ডঃ গ্রাহাম সামান্য বিরতি নিলেন–জানেন তো, ইটালিয়ানদের একটা কুখ্যাতি আছে, বিষপ্রয়োগে হত্যার ক্ষেত্রে তাদের জুড়ি মেলা ভার।
–ঠিক, ঠিক, পোয়ারো গলার আওয়াজ চড়িয়ে বললেন–ওই বর্গিয়ার আংটির মতো।
পোয়ারোর শেষ কথা দুটি সম্ভবত ডঃ গ্রাহাম শুনতে পাননি, তাই তিনি কান এগিয়ে বললেন–দুঃখিত বুঝলাম না, কার কথা যেন আপনি বললেন।
বাদ দিন ওসব কথা। পোয়ারো বর্গিয়ার বিষয়ে কোনো কথা বাড়াতে চাইলেন না।
টেবিল থেকে ব্যাগটা তুলে নিতে নিতে ডঃ গ্রাহাম বললেন–মঁসিয়ে পোয়ারো, আমাকে এবার বিদায় নিতে হচ্ছে। কিছু মনে করবেন না, পুলিশ কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে আশা করি। আপনি ততক্ষণ কোনো জিনিসকে কাউকে হাত দিতে দেবেন না, নজর রাখবেন। এ আমার অনুরোধ, জানেনই তো ব্যাপারটা কত গুরুত্বপূর্ণ। এ বাড়ির সকলকে এই ঘটনার গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝানো সম্ভব নয়।
ডঃ গ্রাহাম পোয়ারোও হেস্টিংস-এর সঙ্গে হান্ডশেক করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
–আপনি সম্পূর্ণভাবে আমার ওপর ভরসা করতে পারেন। কথা দিচ্ছি, এ ঘরের কোনোকিছু এধার ওধার হবে না।
ডঃ গ্রাহাম বসার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ক্যাপ্টেন হেস্টিংস দরজার পাল্লা এঁটে দিতে দিতে বললেন, সত্যি বলছি পোয়ারো, এ বাড়িতে পড়ে আছি, কখন যে খাবারের মধ্যে কী বিষ মিশিয়ে দেবে জানি না, এক মারাত্মক খুনি চোখের সামনে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারওপর ওই ডঃ কেনেথ গ্রাহাম, নোকটা সুবিধার মনে হয় না। তার ওপর এ পরিবারের মেয়ে বারবারার সঙ্গে লুকিয়ে চুরিয়ে ফস্টিনষ্টি করে, এ বাড়ির কারো সঙ্গে তার তেমন ভাব আছে বলে আমার মনে হয় না।
-তুমি কি ভাবছ, খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে আমাদের কেউ মারাত্মক অসুস্থ করে দেবে। ভয়ে হাত-পা সোঁধয়ে যাচ্ছে, তাই না? পোয়ারো ভুরু কুঁচকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন ক্যাপ্টেন হেস্টিংস এর দিকে। তারপর তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন–ক্যাপ্টেন ওসব ভয় মনের ভেতর এনো না। সত্যি সত্যি তেমন কোনো মারাত্মক অসুখে পড়ার আগেই হয়তো তল্পিতল্পা গুটিয়ে আমাদের ফিরে যেতে হবে। যাইহোক বন্ধু, এসো, বসে না থেকে কাজ শুরু করি।
-তুমি কী বলতে চাইছ, খুলে বলল, বুঝতে সুবিধা হবে।
হেস্টিংস-এর কথা শুনে পোয়ারো সামান্য হেসে বললেন–সিজারে বর্গিয়াকে জেরা করব এবার। শুধু আমি নয়, তুমিও সঙ্গে থাকবে আমার।
কথা শেষ করেই পোয়ারো দেওয়ালে সাঁটা কলিং বেলের সুইচ টিপলেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেডওয়েল বসার ঘরের মধ্যে পা রাখল–বলুন, স্যার, ডাকছেন কেন?
