-কেনি, দয়া করে এবার থামবে, আমার আর এসব শুনতে ভালো লাগছে না। বারবারা খেঁকিয়ে উঠল। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিল দেখ, কী সুন্দর সোনালী রোদে চারদিক ভরে উঠেছে। এসো, দুজনে মিষ্টি মধুর প্রেমের গল্প করি। রিচার্ডের বাবার খুনের পর্ব বাদ দিয়ে সুন্দর একটা কবিতা শোনাতে পারো তো? তুমি কি আমার কাছ থেকে জানতে চাইছ, ছেলে তার বাবাকে খুন করেছে কিনা। সত্যি বলছি কেনি, তোমার মনোভাব আগাম জানতে পারলে কে আসত তোমার ডাকে।
–শান্ত হও, বারবারা। তোমার জ্যেঠুর মৃত্যুটা যে স্বাভাবিক নয়, তা তো তুমি স্বীকার করো। রিচার্ডকে আমি খুনী বলে সন্দেহ করি না, তবে ওর বাবার খুনের কিনারা করার জন্য পুলিশের দ্বারস্থ হতে চায় না। এর কারণ কী? ওর ভাবগতিক দেখে মনে হয়, পুলিশি তদন্ত হলে এমন কিছু গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে, যা ওকেই দোষী বলে সাব্যস্ত করবে। তবে পরিস্থিতিটা এখন এমন পর্যায়ে এসে গেছে যে, ও কেন, অন্য কেউ চাইলেও পুলিশি তদন্ত বন্ধ করতে পারবে না। কারণ এটা একটা খুনের মামলা। তোমার জ্যেঠুর পাকস্থলীতে মারাত্মক বিষ মেশানো কফি পাওয়া গেছে। রিচার্ড আমার ওপর ক্ষেপে আছে। ও মনে করে আমি ইচ্ছে করে ওর বাবার ডেথ সার্টিফিকেট দিইনি। আমি ওদের পুলিশি ঝামেলায় ফেলতে চাই। ডাক্তার হয়ে ওর ইচ্ছে মতো ডেথ সার্টিফিকেট কী ভাবে দিই বলল তো।
-বুঝলাম, চুলোয় যাক এসব, শোনো, আর দেরি করা যাবে না, বারবারা বলল, আমি জানলা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ছি, তুমিও বাগান থেকে বিদায় হও। পরে দেখা করব, বুঝেছ?
কথা শেষ করে বারবারা ঝোঁপের পাশ ধরে জানলার দিকে পা চালাল। অগত্যা ডঃ গ্রাহামকে উঠতে হল, বড় একটা নিশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলেন নিজের পথে।
এতক্ষণ ক্যাপ্টেন হেস্টিংস ঘাপটি মেরে বসে সব শুনছিলেন। বারবারা ও ডঃ কেনেথ চলে যেতেই পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন খোলা জানলার দিকে।
***
লুসিয়া মুখ টিপে বসেছিল। ক্যাপ্টেন হেস্টিংস জানলা দিয়ে ঘরের বাইরে চলে যেতে বুঝি সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বলল–মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি নাকি আমার কাজের মেয়েটাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান। মি. রেনরের কাছে শুনলাম।
কাজের মেয়ে নয়, আপনার সঙ্গেই আমার কথা আছে, মাদাম।
একথা শুনে লুসিয়া চমকে উঠল, পোয়ারোর চোখ তা এড়াল না।
–আমার দোষ নেবেন না, মাদাম। মিঃ রেনরের ইচ্ছে হয়েছে, তিনি বলেছেন, এক্ষেত্রে আমার কী করার আছে বলুন। বিশ্বাস করুন, আপনার কাজের মেয়ে সম্পর্কে কোনো তথ্যের প্রতি আমি আগ্রহী নই।
–তাহলে? আপনাকে তো আমি সবই বলেছি, মঁসিয়ে পোয়ারো, তাহলে আবার কেন?
