–পরিচয়। কী বলছ, কেনেথ, লোকটাকে চিনিও না, এমনকি ওর নামটাও শুনিনি। কখনো, গতকালই লোকটাকে প্রথম আমি দেখেছি।
–তবে শুনেছি যে, উনি তোমার বউ লুসিয়ার বন্ধু, কথাটা কি ঠিক?
বন্ধু নয়, কোনো একসময় লুসিয়ার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছিল মাত্র, লুসিয়া সেইরকমই বলেছিল।
–তারমানে দুজনের মধ্যে মনের কোনো টান নেই, তাইতো?
–হ্যাঁ, তাই-ই।
–আচ্ছা, বেশ, ডঃ গ্রাহাম মুখে সামান্য একটা আওয়াজ করলেন। তারপর বললেন–যে সম্পর্কই থাকুক না কেন, ওই ডাক্তার কিন্তু কোনো ভাবেই এ বাড়ি ছেড়ে বাইরে যেতে পারবেন না। রিচার্ড, এটা ওঁকে বুঝিয়ে বলার দায়িত্ব তোমার।
–তুমি বলার আগেই ওঁকে একথা গতরাতেই শুনিয়ে দিয়েছি, কেনেথ। বলেছি, বাবার চুরি যাওয়া ফর্মুলার সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তাকে এই বাড়িতে থাকতে হবে, কোথাও যাওয়া চলবে না। গ্রামের এক কম দামের সরাইখানায় উনি উঠেছিলেন। গতকাল সকালে আমার নোক গিয়ে ওঁর জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে।
উনি আসতে রাজী হয়ে গেলেন?
ডঃ কেনেথ গ্রাহামের জবাবে রিচার্ড চোখ বড় বড় করে বলল–কোনোরকম উচ্চবাচ্যই করেননি, বরং এখানে আসতে পেরে উনি বুঝি বর্তে গেলেন, এমনই ভাব দেখালেন।
-বুঝেছি। ডঃ গ্রাহামের গম্ভীর মুখ আরও গম্ভীর হল। যাক, এবার বলো, তোমার বাবার মৃত দেহ এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরে এ ঘরের দরজা জানলাগুলো বন্ধ, না খোলা ছিল?
আমি বলছি, ডঃ গ্রাহাম, পোয়ারো এবার জবাব দিলেন। স্যার ক্লডের মৃতদেহ করোনারে পাঠানোর পর এঘরের দরজা জানলা বন্ধ ছিল। আমার নির্দেশে শুতে যাবার আগে ট্রেডওয়েল সবকটা দরজা জানলা ভেতর থেকে ভালো করে এঁটে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। চাবি আমার হাতে দিয়ে সে চলে গিয়েছিল। ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র যেমন এখন আছে দেখছেন, তেমনই ছিল, কোনো নড়চড় হয়নি, শুধু কয়েকটা চেয়ার ছাড়া। আমাদের বসার জন্যই চেয়ারগুলোর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে।
টেবিলের ওপরে গত সন্ধ্যার একটা এঁটো কফির কাপ তখনও পড়ে ছিল। ডঃ গ্রাহামের নজর সেদিকে পড়ল। তিনি কাপটির দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন–রিচার্ড, এটাই কি সেই কাপ? মনে হয় এটাতেই তোমার বাবা শেষ কফি খেয়েছিলেন?
