যে সব চালু কথা দিয়ে কথা শুরু করতে হয় সেই ভাবে বললো পোয়ারো, আপনি আমার অবস্থা বুঝতে পারছেন…।
না, বুঝতে পারছি না সত্যি বলছি। এত লোক থাকতে আপনি কেন? আপনি লেখক?
না তা ঠিক নয়…মানে একজন গোয়েন্দা আমি। এর আগে এমন বিনীত ভাবে কখনো কথা বলেছে কিনা সন্দেহ পোয়ারো।
আমরা সবাই সে কথা জানি, বিখ্যাত এরকুল পোয়ারো।
প্রশংসার ফাঁকে ফিলিপ ব্লেকের কথায় কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম ব্যাঙ্গের হুল লুকানো ছিল। একটু বিরক্ত হলো পোয়ারো, জীবনে সাফল্য অর্জন করেছে বলে এই মানুষটা এরকুল পোয়ারোর উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না তেমন। এতো অপমান চূড়ান্ত।
পোয়ারো কৃত্রিম কৃতজ্ঞতার মুখোশ এঁটে বললো, খুব খুশি হলাম আমি এই জেনে যে আমাকে চেনেন আপনি। আমার সাফল্যের মূলে আছে প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি এক অদ্ভুত মনঃস্তত্ত্ব–সেই অনন্ত প্রশ্ন মানুষের আচরণ সম্পর্কে কেন? মিঃ ব্লেক জানেন এখন প্রধান হয়ে উঠেছে বর্তমান জগতে অপরাধের মূলে এই প্রশ্নটিই। আগে হৃদয় ঘটিত ব্যাপার ছিলো এটা। বিখ্যাত অপরাধের কাহিনীগুলোর পুনরাবৃত্তি করা হতো আগেকার যুগে একটি মাত্র দৃষ্টিকোণের বিচারে স্নেহের ব্যাপারটা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এখন পাল্টে গেছে কিন্তু। এখন দেখা যায় ভীষণ অহংকারী স্ত্রী, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে স্বামীকে, তাই হীনম্মন্যতার হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছে স্বামী-স্ত্রীকে খুন করে। খুন করেছে একটি মেয়ে তার বাবাকে, কারণ মেয়েটি তিন বছর বয়সে দারুণ বকুনী খেয়েছিলো তার বাবার কাছে। আর আমি সেই জন্যই বলছিলাম কি খুব বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে এ যুগে অপরাধের মূল কারণটাই।
ফিলিপ ব্লেক ছোট্ট একটু হাই তুলে বললেন, অপরাধের বেশির ভাগ কারণটা তো বোঝা যায় স্পষ্ট, আমার মতে আসল কারণ হলো টাকা পয়সা।
চেঁচিয়ে উঠলো পোয়ারো, আঃ। বলেন যে কি মশাই, কারণটা স্পষ্ট বোঝা যায় না কখনই আর আসল ব্যাপার হলো সেটাই।
আর আপনার বিশেষত্ব সেখানেই?
মিঃ ব্লেক ঠিক ধরেছেন, আমার বিশেষত্ব ওইখানেই। অতীতের অপরাধ কাহিনীগুলোকে মনঃস্তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ দিয়ে নতুন করে লেখা উচিত। মনঃস্তত্ত্বই হলো অপরাধে আমার বিশেষত্ব। আর আমি স্বীকার করে নিয়েছি সেই দায়িত্বটা।
আশাকরি এতে আমদানী ভালোই হয়। ফিলিপ ব্লেক হাসির ভাব দেখালেন দাঁত চেপে।
হয় মনে হয়…নিশ্চয়ই হয়…রইলো অভিনন্দন। আচ্ছা এবার এর মধ্যে আসি কি করে আমি বলুন তো?
বলবো নিশ্চয়ই। ক্রেল মামলার ব্যাপারটায়।
ফিলিপ ব্লেক কথাটা শুনে একটুও চমকে উঠলেন না, বরং বললেন, চিন্তার সুরে, ও হ্যাঁ। …ক্রেল মামলা…।
পোয়ারো উদ্বেগের সঙ্গে বললো, মিঃ ব্লেক খুব অসন্তুষ্ট হচ্ছেন না তো আপনি?
