যুক্তি আছে আপনার কথায়। ওভাবে চিন্তা করে থাকতে পারেন মহিলা, বললো পোয়ারো, খুনটাকে প্রমাণ করতে পারলে আত্মহত্যা বেঁচে যেতেন উনি।
পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে এই অপরাধটা করা হয়েছে একদিক দিয়ে বিচার করলে, আবার তা নয় অন্য দিক দিয়ে বিচার করলেন। মহিলা সত্যি সত্যিই ভেবেছিলেন খুন করার কথা আমার তো বিশ্বাস হয় না। কাজটা রাগে অন্ধ হয়ে গিয়ে করে ফেলেন।
ভাবছি আমি…, আপন মনে বিড়বিড় করলো পোয়ারো।
হেল একটু আশ্চর্য হয়ে পোয়ারোর দিকে তাকালেন, আমি কি ব্যাপারটা ঠিক মতো বোঝাতে পেরেছি আপনাকে মঁসিয়ে পোয়ারো যে সাধারণ মামলা এটা একটা?
প্রায়। তবে পুরোটা না। অদ্ভুত ব্যাপার আছে দু-একটা…।
আপনার ধারণা অন্য আর কি হতে পারে, বোঝাতে পারেন যুক্তি দিয়ে? বললেন হেল।
অন্যান্য মানুষগুলোর গতিবিধি সেদিন সকালে কেমন ছিলো? প্রশ্ন করলো পোয়ারো হেলকে।
আমি ওঁদের কাছে গিয়েছিলাম। খুঁটিয়ে খুঁজে খবর নিয়েও ছিলাম প্রত্যেকের সম্বন্ধে অন্য জায়গায় থাকার অজুহাত দেখিয়ে। খুনির সঙ্গে জড়িত না হবার যুক্তি মানুষ দেখাতে চায় এক্ষেত্রে তেমন ছিলো না কারুর-যাকেও না বিষ দিয়ে খুন করার ব্যাপারে। কেননা যদি কেউ কাউকে খুন করতে চায় বিষ খাইয়ে তবে হজমের ওষুধ বলে একটা ক্যাপসুল বিষ ভরা দিয়ে বলবে খাবার পর কালকে এটা খাবেন। এবং দেশের অন্য প্রান্তে সেই অবসরে চলে গিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করতে পারে।
এক্ষেত্রে কিন্তু আপনার তাই হয়েছে বলে মনে হয় না নিশ্চয়ই, পোয়ারো বললো।
হজমের গণ্ডগোল ছিলো না অ্যামিয়াস ক্রেলের। তাছাড়া আমি এরকম কিছু ঘটবার সম্ভাবনাও দেখিনি। মেরিডিথ ব্লেক সে নানারকম জিনিস মিশিয়ে ওষুধ বিষুধ তৈরি করার সম্বন্ধ যে মনগড়া অনেক কথা যা কিনা উল্টোপাল্টা তা বলেছিলেন এ বিষয়ে সন্দেহ নেই কোনো, তাই বলে নিজের ওপর যে অ্যামিয়াস প্রয়োগ করবে তা বিশ্বাস করি না আমি। এবং কেনই বা মেরিডিথ ক্রেলকে খুন করতে চাইবেন? বিচার করে সব কিছু দেখা যায় খুব গাঢ় ছিলো অ্যামিয়াস আর মেরিডিথের বন্ধুত্ব। গভীর বন্ধুত্ব ছিলো ওঁদের সবারই মধ্যে। অ্যামিয়াসের প্রাণের বন্ধু ছিলেন ফিলিপ ব্লেক। ভালোবাসা হয়েছিলো এলসা গ্ৰীয়ারের সঙ্গে। যদিও এর জন্য গভর্নেস সিসিলিয়া অ্যামিয়াসকে পছন্দ করতেন না খুব একটা তবে কারুর চরিত্রের নৈতিক দিকের জন্যে কেউ বিষ খাওয়াবে না। বাচ্চা মেয়েটা, অ্যামিয়াসের খটাখটি যে লাগতো না অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেনের সঙ্গে তা নয়, তবে ঐ রকম একটু হয়েই থাকে ঐ বয়সের মেয়েরা। তারা দুজনেই খুব ভালোবাসতো দুজনকে। অ্যাঞ্জেলাকে বাড়ির সবাই বিশেষ স্নেহের চোখে দেখতো। আগেই তো শুনেছেন কারণটা। ক্যারোলিন ক্রেল রাগের চোটে পাগল হয়ে গিয়ে মারাত্মক ভাবে জখম করে ফেলেছিলেন তার সৎ বোন অ্যাঞ্জেলাকে। ক্যারোলিনের চরিত্রের মধ্যে এ থেকেই তা বোঝা যায় একটা বেপরোয়া ভাব ছিলো। তাই না?
