–ওষুধটার নাম সম্ভবত হিসকোসিন হাইড্রোব্রোমাইড?
-কারোলির কাছ থেকে সবাই জানলাম, এই ওষুধের বড়ি দশ-বারোটা খেলেই চলবে, নিশ্চিন্তে নিরুদ্বেগে ঘুম, যে ঘুম জীবনে আর ভাঙবে না। তার হাত থেকে লুসিয়া টিউবটা একবার নিল। আহা! ডঃ কারোলির বর্ণনা শুনে কবি লর্ড টেনিসনের কথা মনে পড়ে যায়। টেনিসন মারা যাবার পর মৃত্যুর এমন কাব্যিক বর্ণনা কারো লেখায় পড়িনি।
–এই খেয়েছে, পোয়ারো আপনমনে বললেন, বুড়ি হয়েছে, অথচ রোমান্স কমেনি। কী যে করি এখন….. পোয়ারো নিজেকে স্বাভাবিক করলেন, বললেন আপনার মুখে লর্ড টেনিসনের নাম শুনে আমার মনে পড়ে গেল তার অমর কীর্তি চার্জ অব দ্য লাইট ব্রিগেড-এর দুটো লাইন যেখানে বলা হয়েছে ক্যাননস্ ইন ফ্রন্ট অব দেম ভলিড অ্যান্ড থান্ডার্ড’। যাক টেনিসন ছেড়ে দিয়ে, যা বলছিলেন, তাই বলুন।
-কী বলছিলাম বলুন তো, মঁসিয়ে পোয়ারো ক্যারোলিন চুপ করলেন, মনে করার চেষ্টা করলেন। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল, তিনি আবার বলতে শুরু করলেন–খেয়াল করতে পারছিলাম না, সামান্য হাসি দেখা গেল তার ঠোঁটে, গুচ্ছের পুরোনো বাজনার রেকর্ড ছিল বুঝলেন, বারবারা কী খেয়ালে একটা টেনে নিয়ে এসে গ্রামোফোনে লাগিয়ে ছিল। মা গো মা, বিশ্রী রেকর্ড। যাচ্ছেতাই, ছেলেবেলায় ওই রেকর্ড শুনেছি। সকলে ছিঃ ছিঃ করত। যেমন তার কথা, তেমনই অর্কেস্ট্রা। মাথা গরম হয়ে গেল। চট করে উঠে গিয়ে ওটা থামিয়ে দিলাম।
তারপর? তারপর সেই পুরোনো ওষুধের টিউবের কথা বলছিলাম, ওটাই তো ডঃ কারোলি চোখের সামনে তুলে ধরেছিলেন, তাই না? আচ্ছা মাদাম, ওই টিউবটা কি ওষুধে পূর্ণ ছিল? নাকি….
-না, কোনো ফাঁক ছিল না, টিউবের মুখ অব্দি বড়িগুলো ছিল, চট করে জবাব দিলেন ক্যারোলিন। ডঃ কারোলির বলা কথাগুলো আমার খুব ভালো করেই মনে আছে। ওই টিউবের যতগুলো বড়ি আছে, তার অর্ধেকটাই নাকি দশ বারোজন শক্ত সমর্থ লোককে হত্যা করতে যথেষ্ট।
আবেগের বশে ক্যারোলিন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, নিজের মনে বলে চললেন–মঁসিয়ে পোয়ারো, জানেন, ওই ইটালিয়ান ডাক্তারটিকে গোড়া থেকেই আমার কেমন যেন মনে হত। তবে লুসিয়ার পুরোনো বন্ধু কিনা তাই কঠোর আচরণ করতে পারিনি। তবে পছন্দও করতে পারিনি। আপনি যাই বলুন না কেন, লোকটা ফর্মুলা চুরি করার মতলব নিয়েই লুসিয়ার সাথে বন্ধুত্ব করেছে। তার বিশ্বাস অর্জন করেছে এবং শেষে এ বাড়ির অতিথির ছদ্মবেশে ঢুকে পড়েছেন।
পোয়ারো নির্বিকার চিত্তে কারোলিনের দিকে তাকালেন। তাকে আরও যাচাই করার জন্য প্রশ্ন করলেন–মাদাম, স্যার ক্লডের ফর্মুলা যে ওই ডঃ কারোলিই হাতিয়েছে এ ব্যাপারে আপনি ষোলো আনা নিশ্চিত, তাই তো?
