-না না, কাজের কাজ কিছু নয়, পোয়ারো বিরক্ত হয়ে জবাব দিলেন, আসলে, এসব হলো ওঁর ফন্দি-ফিকিরি কথাবার্তা, আমার তদন্তের কাজের মোড় ঘুরিয়ে নেবার অপচেষ্টা মাত্র। হেস্টিংস, একবার ওঠো তো, বেল টেপো, ট্রেডওয়েলকে চাই। একটু থামলেন তিনি, তারপর বললেন–বন্ধু, তোমার হয়তো মনে নেই, গোয়েন্দাগিরির প্রথম শর্ত হল ধৈর্য। ধৈর্য হারালে সফল হবে কীভাবে?
ঘন্টা ধ্বনি শুনে দরজা ঠেলে মুখ বাড়াল ট্রেডওয়েল–বলুন স্যার, কী করতে হবে?
এসো ট্রেডওয়েল। দুটো কাজ তোমায় করতে হবে। প্রথমত, মিস ক্যারোলিন অ্যামরিকে গিয়ে বলল, আমি ডাকছি, এখুনি যেন উনি আসেন। আর দু’নম্বর হল, ওই ডঃ কারোলির ওপর নজর রাখা। উনি যেন কোনো মতেই এই বাড়ির বাইরে যেতে না পারেন। কথাটা অন্যান্য কাজের লোকদেরও জানিয়ে দিও। আর হ্যাঁ, মিস অ্যামরিকে বলল, বেশি সময় ওনাকে আটকে রাখব না। ওঁর জন্য আমরা এখানে অপেক্ষা করছি।
-ঠিক আছে, স্যার। দরজার পাল্লা ভেজিয়ে দিয়ে ট্রেডওয়েল ফিরে গেল।
-তুমি মিস ক্যারেলিনকে ডেকে পাঠালে, উনি কি আসবেন? ক্যাপ্টেন হেস্টিংস প্রশ্ন করলেন, রিচার্ডের মুখে যতদূর শুনেছি, ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদে তিনি এতই শোকাতুরা যে বিছানা ছেড়ে বাইরে বেরোতে পারছেন না। খাওয়া-দাওয়া নিজের ঘরে বসেই সেরে নিচ্ছেন। বাড়ির সবাইকে বলে বেড়াচ্ছেন, উনি অত্যন্ত অসুস্থ, তা হলে?
-তোমার তো অজানা কিছু নেই হে। পোয়ারো সামান্য হাসলেন, অন্যন্যদের মতো তোমার কি মনে হয়, উনি বিছানা আঁকড়ে পড়ে আছেন?
-সাধারণ ব্যাপার নয় কি?
–ব্যাপারটা সাধারণ কী অসাধারণ, তার সন্ধান তুমি যতই ব্যঙ্গ করো না কেন, রিচার্ড যা বলেছে, তাই বললাম।
হেস্টিংস, পোয়ারো বলতে থাকলেন, গত সন্ধ্যায় নিজের বাড়িতে এইখানে দেশের এক শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর রহস্যজনক মৃত্যু তুমি দেখেছ। তাকে খুন করা হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট তাই বলছে, বিষমিশ্রিত খাবার বা পানীয় তাকে খাওয়ানো হয়েছে। এ এক সাংঘাতিক নিদারুণ ঘটনা, অথচ তার পরিবারের লোকগুলোকে দেখ রহস্য উদঘাটনে সাহায্য না করে আমায় ভুল পথে চালনা করতে চেষ্টা করছে। লুসিয়া অ্যামরির কথাই ধরো না, গত সন্ধ্যায় যে আমাকে প্রায় হাতে পায়ে ধরে তদন্তের কাজ চালিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করেছিল, সে আজ পালটি খেয়ে গেল। সে আমাকে তদন্তের কাজ বন্ধ রেখে বিদায় নিতে বলছে। লুসিয়ার স্বামীও চাইছে, আমি এখান থেকে চলে যাই। রিচার্ড ওর পিসিমা ক্যারোলিনকে আমার সঙ্গে দেখা করতে দিতে নারাজ। ক্যারোলিনের কাছে নিশ্চয়ই, এমন কোনো তথ্য আছে, যা ফাঁস হলে রিচার্ডের বিপদ বাড়বে। এইসব কেনর জবাব আমায় জানতে হবে, বন্ধু। জঘন্য অপরাধ তো করেছেই, তার ওপর বাড়িতে ঘটে চলেছে একের পর এক নাটকীয় দৃশ্য। যে নাটকের প্রতিটি অঙ্গে আছে তীক্ষ্ণ খোঁচা দেবার শাণিত ক্ষমতা।
