দুজনের এই সাক্ষাৎকার বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলো কিনা জানতে চাইলো পোয়ারো।
আদৌ নয়। স্ত্রীর সঙ্গে বেশ কেঁঝে কথা বলছিলো অ্যামিয়াস। খুঁটিনাটি ঘর সংসারের ব্যাপারে আলোচনায় মনে হয় খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। ছাড়াছাড়িই যদি হয় তাহলে আগে থাকতে ব্যবস্থা করে নিতে হবে ধরে নিয়ে ক্যারোলিন কথা বলছিলেন।
মাথা নাড়লো পোয়ারো। আবার বলতে শুরু করলেন হেল, অ্যামিয়াস ক্রেলের সঙ্গে মেরিডিথ আর ফিলিপ দুই ভাই দু একটা কথা বলেছিলেন। ইতিমধ্যে নিজের জায়গায় এলসা গ্ৰীয়ার ফিরে এসে বসে পড়েছেন। বোধ হয় অ্যামিয়াসও দুই-ভাইকে এড়াবার জন্যে তুলি নিয়েছিলো তুলে। মনের ভাবটা অ্যামিয়াসের বুকে নিয়ে ব্লেকরা বাড়ির দিকে চলে গেলেন। কিন্তু ওঁরা কামান বাগানে যখন ছিলেন ঠিক তখনই বাগানের ঘরে রাখা বিয়ারগুলো যে গরম, যাচ্ছে না খাওয়া, বলেছিলেন। এই ধরনের কথা বলেছিলেন অ্যামিয়াস আর ক্যারোলিনও উনি পাঠিয়ে দেবেন বাড়ি থেকে ঠান্ডা বিয়ার।
আহা।
তাহাই বটে। যেন মধু ঝরছিলো ক্যারোলিনের মুখে তারপর ব্লেকরা দুইভাই বাড়িতে গিয়ে কথা বলছিলেন বাইরের চত্বরে বসে। ওদের বিয়ার দেওয়া হলো ওখানে।
তারপর অ্যাঞ্জেলা সমুদ্রে স্নান করতে গেলো, ফিলিপ ব্লেকের সঙ্গে বাগানের সামনে একটা ভোলা জায়গায় বসে মেরিডিথ ব্লেক আবার চুরি যাওয়া কোনাইন সম্বন্ধে শুরু করেছিলেন চিন্তা করতে। এলসা গ্ৰীয়ারকে ওখান থেকে দেখা যাচ্ছিলো। তারপর মেরিডিথ কামান বাগানে গেলেন খাবারের ঘণ্টা বাজলে ওদের ডেকে নিয়ে যাবার জন্যে। কিন্তু তার সঙ্গে শুধু এলসাই গিয়েছিলেন। মেরিডিথ যাবার সময় লক্ষ্য করেছিলেন খুব অদ্ভুত দেখাচ্ছিলো অ্যামিয়াসকে। তবে মনে হয়নি তেমন কিছু। কখনো শক্ত অসুখ করেনি অ্যামিয়াসের, খুবই ভালো ছিল স্বাস্থ্য, তাই মাথায় আসেনি অসুস্থ হয়েছে চিন্তাটা বরং মনোমত আঁকার ব্যাপারটা না হলে বেশ ক্ষুব্ধ হতেন অ্যামিয়াস, রাগারাগি করতেন। কেউ তখন ওঁকে ঘাঁটায় না, থাকতে দেয় একলা। এবং মেরিডিথ আর এলসাও সেদিন তাই করেছিলো।
অন্য চাকরবাকরেরা বাড়ির কাজে ব্যস্ত ছিলো, খাতা দেখছিলো সিসিলিয়া স্কুল ঘরে। পরে কিছু সেলাই-টেলাই করে চত্বরে বসে। বাগানে সকালে ঘুরে অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেন, ফলটল খেয়ে বেড়াচ্ছিলো গাছে চড়ে সাধারণতঃ যা করে বছর পনেরোর মেয়েরা আর কি। ফিরে এসে সমুদ্রে স্নান করতে চলে যায় ফিলিপের সঙ্গে।
পুলিশ সুপার হেল একটু দম নিয়ে আবার শুরু করলেন, কোনো রহস্যের সন্ধান এর মধ্যে পাচ্ছেন কি?
পোয়ারো বললো, আদৌ না, তাহলে এই একটি কথাই হেলের অনেক ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করলো। একই ব্যাপার, ভাবছি আমি আমি…
ভাবছেন কি করবেন?
