পোয়ারো নীরব হলেন। রেনরকে দেখতে লাগলেন-সন্ধানী দৃষ্টিতে। তারপর ঘাড় নাড়লেন–আপনার কথাই ঠিক হয়তো।
পোয়ারো এবার চেয়ার ছেড়ে চলে এলেন সোফার একধারে। বসলেন, হাতের ওপর হাত রেখে ঘষে নিলেন। তারপর তাকালেন রেনরের দিকে–মঁসিয়ে রেনর, আসুন, আমরা এবার আপনার কাজ সম্পর্কে কিছু বলি। আপনিই তো স্যার ক্লডের সেক্রেটারি ছিলেন?
-হ্যাঁ।
তার মানে আপনি ওঁর গবেষণার কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে অনেক গোপনীয় তথ্য আপনার জানা আছে, তাই না?
যেহেতু, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, তাই গবেষণার কাজে স্যার ক্লডকে একটু আধটু সহায়তা করতে হয়েছে বৈকি!
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নয়, অথচ এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার ওপর আলোকপাত করতে পারে, এমন কিছু কি আপনার নজরে পড়েছে? এমন কিছু যার সঙ্গে স্যার ক্লডের হত্যাকান্ডটি সম্পর্কিত?
মি. রিচার্ড অ্যামরি তার বাবার কাছে আসা চিঠিপত্রগুলি বেছে আমাকে আলাদা করে রাখতে বলেন। সেইমতো বিদেশ থেকে আসা চিঠিপত্রের গোছা থেকে চিঠিটা পেয়েছি, দু-দিন আগে এটা এসেছিল। রেনর একটা খাম পোয়ারোর দিকে এগিয়ে দিল।
পোয়ারো তাকালেন, খামের মুখটা ছুরি দিয়ে কাটা হয়েছে বোঝা গেল। পোয়ারো হাত বাড়িয়ে খামটা নিলেন। ভেতর থেকে চিঠিটা বের করলেন। ঘরে উপস্থিত সকলকে শুনিয়ে পড়তে লাগলেন–
………….আপনি একটা সাংঘাতিক বিষাক্ত সাপকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে বুকে আশ্রয় দিয়েছেন।
–হুক-এর অর্থ এখানে কী হতে পারে? পোয়ারো তাকালেন তার সহকারী ক্যাপ্টেন হেস্টিংস-এর দিকে, মনে হল প্রশ্নটা তিনি তার উদ্দেশ্যেই ছুঁড়ে দিয়েছেন।
তারপর আবার চিঠির পাতায় নজর দিলেন পোয়ারো–বিষধর নাগিনী সেলমা গেতজ……..
–এই মহিলার পরিচয় কী?
–জানতে চান, তাহলে শুনুন। পোয়ারো সোফায় হেলান দিয়ে আরাম করে বসলেন, বললেন–সেলমা গেতজ একজন মহিলা গুপ্তচর। মেয়ে গুপ্তচরের তালিকায় তার নাম সবার ওপরে ছিল। অসাধারণ সুন্দরী ছিল, কাজের সফলতায় সে ছিল সবার সেরা। ইটালি, ফ্রান্স, জার্মানির হয়ে সে নির্ভয়ে কাজ করত, সব শেষে রাশিয়াও ওকে গুপ্তচরগিরিতে কাজে লাগিয়েছিল।
-’ছিল’ মানে! এ কি অতীত? রেনর জানতে চাইল।
তার মানে হল………..
তার মানে হল সেলমা গেতজ সত্যিই আজ অতীত হয়ে গেছে। জেনোয়ার এক বন্দীশালায় তার মৃত্যু হয়েছিল।
এই চিঠির অন্তর্নিহিত অর্থ যে ক্যাপ্টেন হেস্টিংস-এর বোধগম্য হয়নি তা বুঝতে দেরি হল না পোয়ারোর। তিনি হাত বাড়িয়ে বন্ধুর কাছ থেকে চিঠিটা ফিরিয়ে নিলেন।
–বোকা বানানোর জন্য এই চিঠি। রেনর তার অভিমত প্রকাশ করল।
সেলমা গেতজ আর তার ডিম ফুটে বাচ্চা………–কথাগুলি নিয়ে পোয়ারো আপন মনে বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করতে লাগলেন, বাচ্চা বেরিয়েছে কথার অর্থ কী? কী বলতে চাইছে?
