বাঃ, কী সুন্দর সহজভাবে বুঝিয়ে দিলেন। পোয়ারো মুচকি হাসলেন। যেন একটা কবিতা, পরক্ষণে গম্ভীর মুখে বললেন কিন্তু ক্যাপ্টেন হেস্টিংস এর উপদেশ তুললে আমার চলবে না–আমি একজন রসহীন গোয়েন্দা। বাস্তব দৃষ্টি ভঙ্গি দিয়ে সবকিছু খুঁটিয়ে বিচার করা আমরা কাজ। ডঃ কারোলি, আমার ধারণা, স্যার ক্লড অ্যামরির আবিষ্কৃত পরমাণু বোমার ফর্মুলাটির দাম কয়েক লাখ পাউন্ড তো হবেই। আপনিও কি তাই বলেন?
হতে পারে, নিস্পৃহ কণ্ঠে ডঃ কারোলি জবাব দিলেন, আসলে এসব ব্যাপারে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।
-বুঝতে পারছি, আপনি আর পাঁচজন সাধারণের মতো নন, আপনি উন্নত দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মহানুভব ব্যক্তি। দেশে দেশে ভ্রমণ করা অর্থাৎ ঘুরে বেড়ানো ব্যয় সাপেক্ষ ব্যাপার। আপনার অর্থের অভাব নেই। তাই অনায়াসে যেখানে খুশি বেড়াতে পারেন।
দুনিয়াটা ঘুরে দেখার চেষ্টা করা কি অস্বভাবিক কিছু? যে পৃথিবীতে বাস করছি, তার চেহারাটা দেখতে হবে বৈকি!
নিশ্চয়ই দেখবেন, তবে দেশের চেহারা দেখলেই চলবে না, বিভিন্ন মানসিকতার লোক রয়েছে, অনেকে বদ মতলবে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় তাদের চেহারাটাও দেখা দরকার বলে মনে করি। যেমন স্যার ক্লডের ফর্মুলাটা যে চুরি করেছে, তার কথা ধরুন। তার মানসিকতা কী ধরনের সেটা জানার জন্য চোরের চেহারাটা দেখা দরকার আপনার মতো যারা নানা দেশে ঘুরে বেড়ায়, তাদের পক্ষেই সম্ভব।
-তা যা বলেছেন কারোলি খুশি মনে বললেন–অদ্ভুত মানসিকতার লোক বটে।
–এরা ব্ল্যাকমেলার। পোয়ারো চাপা গলায় বলে উঠলেন।
–মানে? ডঃ কারোলি বললেন–কী বলতে চান?
–বিশেষ কিছু নয়। আমি বললাম, ওই বিচিত্র মানসিকতার লোকটি ব্ল্যাকমেলার হতে পারে।
পোয়ারো থামলেন। খানিকবাদে তিনি নড়েচড়ে বসলেন। বললেন–আমরা কথায় কথায় মূল প্রসঙ্গ থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছি। অর্থাৎ স্যার ক্লড অ্যামরির মৃত্যুরহস্য।
–স্যার ক্লডের মৃত্যু! ডঃ কারোলি বাধা দিয়ে বললেন, স্যার ক্লডের মৃত্যু আমাদের আলোচনায় আসছে কী করে?
–কেন নয়? আমার মনে আছে, স্যার ক্লডের আধবসা পাথরের মতো দেহটাকে দেখে আপনি প্রথম পরীক্ষা করে রায় দিয়েছিলেন, হার্ট অ্যাটাকে ওঁর মৃত্যু হয়েছে। অবশ্য পরে, পোস্টমর্টেম করে জানা যায়, হার্ট অ্যাটাক নয়, বিষ খাইয়ে ওঁকে খুন করা হয়েছে। অর্থাৎ ওঁর খাবারে বা পানীয়ে বিষ মেশানো হয়েছে।
-ওঃ, তাই নাকি। ডঃ কারোলি অবাক হওয়ার ভান করলেন।
–আপনার ধারণা আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট–দুটোর মধ্যে মিল নেই কেন, এটা ভেবে আশ্চর্য হচ্ছেন নিশ্চয়ই।
-একটুও নয়, জোর গলায় ডঃ কারোলি বললেন, কাল রাতে ওঁকে পরীক্ষা করে আমার এই ধারণাই হয়েছিল।
-এবার বুঝতে পারছেন, ব্যাপারটা আর সহজ সরল নেই, কেমন জট পাকানো। অতএব পোয়ারো কঠিন কণ্ঠে বললেন, ডঃ কারোলি, আপনি কোনো ভাবেই এ বাড়ি ছেড়ে এখন যেতে পারছেন না।
ডঃ কারোলি অসহায়বোধ করলেন–আপনার কী ধারণা, ওই ফর্মুলা চুরির আড়ালে আমার কোনো হাত আছে?