আমি এই পাঁচজনের সঙ্গে দেখা করে ঘটনাটা শুনবো।
হেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, মশাই খারাপ হয়ে গেছে আপনার মাথা। কারুর কথাই ওদের কারুর সঙ্গে মিলবে না। বুঝতে পারছেন না এই সামান্য ব্যাপারটা, দুজন কখনোই একটা ঘটনা একরকম ভাবে বলতে পারে না। তাছাড়া এতো বছর পরে আর কি হবে, পাঁচ রকম ভাবে বলবে পাঁচজনে খুনের কাহিনীটা।
আর আমি তো সেই জিনিসটাই চাই। তা থেকে শেখা যাবে অনেক কিছু। বললো পোয়ারো।
১.২ ছোট্ট শূয়োর ছানাটা
ষষ্ঠ অধ্যায়
বাজারে গিয়েছিল এই ছোট্ট শূয়োর ছানাটা…
ফিলিপ ব্লেকের চেহারা হুবহু মিলে গেলো স্যার মন্টেগুর দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে। বেশ ধনী, ধূর্ত, হাসিখুশি মানুষ শুরু করেছেন একটু মোটা হতে।
সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় শনিবার দেখা করার সময় এরকুল পোয়ারো ঠিক করেছিলো। গলফ খেলছিলেন ফিলিপ বাজী রেখে বন্ধুর সঙ্গে। বল ফেলা হয়ে গেছে ১৮নং গর্তে, বলা যায়। পাঁচ পাউণ্ড জিতে ফেলেছেন, ফলে বেশ প্রসন্ন মন মেজাজ।
নিজের পরিচয় দিয়ে পোয়োরো উদ্দেশ্যটা জানালো দেখা করার। অবশ্য তার কৌতূহল আজ তত তীব্রভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না।
হায় ভগবান, আবার এতদিন পরে এসব কেন?
এখানে খুব বেশি পাত্তা পাবে না তা পোয়ারো জানে। তাই হাল্কা করে বললো, মানুষের এটাই তো স্বভাব। এই আমি বা আপনি, যারা আমরা জগৎটাকে চিনি মানুষ সম্বন্ধে কোন মোহ নেই আমাদের মধ্যে, ভ্রান্ত ধারণা নেই। সবাই তো আর খারাপ লোক নয়, সবাইকে তো সেই সঙ্গে আবার আদর্শরূপ বলে দেখানো যায় না।
ফিলিপ বেশ খুশি মনে বললেন, আমি বহুদিন আগেই মোহ বিসর্জন দিয়েছি।
আর শুনেছি খুব সুন্দর নাকি আপনি গল্প বলেন।
আনন্দে চক চক করে উঠলো ফিলিপ ব্লেকের চোখ, তাও শুনেছেন?
পোয়ারো উত্তরে মাপা হাসি হাসলেন, বেশ আরাম করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে ফিলিপ হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রইলেন পোয়ারোর দিকে।
হঠাৎ মনে হলো পোয়ারোর এক আত্মপরিতৃপ্ত শূয়োর ছানার মতো দেখাচ্ছে ফিলিপকে বাজারে গিয়েছিলো এই ছোট শূয়োর ছানাটি…।
এই ফিলিপ ব্লেক কেমন মানুষ? একটা এমন মানুষ যার ভাবনা চিন্তা নেই কোনো, অবস্থাপন্ন, সুখী, কিছুই নেই দুঃশ্চিন্তা বলতে। বিবেকের তাড়না নেই অতীতের কোনো ব্যাপারে, এ যেন পেট পুরে খাওয়া একটা শূয়োর ছানা যে বাজারে গেছে–এবং দামটা পুরো উসুল করেছে…।
ফিলিপ ব্লেকের তো এককালে আরো অনেক কিছু থেকে থাকতে পারতো। নিশ্চয়ই আরও দেখতে সুন্দর ছিলো বয়সকালে। হয়তো একটু ছোট চোখটা, কিন্তু ওটা মানিয়ে যেতে পারে ভালো স্বাস্থ্যের যুবকের ক্ষেত্রে। এখন পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে ফিলিপের বয়স। তার মানে তখন বয়স ছিলো চল্লিশ-এর কোঠায়। যৌবনের তখন অনেক দাবী, সব সময় সবগুলো যে মিটতো তাও নয়…
