-তোমার বুদ্ধির বহর দেখে হাসি পাচ্ছে। পোয়ানোর ঠোঁটে হাসির ঝিলিক।
–হাসছে যে! হেস্টিংস চড়া সুরে জানতে চাইলেন, তোমার কি ধারণা বলল।
–এখনও কিছু বলার সময় হয়নি, ভায়া। প্রশ্নের পর প্রশ্ন এসে ভিড় করেছে। আগে এগুলোর ঠিকঠাক জবাব পাই, তার পর না-হয় সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে। পোয়ারো বললেন, ধরো এই প্রশ্নটা লুসিয়া অ্যামরির হীরের নেকলেস চুরি হওয়া সত্ত্বেও পুলিশে খবর তিনি দিতে দিলেন না। কেন বলতে……
পোয়ারোর কথা শেষ হল না, ঘরের ভেতরে এসে পা রাখল লুসিয়া, হাতে ঝুলছে। সেই ব্যাগটা।
-বলুন, মঁসিয়ে পোয়ারো, কোনো ভনিতা না করে লুসিয়া জানতে চাইল, তার কথায় বা আচরণে ভয়ের ছাপ নেই, বেশ সপ্রতিভ বলা চলে। কী জন্য ডেকেছেন?
-হ্যাঁ, মাদাম। বলছি। একটা চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে পোয়ারো বললেন বসুন। তারপর আমার প্রশ্ন শুনবেন।
লুসিয়া চেয়ারে বসল। পোয়ারো চাইলেন না, এই প্রশ্নোত্তর পর্বে ক্যাপ্টেন হেস্টিংস যোগ দিল। খোলা ফ্রেঞ্চউইন্ডোর দিকে হেস্টিংসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, বন্ধু, দেখেছ বাইরের দিকে, কী সুন্দর পরিবেশ। ঘরের মধ্যে বসে না থেকে, যাও, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করো। এমন সুযোগ কখনো ফিরে পেতে নাও পারো।
হেস্টিংস-এর ইচ্ছা ছিল না, তবু পোয়ায়োর নির্দেশ অমান্য করতে পারলেন না। তিনি একটা জানলা টপকে ঘরের বাইরে চলে এলেন, পা রাখলেন বাগানে।
অযত্নে বড় হয়ে উঠেছে ফণিমনসার ঝোপ, আরও কত নাম না জানা গাছ। ঘাসের ডগাগুলো না ছাঁটার ফলে বেশ মাথা তুলেছে। ঝোপগুলোকে এড়িয়ে হেস্টিংস লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোলেন।
হঠাৎ তাকে থামতে হল। কান পাতলেন। স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে এক নারী ও পুরুষ–দু’জনের মধ্যে কথা বলাবলি করছে। ওদের কণ্ঠ চিনতে দেরি হল না তার –নিশ্চয়ই বারবারা আর ডঃ কেনেথ গ্রাহাম। চুপিসাড়ে হেস্টিংস এসে দাঁড়ালেন একটা বড় গাছের আড়ালে। হ্যাঁ যা ভেবেছেন ঠিক তাই দুজনে খুব কাছাকাছি বসে আছে একটা বেঞ্চে। ওরা কী বিষয় নিয়ে কথা বলছে? স্যার ক্লড ও তার ফর্মুলা চুরির বিষয়ও হতে পারে। শুনতে হয়।
হেস্টিংস অত্যন্ত সতর্কভাবে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সেই বেঞ্চের কাছাকাছি চলে এলেন। কান পাতলেন
-রিচার্ড মুখেই আমায় বন্ধু বন্ধু বলে, আসলে, ডঃ গ্রাহামের কণ্ঠস্বরে ক্ষোভ ঝরে পড়ছে, সে আমাকে একটা গেঁয়ো ডাক্তার ছাড়া আর কিছু মনে করে না। আর তাই সে আমাদের এই মেলামেশা বরদাস্ত করতে পারছে না।
ফুঃ, রিচার্ডের কথা ছাড়ো তো। বারবারা তুড়ি মেরে সরিয়ে দিল গ্রাহামের অভিযোগ, ও একটা মেরুদণ্ডহীন পুরুষ। মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারে চাকরি করার সময়ও দেখিনি, চাকরি ছাড়ার পরেও নয়–বাবার বিরুদ্ধে কোনোদিন রুখে দাঁড়িয়েছে? ও একটা মেনিবেড়াল। না হলে বউকে নিয়ে কবেই এখান থেকে কেটে পড়ত। কেনি, তুমি রিচার্ডকে নিয়ে মাথা ঘামিও না। আমায় দেখতো, আমি তো ওর খুড়তুতো বোন, আমি ওকে গ্রাহ্য করি!