ওই…ওই ব্যাপারে, ফিলিপ ব্লেক কাধ ঝাঁকিয়ে বলতে লাগলেন, না, মানুষের যে ব্যাপারে কোনো হাত নেই, সে সম্বন্ধে কোনো প্রশ্নই ওঠে না বিরক্ত বা অসন্তুষ্ট হওয়ার। প্রকাশ্য ব্যাপার তা ক্যারোলিন ক্রেলের মামলা, ওটা যে কেউ নিয়ে লিখতে পারে। তাতে কোনো আপত্তি করবার কারণ আমার থাকতে পারে না। ব্যাপারটা আমি খুবই অপছন্দ করি তা আপনাকে বলতে আমার আপত্তি নেই, আমার বিশেষ বন্ধু ছিলো অ্যামিয়াস ক্রেল। আমার খারাপ লাগবে পুরো ব্যাপারটা নতুন করে খুঁচিয়ে তুলতে কিন্তু আর কি করা যায়? অহরহ তো ঘটছেই এসব।
মিঃ ব্লেক আপনি দেখছি কথা বলছেন দার্শনিকের মতো?
না। না। খোঁচা খেলেই যে পাল্টা আঘাত দিতে হয় আমি এটা মানি না। তবে অন্যদের মতো আপনি ততো খারাপ কিছু করবেন না তা আমার বিশ্বাস।
রেখে ঢেকে যতোখানি সম্ভব ভদ্রভাবে লেখা যায় নিশ্চয়ই ততোটা করবো, আশা রাখি।
হো হো করে ফিলিপ ব্লেক হেসে উঠলেন, আর সত্যিকারের প্রাণের ছোঁয়া তাতে ছিলো না, হাসি আর চাপতে পারছি না আপনার কথা শুনে।
কিন্তু মিঃ ব্লেক ব্যাপারটা সম্বন্ধে সত্যি বলছি আমি আগ্রহী, টাকাকড়ির ব্যাপার নয় এটা শুধু। আমি নতুন করে গড়তে চাই অতীতের ঘটনাকে, যা ঘটেছিলো আঁকতে চাই তার আসল রূপটা। অন্তরালে যা কিছু ছিলো সবার সামনে সেগুলো তুলে ধরতে চাই…।
বললেন ফিলিপ ব্লেক, কোনো সূক্ষ্ম ব্যাপার এর মধ্যে আছে বলে আমার মনে হয় না। খুবই স্থল, পারিবারিক ঈর্ষা ব্যাপারটা। আপনার প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিলো ব্যাপারটা সম্বন্ধে সেটা জানতে পারলে মিঃ ব্লেক আমি ভীষণ খুশি হবো।
ফিলিপ হঠাৎ রেগে উঠলেন, লাল হয়ে গেলো মুখ চোখ, প্রতিক্রিয়া! প্রতিক্রিয়া! দয়া করে অতসব গাল ভরা কথা বলবেন না। তখন নিষ্ক্রিয় হয়ে আমি দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিক্রিয়া নিজের মধ্যে সৃষ্টি করতে দিতে পারি না, সে সময় বা মনোভাব তখন ছিলো না আমার। মশাই আপনি বুঝতে পারছেন না, খুন হচ্ছে আমার বন্ধু–তাকে বিষ খাওয়ানো হচ্ছে, যদি একটু তৎপর আমি থাকতাম তাহলে বোধ হয় বাঁচাতে পারতাম তাকে।
মিঃ ব্লেক কেন একথা বলছেন আপনি।
এই জন্যে বলছি যে ধরে নিচ্ছি আমি আপনি ইতিমধ্যে এই মামলার খবরাখবর পড়ে নিয়েছেন।..যদি তা হয় শুনুন আমার দাদা মেরিডিথ ঐ দিন সকালে ফোন করে আমাকে জানান যে, যে সব গাছ-গাছড়া নিয়ে উনি গবেষণা করেন তার মধ্যে খুবই মারাত্মক একটা রস এবং তার ল্যাবরেটারি থেকে সেই রকম চুরি গেছে একটা বিষ। দাদাকে আমি আসতে বললাম, আলোচনা সামনে বসে করে যা করলে ভালো হয় সবচেয়ে তাই করা যাবে। মিঃ পোয়ারো কী রকম নির্বোধের মতো কাজ করেছিলাম বুঝতে পারছেন তো, সঙ্গে সঙ্গে আমার তো অ্যামিয়াসকে সাবধান করে দেওয়া উচিত ছিলো। দাদার ল্যাবরেটরি থেকে ক্যারোলিন মারাত্মক বিষ চুরি করেছে, অতএব তুমি আর এলসা সাবধান হও নিজেদের ব্যাপারে।
