ক্যাপ্টেন হেস্টিংস ওদের কথাবার্তা শুনছিলেন, কিন্তু অর্থ বুঝতে পারছিলেন না। তাই বিরক্ত ভরে বলেন–কোন ভাষা?
দুঃখিত ক্যাপ্টেন হেস্টিংস, ডঃ কারোলি সঙ্কোচ বোধ করলেন–আমি জানতাম না, আপনি ইটালিয়ান জানেন না। মাসিয়ে পোয়ারো, একটা কথা জানিয়ে রাখি আগেই আমার হাতে সময় কম। লন্ডনে কিছু জরুরি কাজ আছে। সেগুলো সারতে আজই আমাকে চলে যেতে হচ্ছে।
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। দরকার হলে, আর এখানকার কাজ শেষ হলে তবেই যাবেন। মিছিমিছি আপনাকে বাধা দিতে যাব কেন বলুন। এসব কথায় পরে আসছি। আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিন। গতরাতে আমরা দুজনে অর্থাৎ ক্যাপ্টেন হেস্টিংস আর আমি এখানে আসার আগে কী কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে জানতে চাইছি। খুঁটিয়ে বলুন, কিছু বাদ দেবেন না, ডঃ কারোলি।
বেশ, বলছি, গত সন্ধ্যায় ডিনার শেষ করে বাড়ির সকলে এ ঘরে এসে ঢুকলেন। আমিও তাদের অনুসরণ করলাম। স্যার ক্লড তার সেক্রেটারি এডওয়ার্ড রেনরকে ডাকলেন, তাঁরা স্টাডিতে ঢুকে পড়লেন। কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর স্যার ক্লড স্টাডি থেকে বেরিয়ে এসে জানালেন যে একটা কাগজ তিনি খুঁজে পাচ্ছে না, অর্থাৎ সেটি খোয়া গেছে।
–কাগজটা কীসের তা নিশ্চয়ই উনি বলেছিলেন? পোয়ারো শ্যেন দৃষ্টিতে ডঃ কারোলিকে জরিপ করতে লাগলেন।
-হ্যাঁ, বলেছিলেন। একটু চুপ করলেন ডঃ কারোলি, সম্ভবত কিছু বললেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন–কাগজটায় নাকি একটা ফর্মুলা লেখা ছিল, প্রচণ্ড ধ্বংসাত্মক এক পারমাণবিক বোমার তৈরির ফর্মুলা। স্যার ক্লড আরও বললেন, তার ধারণা যে, ফর্মুলা-চোর এখনও এঘর থেকে সরে পড়েনি, অর্থাৎ পরিবারের সকলের মধ্যেই আছে। কথাটা শুনে আমি খুব মুশকিলে পড়লাম, কারণ ঘরে যারা আছেন, সকলেই এই পরিবারের একমাত্র আমি ছাড়া, যার সাথে এদের পারিবারিক সম্পর্ক নেই। স্যার ক্লডের কথা শুনে সকলের মধ্যে থেকে কে একজন যেন বলে উঠলেন, বেশ, আমাদের তল্লাসি করা হোক। প্রত্যেকে এ প্রস্তাবে রাজী হলেন, আমারও আপত্তি নেই জানিয়ে দিলাম। হতে পারি আমি বিদেশী, কিন্তু আমার তো আত্মসম্মান আছে। এমন একটা সন্দেহ যখন ওদের মনের কোণে উঁকি দিয়েছে, তখন ওদের সাথে তাল দেওয়া ছাড়া আমি আর কি করতে পারতাম বলুন আপনি?
–ঠিকই করেছেন। পোয়ারো সায় দিয়ে বললেন, ওই মুহূর্তের পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজটা আপনি ঠিকই করেছেন। কিন্তু আজ? আজকের ব্যাপারটা কিভাবে সামলাবেন বলুন।
-মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনাকে আগেই জানিয়েছি, আবার বলছি, লন্ডনে অত্যন্ত জরুরী কাজ পড়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে লন্ডনের পথে রওনা হতে হবে।
–তাহলে আপনাকে যেতেই হবে, কী বলেন ডঃ কারোলি?