–হ্যাঁ, ট্রেডওয়েল, পোয়ারো বললেন, ডঃ কারোলিকে ডেকে দাও তো, কিছু প্রশ্ন আছে।
ট্রেডওয়েল ঘাড় কাত করে নিঃশব্দে চলে গেল।
পোয়ারো বললেন ক্যাপ্টেন, এই টিনের বাক্সটা এখান থেকে চট করে সরিয়ে ফেলো, ডঃ কারোলি এসে যেন দেখতে না পায়।
বাক্সটা তিনি তুলে দিলেন ক্যাপ্টেনের হাতে, একটা চেয়ার টানতে টানতে নিয়ে এলেন বুক শেলফ-এর কাছে। বললেন, বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে উঠে পড়ে।
হেস্টিংস চেয়ারে উঠে পড়লেন, বাক্সটা নিয়ে আগে যেখানে ছিল, সেখানে রেখে দিলেন।
-হেস্টিংস, পোয়ারো বলতে থাকলেন, একটা রহস্য সমাধানের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলতার দাম অনেক। মুখ টিপে হাসলেন। আবার বললেন, এবার তা তুমি দেখতে পারবে, আশাকরি।
সেই সাদৃশ্যের ওপরে কী যেন বলছিলে, তাই না? হেস্টিংসও সামান্য হাসলেন, হ্যাঁ, এবার তোমার বক্তব্য পরিষ্কার বুঝতে পারছি।
-তাই নাকি হে? বল, বল, কী বুঝেছ?
তোমার ভাবগতিক দেখে আমার মনে হচ্ছে, ডঃ কারোলিকে ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য কিছু একটা করতে চাও। গত রাতে এই টিনের বাক্সের ওষুধের শিশিগুলো নিয়ে যারা ঘাঁটাঘাঁটি করছিলেন, ডঃ কারোলি তাদের দলভুক্ত। অন্যদিকে তুমি চাও, উনি যাতে আগে আগে সাবধানী না হয়ে যান, তার ব্যবস্থা করতে, ঠিক বলেছি?
–বাঃ, তোমার মগজের প্রশংসা করতে হয়, ভাবতে পারিনি, বয়সের সাথে সাথে তোমার বুদ্ধি এত পাকা হতে পারে। পোয়ারো বন্ধুর কাঁধে সামান্য চাপ দিয়ে বললেন।
বন্ধু, ভুলে যেও না, তোমার সাথে আমার আজকের পরিচয় নয়। আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব নয়।
বইয়ের শেলফের ওপর আঙুল বুলিয়ে পোয়ারো বললেন, কত ধুলো জমেছে দেখ, নিজের ধুলো মাখা আঙুল তুলে দেখালেন, এদিকটায় কাজের লোকেরা চোখ দেয় না বুঝতে পারছি। নিজেই আমি জায়গাটা পরিষ্কার করে দিতাম, যদি একটা ভেজা ন্যাকড়া……..
কথা শেষ না করেই তিনি চেয়ার থেকে নেমে পড়লেন, সেটাকে পূর্বের জায়গায় বসিয়ে দিলেন। হেস্টিংস তাকিয়ে আছেন তার দিকে কেমন অস্বাভাবিক চাউনি, থমথমে মুখ।
–কী হল? হেস্টিংস অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, মুখ চোখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু পেয়েছ?
-পেয়েছি, পোয়ারো চাপা গলায় বললেন–পেয়েছি, কাঁড়ি কাঁড়ি ধুলো, যা বহুদিন ধরে জমেছে।
এমন সময় ঘরে এসে পা রাখলেন ডঃ কারোলি।
–বলুন মঁসিয়ে পোয়ারো, খাঁটি ইটালিয়ান ভাষায় ডঃ কারোলি জানতে চাইলেন আপনি নাকি আমায় কিছু জানার জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন?
-হ্যাঁ, ডঃ কারোলি,
ইটালিয়ান ভাষায় জবাব শুনে ডঃ কারোলি এবার পোয়ারোর মাতৃভাষা ফরাসিতে বললেন–ইটালিয়ান ভাষা বেশ ভালোই বলেন দেখছি, মঁসিয়ে পোয়ারো।
