-হ্যাঁ, খুলুন। পোয়ারো এবার জানতে চাইলেন, গত সন্ধ্যায় স্যার ক্লডের জন্য কাপে কফি কি আপনিই ঢেলেছিলেন?
-না, আমি নয়, বেশ জোরালো কণ্ঠস্বর ক্যারোলিনের। আমার খুব ভালো ভাবেই মনে আছে, লুসিয়াই তার শ্বশুরের জন্য কাপে কফি ঢেলেছিল?
-কখন বলতে পারেন?
–ডঃ কারোলি যখন ওই মারাত্মক সর্বনাশা ওষুধগুলোর ক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছিল, তার পরেই।
-কাপে কফি ঢালার পর স্টাডিতে কে নিয়ে গিয়েছিল? লুসিয়া?
–না, লুসিয়া কফি ঢেলে রেখেছিল। যতদূর খেয়াল আছে, ও নিয়ে যায়নি স্টাডিতে।
–তাহলে?
-তাহলে? থামুন, ভাবতে দিন, বলছি। ক্যারোলিন ফিরে গেলেন গত সন্ধ্যার দৃশ্যপটে। খানিক হাতড়ে বেড়ালেন। তারপরেই, লাফিয়ে উঠলেন–হ্যাঁ, পেয়েছি, লুসিয়া নয়, ও কেবল কফি ঢেলে ছিল। ওটা স্টাডিতে নিয়ে যাচ্ছিল স্যার ক্লডের সেক্রেটারি এডওয়ার্ড রেনর। লুসিয়া ওকে বাধা দিয়ে বলল, ওটা স্যার ক্লডের কফির কাপ নয়, এটা। বলে ইঙ্গিতে অন্য একটা কাপ দেখিয়ে দিল। তবে আশ্চর্যের কী জানেন, দুটো কাপের কফিই ছিল দুধ ছাড়া, অর্থাৎ কালো, আর চিনিও ছিল না।
তার মানে মঁসিয়ে রেনররই স্যার ক্লডকে কফির কাপটা দিয়ে এসেছিলেন। ব্যাপারটা তাই তো দাঁড়াচ্ছে? পোয়ারোর কপালে কুঞ্চন রেখা।
-হ্যাঁ, পরক্ষণেই মত পালটে ক্যারোলিন বললেন, না, ভুল বলা হল, ঠিক ওই সময় বারবারা তার ফক্ৰটট নাচের সঙ্গী হতে রেনরকে অনুরোধ করল। তাই রিচার্ড এগিয়ে এসে রেনরের হাত থেকে কাপটা নিয়ে ঢুকেছিল বাবার স্টাডিতে।
-ওহো, তাই বলুন। মঁসিয়ে রিচার্ডই শেষ পর্যন্ত কাজটা করেছিলনে তো?
— হ্যাঁ, কঠিন গলায় ক্যারোলিন সায় দিলেন।
-আচ্ছা, তার আগে রিচার্ড কী করছিলেন? উনিও কি বাজনার তালে তালে নাচছিলেন?
-না, রিচার্ড নাচের ধারে কাছে যায়নি। ও টিনের বাক্সে ওষুধগুলো ঠিকঠাক সাজিয়ে রাখছিল।
-তারপর কী কী ঘটল?
-তারপরে স্যার ক্লড স্টাডি থেকে বেরিয়ে এল, হাতে শূন্য কাপ। আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিল। বলল, কফিটা কেমন বিশ্রী রকমের তেতো লেগেছে। একবার নয়, একই কথা কয়েকবার বলেছিল। আমি তো অবাক, দারুণ তেতো কী করে হবে? আমি নিজে অর্ডার দিয়ে ওই কফি পাউডার তৈরি করিয়ে আনি, সেরা কফি। লন্ডনের আর্মি নেভি স্ট্রোস-এর দোকান আছে ভিক্টোরিয়া স্ট্রিটে, রেলস্টেশন লাগোয়া দোকান আমি..