রিচার্ড এ প্রশ্ন শুনে হতভম্ব হয়ে গেল, জবাব খুঁজে পেল না বলার মতো।
ডঃ গ্রাহাম কফি টেবিলের কাছে এগিয়ে গিয়ে কাপটা তুলে নিলেন–এটা আমায় নিয়ে যেতে হচ্ছে তদন্তের স্বার্থে। যতটুকু তলানি পড়ে আছে, পরীক্ষা করলে ধরা পড়ে যাবে, আশা করি বিষের চিহ্ন পাওয়া যাবে। কাপটা তিনি নিজের ব্যাগের মধ্যে রাখার জন্য তৈরি হলেন।
রিচার্ড এগিয়ে এল–তুমি কি নিশ্চিত এই কাপে বিষ আছে? কোনোরকমে রিচার্ড বলল, কিন্তু প্রমাণ সোপাটের চেষ্টা করল না।
-হ্যাঁ, আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, স্যার ক্লডের ডিনারে কোনো বিষ দেওয়া হয়নি। অতএব ধরে নেওয়া যেতে পারে, ডঃ গ্রাহামের চাপা কণ্ঠস্বর, বিষ মেশানো হয়েছিল তোমার বাবার কফিতে হিসকোসিন হাইড্রোব্রোমাইড।
আমি, আমি কথাটা বলে রিচার্ড এগিয়ে এল, তীব্র হতাশা তাকে গ্রাস করেছে, কী মনে করে খোলা ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর কাছে এসে দাঁড়াল, লাফিয়ে বেরিয়ে এল বাগানে।
উঃ গ্রাহাম ব্যাগ খুলে কিছুটা তুলো বের করলেন, কাপটা ভালো করে জড়িয়ে নিলেন। তারপর একটা ছোট কার্ডবোর্ডের বাক্সে ভরে চালান করে দিলেন নিজের ডাক্তারি ব্যাগের মধ্যে।
হাতের কাজ সারতে সারতে পোয়ারোকে উদ্দেশ্য করে ডঃ গ্রাহাম বলে চললেন–মঁসিয়ে পোয়ারো, কী বিশ্রী ব্যাপার বলুন তো। আগামী দিনগুলি তাকে কোন পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করাবে, সে কথা ভেবে বেচারা রিচার্ড দারুণ মুষড়ে পড়েছে। রাজ্যের খবরের কাগজগুলোর কথাই ধরুন। স্যার ক্লড অ্যামরিকে হত্যা, সঙ্গে ওর স্ত্রীর ইটালিয়ার ডাক্তারের বন্ধুত্ব, ব্যাপারটাকে কি ওরা ভোলা চোখে দেখবে। এই কেচ্ছা কেলেঙ্কারির কথা ওরা রসিয়ে রসিয়ে কাগজগুলোতে ছাপবে। স্বাভাবিকভাবেই এই নোংরা কাদার ছিটে এসে পড়বে রিচার্ডের বউ লুসিয়ার গায়ে, শুরু হবে পারিবারিক অশান্তি। বেচারী, লুসিয়া, আমি জানি, ও সম্পূর্ণ নির্দোষ, এ বিষ প্রয়োগের ঘটনার সঙ্গে কোনো মেয়ে জড়িত নয় জানবেন।
ডঃ গ্রাহাম একটু থামলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন–আমার কী মনে হয় জানেন, মঁসিয়ে পোয়ারো? রিচার্ড মুখে যাই বলুক না কেন, আসলে কিছু জানে না। বেচারী লুসিয়া। কম বয়স, তার ওপরে ধনী গবেষকের একমাত্র ছেলের স্ত্রী। কথাটা জানতে পেরে ওই ইটালিয়ান ডাক্তার লুসিয়ার সঙ্গে ভাব জমিয়েছে এবং ধীরে ধীরে একধরনের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মাফ করবেন, বলতে বাধ্য হচ্ছি, ডঃ কারোলির মতো বিদেশীরা প্রচণ্ড ধড়িবাজ, এরা নিজের উদ্দেশ্য সফল করার জন্য যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।
তার মানে আপনি এ পরিবারের সকলকে সন্দেহের বাইরে রাখছেন, ডঃ কারোলিকেই অপরাধী মনে করছেন, তাই না?
কথাটা বলতে বলতে পোয়ারো বাঁকা চোখে একবার তার সহকারী ক্যাপ্টেন হেস্টিংস-এর দিকে তাকালেন।
ডঃ গ্রাহাম কী বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। এদিক-ওদিক তীক্ষ্ণ চোখে জরিপ করলেন। তারপর চাপা গলায় বললেন, আমরা সকলেই জানি, স্যার ক্লডের হারিয়ে যাওয়া ফর্মুলাটা কতখানি মূল্যবান। অতএব এক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, একজন বিদেশী, যার নাম এই বাড়ির কেউ কোনোদিন শোনেনি, তার পক্ষে ওই ফর্মুলা জানা কী ভাবে সম্ভব? তবে ভুলে যাবেন না। ওই ইটালিয়ান ডাক্তার এখানে আসার পরেই প্রথমে চুরি হল ফর্মুলা, তারপর রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হল স্যার ক্লড অ্যামরির।