-রিচার্ডকে আমি গ্রাহ্যের মধ্যে ধরি না। যাক, সে কথা, ডঃ গ্রাহাম বলে চললেন, শোনো বারবারা, তোমাকে যেজন্য এখানে ডেকে পাঠিয়েছি, তার প্রথম কথাটা আগে বলি। তোমার জ্যেঠুকে গত সন্ধ্যায় বিষ খাইয়ে কেউ বা কারা খুন করেছে।
–এ বাসি খবর। বারবারার চোখে মুখে বিরক্তি ওই বেঁটে লোকটা, গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে সারা বাড়িতে হুলস্থুল ফেলে দিয়েছে। এসব কথা কি জানতে কারো বাকি আছে গো!
–খবরটা তোমাকে চমকে দেয়নি? মন নিশ্চয়ই খারাপ হয়েছে, তাই না?
–নিশ্চয়ই, বাড়ির কেউ মারা গেলে মন বিষণ্ণ হবেই। ব্যাস এইটুকুই, কেনি।
বারবারার চাছা ছোলা কথা শুনে ডঃ গ্রাহাম বুঝি একটু অবাক হলেন।
-কেনি, আমি ন্যাকা-ন্যাকা কথা বলতে পছন্দ করি না। জেনে রেখো, ওই বুড়োটা মরেছে, আমার হাড় জুড়িয়েছে।
বারবারা! ডঃ গ্রাহাম কঠিন গলায় বললেন, কী আবোল তাবোল বকছু!
-কেনি, আমাকে ধমকিয়ো না, হতে পারে বড় বিজ্ঞানী, কিন্তু লোকটা ছিলেন হিংসুটে আর স্বার্থপর। নীচু মনের মানুষ। তোমাকে আমার জ্যেঠুর এমন অনেক ঘটনার কথা এখানে বসেই আগে কত শুনিয়েছি। উনি কেবল নিজের গবেষণা আর টাকাকে চিনতেন। পরিবারের কারো প্রতি ভালো ব্যবহার কখনো করেননি। এমনকি নিজের ছেলের প্রতিও নিন্দনীয় ব্যবহার করেছেন। কেনি, তুমি তো জানো, বাবার কথায় রিচার্ড মিলিটারির চাকরিটা ছেড়ে দিল। কিন্তু তার চলবে কী করে? জ্যেঠু তাকে এক পয়সাও হাত খরচা হিসাবে দিতেন না। কিপটে বুঝলে হাড় কিপটে। রিচার্ডের বউটার কথা ভেবে দেখ। সুন্দরী অল্প বয়সী মেয়ে। সেও ছিল। জ্যেঠুর চোখের শুল। উঠতে-বসতে বউটাকে কম অপমান করেননি। তাই বলছি, রিচার্ড যদি সত্যিই পুরুষের মতো পুরুষ হত তাহলে বউকে নিয়ে কবেই অন্য কোথাও চলে যেত।
বারবারা বলে চলল–আহা, বেচারী, মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। লজ্জায় অপমানে সাদা গালদুটো লাল হয়ে উঠেছে। এসব দেখে আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠত। জ্যেঠুর দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদ যে করব, সে অধিকার আমার কোথায়, আমি নিজেই অসহায় এক আশ্রিতা।
বারবারা, আমায় বলো তো, তোমার জ্যেঠুকে যে বিষ খাইয়ে খুন করা হল, এর অন্তরালে কার হাত আছে বলে তোমার মনে হয়? ধরো টাকা কড়ি–বিষয় সম্পত্তির লোভে, মানে রিচার্ড, সে কি তার বাবার খুনী? তোমায় কথা দিচ্ছি, তুমি যেসব গোপনকথা বলবে, তা আর তৃতীয় কানে পৌঁছবে না। তোমার যাতে বিপদ না হয়, সে ব্যবস্থাও করব, কথা দিচ্ছি, এমনকি পুলিশি ঝামেলা থেকে তোমাকে বাঁচাব।