ক্যারোলিনকে কথা থামাতে হল। কারণ তখন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়েছে এডওয়ার্ড রেনর। মাথা সোজা না করে পোয়ারোকে উদ্দেশ্য করে বলল–আপনার সঙ্গে কিছু দরকার ছিল, মঁসিয়ে পোয়ারো। আপনি ব্যস্ত দেখছি, আমি না-হয় পরে আসব।
পোয়ারো সামান্য হাসলেন–না না, ব্যস্ত নই। আপনি বসুন, আমি মিস অ্যামরিকে দরজা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসি।
-মঁসিয়ে পোয়ারো। ক্যারোলিন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন–মনে হয় না, আমার এ তথ্য আপনার কোনো কাজে লাগবে।
কারোলিন দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। পোয়ারো তার পেছন পেছন এসে দরজার পাল্লা খুলে দিলেন। ক্যারোলিন চৌকাঠের বাইরে পা রাখতে চলেছেন। এমন সময় ফিসফিসিয়ে পোয়ারো জানালেন মাদাম, আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আপনাকে আন্তরিকভাবে জানাচ্ছি, এসব তথ্য আপনি না বললে, হয়তো আমার অগোচরেই থেকে যেত।
বিদায় অভিবাদন জানিয়ে দরজার পাল্লা এঁটে দিয়ে পোয়ারো ঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন–মঁসিয়ে রেনর, কী মনে করে আমার কাছে?
রেনরের সামনে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন পোয়ারো–বলুন, কী বলতে এসেছেন? নিঃসঙ্কোচে বলতে পারেন।
মঁসিয়ে পোয়ারো, সত্যি আশ্চর্যের ব্যাপার, রেনর বলতে থাকল, সার ক্লডের কীভাবে মৃত্যু ঘটেছে, এই একটু আগে জানতে পেরেছি। মি. রিচার্ড অ্যামরি সব আমায় বলেছেন।
রেনরের চোখে আন্তরিকতা ঝরে পড়ছে। পোয়ারো তা লক্ষ্য করে জবাব দিলেন তাই বুঝি! আচ্ছা মি. রেনর….. কথা বলতে বলতে পোয়ারো তাঁর জ্যাকেটের পকেট থেকে সেই চাবিটা বের করলেন, যেটা স্যার ক্লড মারা যাবার পরে তার মৃতদেহের কাছে উলটে পড়ে থাকা চেয়ারের নীচে পড়েছিল। …এটা দেখুন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবেন। কী মনে হয়?
পোয়ারো তার সন্ধানী চোখে রেনরকে জরিপ করতে লাগলেন।
চাবিটা হাতে নিয়ে রেনর দেখতে লাগল, এটা তো স্যার ক্লডের সিন্দুকের চাবির মতো দেখতে। খুঁটিয়ে আবার দেখল। তারপর সেটা পোয়ারোর হাতে ফেরত দিতে দিতে বলল–এটা কী করে সম্ভব! আমি যতদূর জানি সিন্দুকের চাবিটা চাবির গোছাতেই আছে, রিচার্ডের মুখে অবশ্য শুনেছি।
-মঁসিয়ে রিচার্ড ভুল বলেননি, আপনার অনুমানও ঠিক, এটা স্যার ক্লডের সিন্দুকেরই চাবি, তবে, পোয়ারো তীক্ষ্ণ চোখে আবার সামনে বসে থাকা রেনরের দিকে তাকালেন বলতে পারেন এটা ওই চাবির দোসর, অর্থাৎ নকল। এবার পোয়ারো তার কণ্ঠস্বর এক পর্দা উঁচুতে তুলে, অবশ্য ইচ্ছাকৃত, বললেন–গত সন্ধ্যায় এঘরে আপনি যে চেয়ারে বসেছিলেন, তার তলা থেকে এটা পাওয়া গেছে।
একথা শুনে রেনরের চোখে-মুখের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল না। আগের মতোই সাবলীল ভঙ্গিতে বলল–আপনার কি ধারণা, চাবিটা আমিই চেয়ারের তলায় ফেলে দিয়েছিলাম? তাহলে বলব, আপনার অনুমান সম্পূর্ণ ভুল, মঁসিয়ে পোয়ারো।