খানিকবাদে তিনি তার চিন্তার তল থেকে উঠে এলেন। বললেন–সেলমা গেতজের একটা মেয়ে ছিল বলে জানি, মায়ের মতোই, সে ছিল অপরূপ সুন্দরী। সেলমা গত হলে মেয়েটির আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। কোথায় গেছে কেউ জানে না, কেমন এক রহস্যজনক ব্যাপার…..
চিঠিটা খামের মধ্যে ভরে পোয়ারো সেটাকে নিজের জ্যাকেটের পকেটে চালান করে দিলেন।
–হতে পারে………রেনর কী বলতে গিয়ে ও বলল না।
পোয়ারো তাড়া দিলেন–কী হল, থেমে গেলেন কেন? বলুন, কী বলতে চাইছেন
–একটা ইটালিয়ান মেয়ের কথা বলছি। রেনর বলে চলল, একটু নীচু গলায়–এবাড়ির বউ, শ্ৰীমতী লুসিয়া অ্যামরি, ইটালি থেকে আসার সময় সঙ্গে করে একটি মেয়েকে নিয়ে আসেন। নাম ভিক্টোরিয়া সুজিও। এ-ও সুন্দরী। সে মিসেস অ্যামরির খাস চাকরানি বলতে পারেন। মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি যার কথা বলছিলেন, মানে সেলমা গেতজ-এর মেয়ে এ হতে পারে, তাই নয় কি!
হতে পারে। পোয়ারো আনমনে জবাব দিলেন, তবে দারুণ তথ্য, তলিয়ে ভাবতে হবে।
–তাহলে, মঁসিয়ে পোয়ারো বৃথা সময় অপচয় করার দরকার নেই। আমি এখুনি ওকে ডেকে দিচ্ছি। রেনর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, খোঁজ খবর নিন, দেখুন জবাব মেলে কিনা।
আরে, এত ব্যস্ত হওয়ার কী আছে! পোয়ারো বাধা দিয়ে বললেন–আগেভাগে জেনে গেলে মেয়েটা সাবধান হয়ে যাবে। বরং মিসেস লুসিয়া অ্যামরির কাছে জানতে হবে মেয়েটা সম্পর্কে। আশা করি কিছু তথ্য হাতে পাব।
হতে পারে। তাহলে মিসেস লুসিয়া অ্যামরিকেই বলে দিচ্ছি, আপনি তাকে ডাকছেন।
কথা শেষ করে রেনর বিদায় অভিবাদন জানিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
-এতক্ষণে ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হল। ক্যাপ্টেন হেস্টিংস-এর কথায় উত্তেজনা ঝরে পড়ল। ডঃ কারোলি আর লুসিয়ার কাজের মেয়েটি আসলে কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের গুপ্তচর। স্যার ক্লড অ্যামরির মূল্যবান ফর্মুলা হাতানোর জন্য সুঁচ হয়ে ঢুকে পড়েছে এ বাড়িতে ঠিক তত?
বন্ধুর কথা পোয়ারোর কানে গেল বটে, কিন্তু সাড়া দিলেন না, তিনি তখন গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন।
হেস্টিংস, পোয়ারোর এই উদাসীনতায় রেগে গিয়ে বললেন–কী হল? তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছে না। এবার একটু চড়া গলায় আগের কথাগুলি পুনরাবৃত্তি করলেন স্যার ক্লডের ফর্মুলা ওই ডঃ কারোলি আর লুসিয়ার কাজের মেয়েটা চুরি করেছে, তাই কিনা? ওরা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের গুপ্তচর?