-অবশ্যই। আপনি কি নিজেকে সন্দেহের বাইরে মনে করেন?
-ফর্মুলার কথা বাদ দিলে থাকে স্যার ক্লডের মৃত্যুর ঘটনা। ডঃ কারোলি বলতে থাকলেন–এই পরিবারের কোনো একজনকে দেখাতে পারবেন, যিনি ওঁর মৃত্যু কামনা করেননি। মাফ করবেন, একটা অপ্রিয় সত্যি কথা বলি, বহুদিন ধরে এই পরিবারের লোকেরা ওনার শাসনে জর্জরিত ছিল। কারো প্রতি ওনার প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা ছিল না। তিনি কেবল জানতেন নিজের আবিষ্কারে মেতে থাকতে। কাজই ছিল তাঁর প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। ফলে প্রচুর টাকার মালিক হতে পেরে ছিলেন। যার সুবাদে পরিবারে এমন এক বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিলেন যার থেকে মুক্তি পাবার জন্য সকলেই হাঁস ফাঁস করছিলেন, তাছাড়া স্যার ক্লড ছিলেন অত্যন্ত কিপটে, আঙুলের ফাঁক দিয়ে পয়সা বেরোত না। এই অবস্থায় স্যার ক্লডের আকস্মিক মৃত্যু পরিবারের সকলকে শান্তি দিয়েছে বলে আমি মনে করি।
অবাক করা ব্যাপার! স্যার ক্লডের চরিত্রের এত বৈশিষ্ট্য আপনি কি গত সন্ধ্যাতেই লক্ষ্য করেছিলেন, ডঃ কারোলি?
মঁসিয়ে, পোয়ারো, আমি অন্ধ নই। সুতরাং সব কিছু নজরে পড়াই স্বাভাবিক। এই পরিবারের তিনজনকে জানি, যাঁরা স্যার ক্লডের মৃত্যু চেয়েছিলেন। অবশ্য এ ব্যাপারে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।
–ডঃ কারোলি, পোয়ারোর চোখে কৌতূহলের ইশারা, আপনি যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চান না কেন, আপনাকে আমি কোনো রকম সাহায্য করতে পারছি না, অমি নিরুপায়।
–আশা করি, আপনার প্রয়োজন মিটেছে। যেতে পারি?
–এই মুহূর্তে আর কোনো প্রয়োজন নেই, পরে দরকার হলে ডাকব।
ডঃ কারোলি আর অপেক্ষা না করে দরজার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। হঠাৎ কী মনে করে ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন–একটা কথা জানবেন মঁসিয়ে পোয়ারো, এমন কিছু মহিলা আছে, যাদের আমরা চিনি, আমাদের আশে পাশেই ঘুরঘুর করছে, তারা কিন্তু কম বিপজ্জনক নয়, মানুষ খুন করা তাদের কাছে তুচ্ছ ব্যাপার। তাদের বাড়বাড়ন্ত বা স্বেচ্ছাচারিতা কোনোটাই সুখের কারণ নয়।
বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে ডঃ কারোলি ঘর ছেড়ে চলে গেলেন।
.
১১.
–পোয়ারো, ডঃ কারোলি বিদায় নিলে ক্যাপ্টেন হেস্টিংস বললেন, ওনার কথাগুলো শুনলে? কিছু হয়তো বোজাতে চাইছিল মনে হয়।