পোয়ারো লক্ষ্য করলেন, লুসিয়ার মুখে-চোখে সে ভীতিভাব এখন অনুপস্থিত।
-মাদাম, আপনি কি ভুলে গেছেন, লুসিয়ার চোখে চোখ রাখলেন পোয়ারো, গত সন্ধ্যায় স্যার ক্লডের আকস্মিক মৃত্যুর পর এ বাড়ির সকলে আমাকে তক্ষুনি বিদায় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একমাত্র আপনিই আমাকে তদন্তের কাজ চালাতে অনুরোধ করেছিলেন এমনকি আপনি যে আমার ওপর সম্পূর্ণ মাত্রায় আস্থাশীল, সে কথাও জানিয়ে ছিলেন। কী, আমি কি মিথ্যে বললাম?
-হয়তো না। লুসিয়া উদ্ধত গলায় জবাব দিল, কিন্তু তাতে কী হল?
–এখন আপনাকে আমি বলছি, আপনি আমার প্রতি সত্যিই আস্থা রাখতে পারেন।
–মঁসিয়ে পোয়ারো, ভনিতা না করে কাজের কথায় আসুন।
-মাদাম, পোয়ারোর কণ্ঠস্বর কঠিন, আপনার জীবনে কোনোকিছুর অভাব আছে কি? আপনি রূপসী যুবতী, প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা–শ্রদ্ধা ভক্তি লাভ করেছেন। আছে সাধারণ ভদ্রতাবোধ। শুধু একটা জিনিসের অভাব আছে, সেটি হল এমন কোনো বিশ্বাসী লোক, যাকে ভরসা করতে পারেন, মনের না বলা কথা উজাড় করে তাকে শোনাতে পারেন। পোয়ারো তাকালেন লুসিয়ার দিকে আপনি বয়েসে আমার থেকে অনেক ছোট, আপনার বাপের বয়সী, মনে করলে আমাকে অনায়াসে বিশ্বাস করতে পারেন।
লুসিয়া কিছু বলতে গিয়ে বাধা পেল। পোয়ারো আবার বললেন আমার কথাগুলো ভালোভাবে চিন্তা করুন। আপনি আমার সহায়তা চেয়েছিলেন, আমি সায় দিয়ে থেকে গেলাম এখানে। আপনাকে আমি সত্যিই সাহায্য করতে চাই, বিশ্বাস করুন, মাদাম।
–আপনার কি মনে পড়ে, আজ সকালের কথা, কী বলেছিলাম? বলেছিলাম, আপনার এখানে থাকার দরকার নেই, চলে যান। লুসিয়া সহজভাবে বলে চলল, হ্যাঁ, মানছি আপনি আমায় সাহায্য করতে চান, আমিও তা আশা করি, মঁসিয়ে পোয়ারো। আপনি চলে গেলেই আমার সহায়তা হবে।
-মাদাম, ভুলে যাবেন না, এখান থেকে চলে যাওয়াটা আপনার মর্জির ওপর নির্ভর করছে না, সেটা আমার ইচ্ছের অধীন। মনে চাইলে এক্ষুনি চলে যেতে পারি। কিন্তু মাদাম, আপনি আমাকে তাড়ালেও পুলিশের তদন্ত বন্ধ করবেন কী করে? আপনি হাজার বারণ করলেও গ্রাহ্য করবেনা। তদন্তের কাজ শেষ করে তবে অন্য কথা। এটা কি আপনি ভেবে দেখেছেন? তাছাড়া যাদের হয়ে আপনি ওকালতি করছেন, তারাও নিশ্চয়ই ব্যাপারটা তলিয়ে দেখছেন না।
-কী বললেন, পুলিশ? বোঝা গেল লুসিয়া একটু ঘাবড়ে গেছে। ওদের এখানে কী দরকার?
-স্যার ক্লডের পাকস্থলী কাটাছেঁড়া করে বিষ মেশানো কফি পাওয়া গেছে, ডঃ গ্রাহামই পুলিশে খবর দিয়েছেন। অতএব সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে পুলিশের আগমন।
