এমন সময় ঘরের দরজা ঠেলে পা রাখল রিচার্ড অ্যামরি, পেছনে ডঃ কেনেথ গ্রাহাম।
-একী, লুসিয়া, তুমি? বউকে দেখে রিচার্ড সত্যিই অবাক হল। ভীষণ রেগে গেল। প্রকাশ না করে বলল–সকাল থেকে বিছানা আঁকড়ে পড়ে আছো, শরীর খারাপ। অথচ এখানে? কী জন্য?
কেন, রিচার্ড, কী হয়েছে? স্বামীর কথা শুনে লুসিয়ার বুকটা আঁতকে উঠল, নতুন কিছু নিশ্চয়ই ঘটেছে, তোমার মুখমণ্ডলই তা বলে দিচ্ছে, বলল না কী হয়েছে?
–আঃ, লুসিয়া, শান্ত হও। বউকে আশ্বস্ত করল রিচার্ড। কিচ্ছু হয়নি। আমরা এখানে কিছু কথা বলব, তুমি বরং তোমার ঘরে যাও, লক্ষ্মীটি।
-কেন, আমার সামনে কি…… আর কিছু বলার সাহস হল না লুসিয়ার, রিচার্ড দরজা খুলে দিল, পায়ে পায়ে লুসিয়া বসার ঘর থেকে অদৃশ্য হল।
১০. কী আর বলি
১০.
কী আর বলি, মঁসিয়ে পোয়ারো, হাতের ডাক্তারি ব্যাগটা টেবিলের ওপর রাখলেন ডঃ গ্রাহাম, খুব গম্ভীর দেখাচ্ছে তাকে একটা খারাপ খবর নিয়ে এসেছি।
খারাপ খবর। পোয়ারো মনে মনে খুশি হলেন, নিশ্চয়ই স্যার ক্লড অ্যামরির মৃত্যুর কারণ জানা গেছে। আর সেটাই বলতে এসেছেন, তাই না?
–ঠিকই ধরেছেন। ডঃ গ্রাহাম। ঘাড় নেড়ে বললেন, পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বলছে, বিষ ক্রিয়াই স্যার ক্লডের মৃত্যুর কারণ কফির সঙ্গে ওই বিষ মেশানো হয়েছিল।
বিষটা নিশ্চয়ই হিসকোসিন হাইড্রোব্রোমাইড বা ওই জাতীয় কিছু, তাই না ডঃ গ্রাহাম।
–হুঁ, কিন্তু আপনি জানলেন কী করে?
টেবিলের ওপর রাখা ওষুধভরা টিনের বাক্সটা যাতে ডঃ গ্রাহামের নজরে না পড়ে, তাই পোয়ারো সেটা রেখেছিলেন গ্রামোফোনের আড়ালে।
–কিন্তু কেনেথ, রিচার্ড বসেছিল সোফার একপাশে, সে এবার মুখ খুলল, আমি তো এসবের মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।
–জেনে রাখো, রিচার্ড, এই কেসটা পুলিশের হাতে চলে গেছে। অতএব খানাতল্লাশি বা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যে কোনো সময় তোমাদের বাড়িতে চলে আসতে পারে, প্রস্তুত থেকো। মনে রেখো এটা একটা খুনের মামলা।
–ওফ, কী সাংঘাতিক ব্যাপার, রিচার্ড চেঁচিয়ে উঠল, পুলিশ, খুন–এসব তো ভাবতেই পারছি না। ভাই কেনেথ, তোমায় অনুরোধ করছি, ব্যাপারটা এখানেই থামিয়ে দাও, আর গড়াতে দিও না, সর্বনাশ হয়ে যাবে।
রিচার্ড, উত্তেজিত হয়ো না। ডঃ গ্রাহাম সান্ত্বনার সুরে বললেন–আমি তোমাদের শুভাকাঙ্খী, মনে রেখো, কিন্তু পুলিশি ঝামেলা থেকে তোমাদের রক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, দুঃখিত। ব্যাপারটা করোনার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ধামা চাপা দেবার উপায় নেই। তাছাড়া পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট পরিষ্কার লিখেছে–আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু নয়, এটা খুন।
তার মানে বিষমেশানো কফি খাইয়ে বাবাকে হত্যা করা হয়েছে?
