ক্যারোলিন থামলেন। বুঝি বা দম নিতে।
এই সুযোগে পোয়ারো একটা সিগারেট ধরালেন। জানতে চাইলেন মিসেস লুসিয়া অ্যামরির হীরের নেকলেস চুরি হয়েছিল? কতদিন আগের ঘটনা বলতে পারেন, মাদাম?
–ঠিক দিন ক্ষণ স্থির করে বলতে পারব না, দাঁড়ান বলছি–ক্যারোলিন মনে মনে কী যেন হিসাব করলেন। বললেন–মাস দুয়েক আগে। রিচার্ড আর ওর বাবার মধ্যে কথা কাটাকাটি, এমনকি ঝগড়াও হয়েছিল। তারপরেই, যদুর মনে পড়ছে নেকলেসটার খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পোয়ারোর হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, তিনি আনমনে আঙুলের দিকে তাকালেন, ধীর পায়ে টেবিলে রাখা অ্যাশট্রের দিকে এগিয়ে এলেন। টোকা মেরে ছাই ঝাড়লেন। বললেন, আমি ধুমপান করছি, আপনার মনে হয় বিরক্ত লাগছে, তাই না, মাদাম?
-না না, ওসব বাতিক আমার নেই, মঁসিয়ে পোয়ারো, ক্যারোলিনের ঠোঁটে হাসি খেলে গেল–তাছাড়া পুরুষ ধূমপান করবে, এটাই তো স্বাভাবিক, আমার বেশ ভালো লাগে।
–ধন্যবাদ। আচ্ছা মাদাম, বলুন তো স্যার ক্লড আর তার ছেলের মধ্যে কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল? আপনি কি জানেন?
-কেন জানব না? বলছি শুনুন। রিচার্ড প্রচুর টাকা ধার করত, অবশ্য ব্যাপারটা ক্রমশ সীমার বাইরে চলে যাচ্ছিল। অবশ্য আমি এটাকে দোষ বলে মনে করি না, ওই বয়সের ছেলেরা দেনা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে ওর বাবার কথা স্বতন্ত্র। ছোটবেলা থেকেই পড়া শোনায় ভালো, বলতে পারেন মেধাবী। এমন কোনো নেশা ছিল না, যা ধার-দেনা করে চালাতে হত। পরে গবেষণা করে প্রচুর টাকার মালিক হয়েছে, একথা অজানা নেই। তবে ওর কি দোষ ছিল না? রিচার্ড আর্মিতে চাকরি করত, জানেন। এটা-সেটা বোঝাল, চাকরিটা তাকে ছাড়তে বাধ্য করল। কিন্তু হাত খরচের টাকা পাবে কোথায়? বাবা কথা দিয়েও কথা রাখেনি। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা অশান্তিতে পরিণত হল। কদিন পরেই, শোনা গেল, লুসিয়ার হার পাওয়া যাচ্ছে না, আশ্চর্যজনকভাবে। পুলিশে ব্যাপারটা জানানো হয়নি, কারণ লুসিয়ার আপত্তি। এটাও আমাদেরকে আরও বেশি আশ্চর্য করেছে।
-সত্যিই আশ্চর্য, মাদাম, পোয়ারো সায় দিলেন, লুসিয়ার মতো সুন্দরী তরুণী, দামী হীরের নেকলেস খুঁজে না পেয়ে কোনোরকম হৈ-চৈ করল না। ব্যাপারটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
-লুসিয়াকে দেখে তখন মনে হত, সামান্য এক নেকলেশ হারিয়েছে তো অ্যামরি কী যায়-আসে, এমনই ভাব। আম’লো যা, আপনাকে এসব বকবক করে কী বলছি, আপনার কোন কাজে লাগবে?
-মাদাম, আপনি দ্বিধা বোধ করছেন নিশ্চয়ই, কিন্তু আমি বলছি, আপনার মুখ থেকে এ পর্যন্ত যে সব তথ্য আমি পেলাম, আমার তদন্তের কাজে তা সাহায্য করতে পারে। মিস অ্যামরি, কোনোরকম সঙ্কোচ করবেন না, যেসব ঘটনা ঘটে গেছে, তা যত খুঁটিয়ে আমায় বলতে পারবেন, ততই আমার তদন্তের সুবিধা হবে। হ্যাঁ, পোয়ারো জানতে চাইলেন–গত সন্ধ্যায় ডিনারের টেবিলে বসে লুসিয়ার শরীর খারাপ লাগছিল, আপনি বলেছেন, তারপর? তারপর সে কি তার ঘরে চলে গিয়েছিল?