–অবশ্যই আমাকে যেতে হবে, কোনো উপায় নেই। বোঝা গেল ডঃ কারোলি বেশ চটে গেছেন।
–ওনার কথায় যুক্তি আছে। ক্যাপ্টেন হেস্টিংস, তুমি কী বলে?
হেস্টিংস তার বন্ধুর দিকে ভাবলেশহীন চোখে তাকালেন, অর্থাৎ ডঃ কারোলির কথা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
–মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনার কাছে একটা অনুরোধ রাখছি। দয়া করে আপনি মি. রিচার্ড অ্যামরিকে বুঝিয়ে বললেন। আমার এভাবে চলে যাওয়া উনি হয়তো পছন্দ করবেন না। এই নিয়ে ওদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি হোক, তা আমি চাই না।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, ডঃ কারোলি। পোয়ারো হাত তুলে অভয় দিলেন, বললেন, এবার একটা প্রশ্নের ঠিক-ঠিক উত্তর দিন তো। মাদাম লুসিয়া অ্যামরির সঙ্গে আপনার কি আগেই পরিচয় ছিল?
নিশ্চয়ই, ডঃ কারোলি জোরের সঙ্গে বললেন, আপনার কাছে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এতবছর পর এই গ্রাম্য পরিবেশে ওকে দেখে আমি যতটা অবাক হয়েছি, খুশিও হয়েছি ততটা। সত্যি, এ অভাবনীয়, অকল্পনীয়……
–কী বললেন? অভাবনীয় ও অকল্পনীয়?
–ঠিক তাই। আড়চোখে ডঃ কারোলি তাকালেন পোয়ারোর মুখের দিকে।
পোয়ারো নিজেকে নিজে শুনিয়ে বললেন–সত্যিই অকল্পনীয় বটে! তারপর বিস্ময়ভাব কাটিয়ে বললেন–আপনার কল্পনার প্রসারতা দেখে তাজ্জব বনে যাচ্ছি। দারুণ! দারুণ!
পোয়ারো ও হেস্টিংস বাঁকা চোখে ডঃ কারোলিকে লক্ষ্য করলেন, বোঝা গেল, পোয়ারো নীচু স্বরে কথাগুলো বললেও ডঃ কারোলির কানে বেশ ভালো ভাবেই প্রবেশ করেছে।
ডঃ কারোলি তবুও নীরব। পোয়ারো এবার জানতে চাইলেন–এই যে বিশ্বে নিত্যদিন কিছু না কিছু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ঘটে চলেছে, এ সম্পর্কে আপনার আগ্রহ কতটা?
–ডঃ কারোলি সামান্য হেসে বলেন–সম্পূর্ণ মাত্রায়। আমি যেহেতু একজন ডাক্তার, তাই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্পর্কে আমার আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক।
স্বীকার করছি। পোয়ারো বললেন, আপনার পেশার সাথে যেসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, এই ধরুন, দুরারোগ্য ব্যাধির কোনো টিকা, নতুন বীজানুর সন্ধান, রোগ সারাতে অমুক রশ্মির সাহায্য গ্রহণ–এসব ক্ষেত্রে আপনার আগ্রহ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মারাত্মক ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বোমা বা বিস্ফোরক আবিষ্কার, এসবে আপনার আগ্রহের কারণ কী? আপনাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোন উন্নতির কাজে এসব সহায়ক?
-কিছু মনে করবেন না, মঁসিয়ে পোয়ারো, রোগ সারানোর টিকা বলুন, আর পরমাণু বোমা বলুন, সবইতো বিজ্ঞানের অবদান, এটা মানতেই হবে। অর্থাৎ প্রকৃতিকে জয় করার নমুনা মাত্র। প্রকৃতির বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে মানুষ বিজ্ঞানের হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অতএব, পরমাণু বোমা বা বিস্ফোরক সম্পর্কে আমার আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক বলে মনে করি।