রিচার্ডের প্রশ্নের জবাবে ডঃ গ্রাহাম বললেন–পরিস্থিতি তাই বলছে। রিচার্ড, আর একটা খবর শুনে রাখো। করোনারের হাতে সব তথ্য এসে গেছে, অতএব দেরি না করে ওরা আগামীকালই বিংস আমর্স-এ তদন্তের কাজ শুরু করবে।
পুলিশি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তেই হচ্ছে, এটাই তোমার শেষ কথা, তাই তো?
রিচার্ড উত্তেজিত। ডঃ গ্রাহাম শান্ত সংযত কণ্ঠে বললেন রিচার্ড, এসময় মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে হয়। তোমাকে আবারও বলছি, পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট তোমার বাবার মৃত্যুর কারণ দেখিয়েছে মারাত্মক বিষজনিত ক্রিয়া। তাই তোমাদের ভালোর জন্য এক্ষেত্রে যা যা করণীয়, সময় থাকতেই আমি করেছি। এছাড়া আর কিছু উপায় নেই।
-হা ঈশ্বর! রিচার্ডের গলা থেকে আক্ষেপ ঝরে পড়ল। এবারে পুলিশি তদন্তের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়াবে কে জানে! এদিকে মঁসিয়ে পোয়ারোও বসে নেই, বরং উনি পুলিশের আগে ছুটছেন। আমার তো এখন মাথা খারাপ হবার উপক্রম, কেনেথ, কিছু করো ভাই।
পুলিশি তদন্তের ব্যাপারটা তোমাকে যথেষ্ট ধাক্কা দিয়েছে বুঝতে পারছি, সহানুভূতিপূর্ণ কণ্ঠে ডঃ গ্রাহাম বললেন, তবে এখন আমার দু-চারটে প্রশ্নের জবাব দাও তো। ঠিক-ঠিক জবাব চাই, মনে রেখো।
-বেশ, বল। কী তোমার জানার আছে? রিচার্ড বুঝি একটু ধাতস্থ হল।
–প্রথম প্রশ্ন, গতরাতে ডিনারে তোমার বাবা কী কী খেয়েছিলেন, মনে আছে?
–গতরাতে আমরা সবাই ডিনার করতে বসেছিলাম, রিচার্ড সামান্য চুপ করে বলল, হা, মনে পড়ছে, সুপ, ভাজা শশাল মাছ, কাটলেট দু-তিনটে, শেষ পাতে আইসক্রিম–ফুট স্যালাড।
–ডিনারে কোনো ড্রিঙ্কস?
–আগাগোড়াই ডিনারে আমরা ভালো ফরাসী মদ্য পান করে থাকি। এটা আমাদের পরিবারের ঐতিহ্য বলতে। গতরাতে বাবা খেয়েছিলেন বাগান্ডি। পিসিমা ও বাবার সেক্রেটারি এডওয়ার্ড রেনরও ওই ড্রিঙ্কস নিয়েছিলেন। ডিনারে বসে হুইস্কির সাথে সোড়া মিশিয়ে খাওয়ার অভ্যাস আর্মিতে থাকাকালীনই হয়ে গিয়েছিল, ওটা আর ছাড়তে পারিনি, ভাই। আর যদুর মনে পড়ে, ডঃ কারোলি হোয়াইট ওয়াইন নিয়েছিলেন, সম্ভবত ওই সস্তার মদই ওর সয়।
–ডঃ কারোলি বলতে তুমি ওই ইটালিয়ান ডাক্তারের কথা বলছ তো! সত্যি আজব লোকটা। ডঃ গ্রাহাম এবার জানতে চাইলেন, এবার বলল রিচার্ড, এই লোকটার সঙ্গে তোমার কতদিনের পরিচয়, কিছু লুকিয়ো না, সব আমার জানা দরকার।
ওদের কথাবার্তা কর্ণকুহরে ধরে রাখার জন্য পোয়ারো চোখ ইশারা করলেন, ক্যাপ্টেন হেস্টিংস ধীর পায়ে ওদের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন।