-নিজের ঘরে যেতে ওর বয়ে গেছে। ক্যারোলিনের মেজাজ বিগড়ে গেল। ডিনার হল থেকে বেরিয়ে ও সোজা এই লাইব্রেরি ঘরে এসে ঢুকেছিল। পরমুহূর্তে আমি এসে ঢুকলাম। কত রকম বুঝিয়ে সুজিয়ে সোফায় বসিয়ে দিয়েছিলাম। রিচার্ড আর লুসিয়া কী সুন্দর জুটি বলুন তো। গত বছর রিচার্ড ইটালিতে গিয়েছিল। ওখানেই লুসিয়ার সঙ্গে পরিচয়। এবং প্রেম। নভেম্বরে বিয়ে করে বউকে নিয়ে রিচার্ড দেশে ফিরে আসে।
ক্যারোলিন একটু দম নিলেন। আবার বলতে শুরু করলেন–মাতৃপিতৃহীন মেয়েটা অনাথ আশ্রমে মানুষ হয়েছে। ওর আত্মীয় স্বজনও বোধহয় কেউ নেই। না থেকে ভালোই হয়েছে। হাজার হোক বিদেশী তো। সর্বক্ষণ পেছনে লেগে থাকত, সুযোগ সুবিধা লাভের আশায়। বিদেশীদের স্বভাব-আচরণ আমার মোটেও সহ্য হয় না, সহ্য করা দায়। মাফ করবেন মঁসিয়ে পোয়ারো, আমার কথাটা আপনি আবার গায়ে নেবেন না। আপনি বিদেশী, তবে বেলজিয়ান। ইউরোপের প্রত্যেকটা যুদ্ধের আঁচ আপনাদের গায়ে লেগেছে, আপনারা, অর্থাৎ বেলজিয়ানরা কী দারুণ সাহসী, তা আমার জানা।
আসুন মাদাম, ওসব কথা বাদ দিয়ে আমরা কাজের কথায় আসি। বইয়ের শেলফে ওষুধ ভরতি ওই কালো টিনের বাক্সটা, সম্ভবত ওটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এসেছিল, তাই না? আপনারা গত সন্ধ্যায় এঘরে বসে ওটা খুলে ওষুধ ঘাঁটা ঘাঁটি করছিলেন তো।
-মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনার কথাই ঠিক। ক্যারোলিন একটু থামলেন, কী ভাবলেন, তারপর আবার বললেন–আমিই ওটা নামিয়ে নিয়ে আসতে বলেছিলাম। ভাবলাম, যদি স্যালভলটাইল বা ওই জাতীয় কোনো ওষুধ থাকে, তাহলে লুসিয়ার জ্ঞান ফেরাতে কাজে লাগবে। আমার কথা মতো বারবারা চেয়ারে উঠে ওটা পেড়ে নিয়ে এল। সেই সময় ঘরে এসে ঢুকল আমার ভাই, আর ওর সেক্রেটারি এডওয়ার্ড রেনর ও আমার ভাইপো। ডঃ কারোলিও এসে জুটেছিল। দেখলাম ওষুধগুলো সম্পর্কে ডঃ কারোলির কৌতূহল বেশি। তিনি ওষুধগুলো তুলে তুলে দেখছিলেন, নাম বলছিলেন আর ওদের শক্তির পরিচয় দিচ্ছিলেন। শুনে আমার তো চক্ষু ছানাবড়া।
–যেন ডঃ কারোলি এমন কোন ওষুধের গুণাবলীর কথা জানিয়ে দিলেন, যার ফলে আপনি ঘাবড়ে গেলেন?
–একটা টিউব উনি, অর্থাৎ ডঃ কারোলি তুলে নিলেন। টিউবের গায়ে ওষুধের নাম লেবেলে লেগে আছে। নামটা শুনে আমার সাধারণ ওষুধই মনে হচ্ছে। সমুদ্রে জাহাজে চেপে বেড়ানোর সময় সি-সিকনেস দূর করার জন্য যে ওষুধ আর কী, ওর ক্ষমতা আমার জানা আছে। বহু বার খেয়েছি কিনা। কিন্তু ডঃ কারোলি আমার ধারণা মিথ্যে করে দিলেন। তিনি জানালেন যে, এই ওষুধ এমন মারাত্মক ক্ষমতা সম্পন্ন বিষ, যার ক্রিয়ার ফলে অন্তত বারোজন শক্তিশালী পুরুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।