বোঝা যায় বৈকি, চিন্তান্বিতের মতো পোয়ারো বলতে থাকলো, অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেনের পক্ষে অসম্ভব নয় ক্যারোলিন, ক্রেলের ওপর বিদ্বেষ থাকা।
হয়তো তাই বলে, কিন্তু অ্যামিয়াস ক্রেলের বিরুদ্ধে নয়। আর তাঁর ছোট্ট বোনকেও ক্যারোলিন খুব ভালোবাসতেন। বোনকে তো উনিই আশ্রয় দিয়েছিলেন মা বাবা মারা যাবার পর, আর ভীষণ ভালোবাসতেন আগেই বলেছি। আদর দিয়ে নাকি বোনের মাথা খাওয়া হয়েছে সবাই বলতো। দিদিকে অ্যাঞ্জেলাও খুব ভালোবাসতো, বোনকে যাতে ধারে কাছে না আসতে দেওয়া হয় মামলা চলার সময় এ ব্যাপারে ক্যারোলিন ভীষণ জেদ ধরেছিলেন। তবে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলো মেয়েটা, দিদির সাথে জেলে গিয়ে দেখা করতে চাইতো, রাজী হননি উনি, ওকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন উল্টে লেখাপড়া করবার জন্যে।
খুব নাম করা মহিলা হয়ে উঠলেন মিস অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেন, ঘুরে বেড়ান ইতিহাসের ভগ্ন স্থূপে। বক্তৃতা দেন রয়াল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটিতে এই আর কি।
এবং কারুরই মনে নেই মামলার কথা? প্রশ্ন করলো পোয়ারো।
হ্যাঁ তাই বলা যায়, ঘুরিয়ে বললে। কুমারী নামের পদবীও তো ভিন্ন ছিল ক্যারোলিন আর অ্যাঞ্জেলার। মা একজনই কিন্তু দুজন তো বাবা। স্পলডিং ছিলো ক্যারোলিনের আগেকার পদবী,
ঐ সিসিলিয়া উইলিয়ামস, কার গভর্নেস ছিলেন উনি, অ্যাঞ্জেলার না অ্যামিয়াসের মেয়ের?
অ্যাঞ্জেলার। আলাদা নার্স ছিলো মেয়েটার জন্যে, তবে সিসিলিয়ার কাছে যতোদূর শুনেছি। মাঝে মাঝে পড়াশোনা করতো সামান্য।
বাচ্চা মেয়েটা ঘটনাটা ঘটার সময় কোথায় ছিলো?
দিদিমার কাছে, লেডি ট্রেসি লিয়ানের কাছে ওকে নার্স নিয়ে গিয়েছিলো, ঐ বাচ্চাটিকে উনি খুব ভালোবাসতেন।
তাই নাকি, মাথা নাড়লো পোয়ারো।
আবার বলতে শুরু করলেন হেল, অন্যান্যরা কে কোথায় ছিলেন খুনের দিন, আমি বলতে পারি যদি জানতে চান।…জলখাবার সকালের খাবার পর এলসা গ্ৰীয়ার লাইব্রেরী জানালার কাছে খোলা বারান্দায় বসেছিলেন। উনি ওখানে বসেই শুনেছিলেন ঝগড়াঝাটি। তারপর কামান বাগানে চলে যায় এলসা ক্রেলের সঙ্গে এবং ছবি আঁকানোর জন্য লাঞ্চ পর্যন্ত সিটিং দেন।
সকালে ফিলিপ ব্লেকও বাড়িতে ছিলেন, উনিও ঝগড়ার কিছুটা শুনেছিলেন। কাগজ পড়ছিলেন অ্যামিয়াস আর এলসা চলে যাবার পর, তারপর সমুদ্রের দিকে যান দাদার ফোন পেয়ে দাদার সঙ্গে দেখা করতে। দুজন তারপর কথা বলতে বলতে কামান বাগানের পাশ দিয়ে আসেন, এলসা গ্ৰীয়ার ঠিক সেই সময় বাড়িতে গিয়েছিলো একটা সোয়েটার আনবার জন্যে, তার একটু শীত শীত করছিলো। ক্যারোলিন স্বামীর সঙ্গে অ্যাঞ্জেলার স্কুলে যাবার বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
