঘাত পাওয়া। কিন্তু ওরকম আদৌ ক্যারোলিন ছিলো না।
তাহলে উনি কেমন ছিলেন?
ফিলিপ তীক্ষ্ণভাবে বললেন, আপনি কি সত্যি সত্যিই জানতে চান তা?
অবশ্যই।
সম্পূর্ণ বিকৃত চরিত্রের এক মেয়ে মানুষ ছিলো ক্যারোলিন। ওর ব্যবহার সুন্দর ছিলো মনে রাখবেন। এমন একটা মিষ্টিভাব ছিলো ব্যবহারে সবাই যাতে প্রতারিত হয়। এমন একটা হতাশার ভাব চোখের দৃষ্টিতে ফুটে থাকতো যে সাহায্য করতে সহানুভূতি জানাতে ওকে সবাই ছুটে আসতো আগবাড়িয়ে। ইতিহাস তো এককালে পড়েছিলাম, মেরী, কুইন অফ স্কট মনে হয় ঐ ধরনের মহিলা ছিলেন। সব সময়ে স্বভাবে মধুর বাইরে থেকে। আকর্ষণ চুম্বকের মতো অথচ যেন জড়িয়ে আছে দুর্ভাগ্য এবং ঠান্ডা মাথায় ভেতরে ভেতরে ফন্দী এঁটে চলেছে। কাকে কিভাবে সরিয়ে ফেলা যায়। তাই করেছিলো ক্যারোলিনও প্রচণ্ড বদ স্বভাবের দিক দিয়ে।
ওরা আপনাকে বলেছে কিনা জানি না আমি, তবে প্রশ্নটা মামলা চলার সময় ভীষণ গুরুত্ব পেয়েছিলো–আগে যা বলেছিলো বোনের সঙ্গে ক্যারোলিন তার কথা বলছি। প্রচণ্ড ঈর্ষা আবার বিয়ে করেন ক্যারোলিনের মা, ওর মায়ের অসাধারণ টান দেখে ছোট্ট অ্যাঞ্জেলার ওপর সহ্য করতে পারেনি, ভেঙে দিতে চেয়েছিলো মাথাটা একটা শাবল দিয়ে খুব জোরে লাগেনি ভাগ্য ভালো। বলুন তো কি ভয়ংকর ব্যাপার?
তা তো বটেই, মাথা নেড়ে সায় দিলো পোয়ারো। বুঝলেন, আসল ক্যারোলিন হলো এই। ওকে প্রথম হতে হবে সব ব্যাপারেই। ও কিছুতেই পিছিয়ে থাকতে রাজী নয়। একটা আত্মকেন্দ্রিক অহংকারী শয়তান ওর মধ্যে বাসা বেধেছিলো, ওই পরিণতি তারই।
আবেগপ্রবণ একটু দেখালেও, ও ছিলো ভেতরে ভেতরে দারুণ হিসেবী। ও যখন কম বয়সে অ্যাল্ডারবেরিতে থাকতো তখন সবাইকে আমাদের একবার করে বাজিয়ে নেবার পর ঠিক করেছিলো নিজের প্ল্যান, তখন কোনো টাকা পয়সা ওর ছিলো না। ওর পেছনে অবশ্য আমি কখনই ছুটিনি। বাড়ির ছোট ছেলে হিসেবে তখন আমি তৈরি করতে ব্যস্ত নিজের পথ। (মজার ব্যাপার এই যে আমি এখন মেরিডিথ এবং বেঁচে থাকলে অ্যামিয়াসকেও সামর্থ্য রাখি কিনে নেবার।) মেরিডিথকে প্রথমে বাছলেও ক্যারোলিন বিয়ে করলো শেষ পর্যন্ত অ্যামিয়াসকে। এমনি টাকা পয়সা অ্যাল্ডারবেরি ছাড়া বেশি না থাকলেও অ্যামিয়াস শিল্পী হিসেবে যে নাম করবে এতে ক্যারোলিনের সন্দেহ ছিলো না, জুয়া খেলতে বসে ভাগ্য নিয়ে? ক্যারোলিন অবশ্যই জিতেছিলো, কারণ অ্যামিয়াস পরে অর্থ উপার্জন করে প্রচুর।
অ্যামিয়াস অর্থ এবং প্রতিভার স্বীকৃতি দুটোই পায়। ছবি ওর বিক্রি হতো। আচ্ছা আপনি কি ওর কোনো ছবি দেখেছেন? …আসুন, একটা আছে ওখানে।
ফিলিপ একটা ছবি দেখালেন খাবার ঘরে গিয়ে বাঁদিকের দেওয়ালে যা ঝোলানো ছিলো। আঁকাটা গতানুগতিক। একটা পালিশ করা মেহগিনি কাঠের টেবিলের ওপর রাখা পাত্রে গোলাপফুল। অদ্ভুত রঙ আর কি ব্যবহার তুলির। যেন জ্বলন্ত অগ্নিশিখা গোলাপের গুচ্ছ। তার ছায়া পড়েছে কাঠের পালিশের ওপর। যেন প্রাণের আবেগের স্পর্শে পুরো জিনিসিটাই থরথর করে কাঁপছে।
অনেকক্ষণ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে পোয়ারো ফিরে এলো বসবার ঘরে।
আমি আদৌ ছবিটবি বুঝি না তবে এই ছবিটাকে কি জানি আমি ভীষণ দেখি, দারুণ, অসাধারণ ভাললা…। যেন আপন মনে ফিলিপ ব্লেক বললেন।