এমন সময় দরজা খুলে চৌকাঠ ডিঙোলেন মিস ক্যারোলিন ট্রেডওয়েল বলল, আপনি নাকি আমায় ডেকেছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো। কী সব প্রশ্ন-ট্রশ্ন করতে চান।
কথা বলতে বলতে ক্যারোলিন ঘরের একেবারে ভেতরে চলে এলেন।
–ঠিকই বলেছেন, মাদাম পোয়ারো তার দিকে এগিয়ে এলেন, গুটি কয়েক প্রশ্ন, বেশি সময় নেব না, কথা দিচ্ছি।
ক্যারোলিনকে একটা চেয়ারে বসতে বলে নিজে একটা চেয়ার টেনে তার মুখোমুখি বসলেন। এই মুহূর্তে পোয়ারোর মুখ-চোখ দেখে মনে হচ্ছে, উনি বোধহয় মিস ক্যারোলিনের দুশ্চিন্তায় ডুবে আছেন।
-সত্যি, আপনার মুখ চোখের যে হাল হয়েছে, বোঝা যায় গতকালের ঘটনা আপনাকে কতখানি শোকাহত করেছে। পোয়ারোর কথায় সহানুভূতির সুর।
–আপনি হয়তো জানেন রিচার্ডের মা অকালে মারা যায়। তারপর থেকে এই সংসারের দায়িত্ব নিয়ে ভাই ক্লডের পাশে দাঁড়িয়েছি। নিজের সুখ-শান্তির দিকে নজর দিইনি, সেই ভাই আজ আর বেঁচে নেই।
-আমি তো মেনে নিতে পারছি না, ক্যারোলিনের গলায় কান্না উঠে এল।
………কী আর বলি, অসুস্থ হয়ে বিছানা নিতে হয়েছে। আর বাড়ির লোকগুলোকে দেখুন, এমন একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল, কাজের লোকগুলোর কোনো হেলদোল আছে, যা নয়, তাই করে চলেছে আমার শরীর খারাপ, ওদের ওপর ছড়ি ঘোরাবারও কেউ নেই। যখন তখন খেয়াল খুশি মতো যেমন তেমন করে কাজ সারছে। ফ্রিজে তুলে রাখা খাবার বলা নেই কওয়া নেই, বের করছে, গরম করছে আর খাচ্ছে। ওরা এখন হাতির পাঁচ পা দেখেছে। কে বলবে, বাড়িতে একজন মারা গেছে, বুঝি বিয়ের মহোৎসব চলেছে। লুসিয়া আর বারবারারই কী দোষ বলুন। ওদের কি আমার মতো বয়স হয়েছে। নেই কোনো অভিজ্ঞতা, নেই ধমকে-ধামকে কাজ করানোর বুদ্ধি। এ এক চরম বিশৃঙ্খলা! ভাগ্যিস কেনেথ ছিল, মানে ডঃ গ্রাহাম। ও আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। গতবছর নিউরাইটিসে ভুগেছিলাম। ছেলেটা আমায় চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছিল।
ক্যারোলিন একটানা বলে চললেন-বারবারা আর কেনেথের মধ্যে ভাব–ভালোবাসা আছে। ওরা বিয়ে করে ঘর-সংসার করার মনস্থ করেছে। কিন্তু কেন যে রিচার্ড ওদের পছন্দ করে না, জানি না। আমি অসুস্থ, লুসিয়ারও শরীর ভালো নেই। কেনেথের মতো একজন ডাক্তার জামাই পেলে তো আমাদের সুবিধা। আরে, কী সব বলে চলেছি। গত সন্ধ্যার কথাই ভাবুন। রাতের খাবার খেতে খেতেই লুসিয়ার শরীর হঠাৎ খারাপ হয়ে পড়ল, বুজি বা জ্ঞান হারাবে। কিন্তু না, কোনো মতে নিজেকে সামলে মেয়েটা এখানে চলে এল। বুঝতেই পারছেন, কতই বা বয়স বেচারীর, তার ওপর নার্ভও বিশেষ ভালো নয়। অবশ্য ইটালিয়ান রক্ত যার শরীরে, তার নার্ভ মজবুত হতে পারে না। সেদিনের কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। কয়েক মাস আগের ঘটনা, লুসিয়ার হীরের নেকলেসটা চুরি হল। তখন………..