-না হলে আর কে বা হতে পারে বলুন আপনি? গত সন্ধ্যায় যখন ঘটনাটি ঘটে, তখন আমরা সবাই বাড়ির লোক উপস্থিত ছিলাম এখানে, একমাত্র উনি ছাড়া। আমার ভাই স্যার ক্লডও মনে হয় তাকেই সন্দেহ করে ছিলেন। এবং নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, ডঃ কারোলিই তার ফর্মুলা-চোর, কিন্তু সরাসরি তাকে চোর সাব্যস্ত করতে তার আভজাত্যে বেধেছিল। কারণ ডঃ কারোলি লুসিয়ার পুরোনো বন্ধু, সেই সুবাদে এবাড়ির অতিথি। তাই ক্লড বুদ্ধি করে বাড়ির আনোগুলো নিভিয়ে দেবার নির্দেশ দিয়েছিল। যাতে চোর আধারের সুযোগ পেয়ে জিনিসটি ফেরত দিতে পারে। ফলে চোরেরও সম্মান রক্ষা হল, আবার হারানো অমূল্য সম্পদ হাতে ফিরে এল। বলুন, স্যার ক্লড কি বোকমির কাজ করেছিল?
-মোটেও না, পোয়ারো সায় দিলেন। বরং স্যার ক্লড বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। মিস অ্যামরি, আমি দেখতে চাই গতকাল সন্ধ্যায় আপনি ঠিক কোন অবস্থানে ছিলেন। দয়া করে একবার সেখানে গিয়ে বসবেন?
ক্যারোলিন কথা না বাড়িঠে উঠে গিয়ে বসলেন সোফার একটা ধারে।
বাঃ ঠিক আছে। এবারে দু-চোখের পাতা এক জায়গায় করুন। করেছেন তো? ফিরে যান গত সন্ধ্যায়, আলো নিভে গেল, চারপাশ অন্ধকার। ঠিক আছে? নিঃসীম অন্ধকার। নিজেকে নিজে দেখা যায় না। এরকমই বিশ্রী এক অন্ধকারের মধ্যে কোনো ছোট-বড় আওয়াজ আপনার কানে এসেছিল? মনে করুন, চেষ্টা করুন।
ক্যারোলিন দু-চোখের পাতা এক জায়গায় করে বসে আছেন। ফিরে গেছেন গত সন্ধ্যার সেই নিকষ কালো অন্ধকারের গর্ভে।–হ্যাঁ, মনে আছে, একটা আওয়াজ, কেউ যেন হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে দম নিচ্ছে, পরক্ষণেই কানে এল চেয়ার উলটে পড়ার আওয়াজ, সঙ্গে সঙ্গে আর একটা আওয়াজ, ছোটখাট ধাতব টুকরোর জিনিস মাটিতে ফেলে দিলে যেমন হয়, ঠিক তেমনই শব্দ।
এখন দেখুন পোয়ারো একটা চাবি বের করে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেললেন। বললেন–এরকম আওয়াজ ছিল কি?
-আশ্চর্য! দুটো আওয়াজের মধ্যে এত মিল। মঁসিয়ে পোয়ারো, ঠিকই ধরেছেন। আওয়াজটা এরকমই পেয়েছিলাম। মাদাম তখনও চোখ বুজে আছেন।
মিস অ্যামরি, মনটাকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। দয়া করে থামবেন না।
এরপরেই লুসিয়ার আর্ত চিৎকার, সে তার শ্বশুরের নাম ধরে চিৎকার করছিল। পরক্ষণেই বাইরে আওয়াজ, দরজায় কে যেন টোকা দিচ্ছিল।
এই পর্যন্তই, আর কিছু নয়। মাদাম, আর একটু কষ্ট করুন। মনে করে দেখুন, দোহাই
–সবুর করুন, ভাবতে দিন। ক্যারোলিন মুহূর্ত খানেক পর আবার বললেন–হ্যাঁ, কাপড় ছেঁড়ার শব্দ, প্রথমেই শুনেছিলাম, মনে হল কে যেন তার পরনের পোশাক ছিঁড়ছে। বারবারা আমার পাশেই বসেছিল, অতএব সে নয়। লুসিয়া হতে পারে। সে-ই তার নিজের কাপড় ছিঁড়ছিল। মঁসিয়ে পোয়ারো আর চোখ বন্ধ করে থাকতে পারছি না। বলেন তো…….।
