-কী বলছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, বারবারা অবাক চোখে পোয়ারোর হাতে ধরা ওষুধের টিউবের দিকে তাকাল–গতরাতেও এটাকে ভরতি দেখেছি, ফাঁকা কেন।
বাঃ, ভারি মজার ব্যাপার। পোয়ারো নিজের মনেই উচ্চারণ করলেন। তারপর জানতে চাইলেন–আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, গতরাতে এই শিশিটায় ওষুধ ছিল। মাদামোয়াজেল, আপনার কি মনে আছে গত রাতে এই ওষুধের শিশিগুলো কোথায় ছিল?
বাক্সটা এই টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখা হয়েছিল। ডঃ কারোলি এক একটা শিশি তুলে ধরে লেবেলে চোখ বুলিয়ে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে ওষুধের নাম ও কার্যকারিতা সম্পর্কে বলছিলেন।
বারবারা নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না, তার চোখ ফোটে জল গড়িয়ে পড়ল।
এমন সময় ঘরে লুসিয়ার প্রবেশ ঘটল, পোয়ারো আর তার বন্ধুকে এঘরে এসময়ে দেখবে, তা ছিল লুসিয়ার ধারণার বাইরে। তাই সে ওদের দেখে হকচকিয়ে গেল।
লুসিয়াকে দেখে বারবারার কান্না উঠে গেল। সে তখন লুসিয়াকে সামলাতে ব্যস্ত, যা বোকা ক্যাবলা মেয়ে, পোয়ারোর মতো ধুরন্ধর গোয়েন্দা যদি একটু চাপ দেয় তাহলে লুসিয়ার পেট থেকে হুড়হুড় করে সব বেরিয়ে আসবে। কোনো অপ্রিয় সত্য কথা বলে ফেললে সর্বনাশ। তাই সে স্নেহ ভরে ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে মৃদু স্বরে বলল–সকাল থেকে যন্ত্রণায় মাথা তুলতে পারছ না, অথচ লাইব্রেরিতে ছুটে এলে, আমি তো যাচ্ছিলাম তোমার কাছে, তর সইল না বুঝি।
-এখন আমি একটু ভালো আছি, বারবারা। পোয়ারোর দিকে তাকাতে তাকাতে বলল–তাছাড়া মঁসিয়ে পোয়ারোর সঙ্গে দরকার ছিল। তাই আসতে হল এখানে।
বেশ তো, পরে বললেই তো হয়, তাই না?
দয়া করো বারবারা, লুসিয়ার কণ্ঠে বিরক্তি, আর তোমাকে আমার জন্য ভাবতে হবে না।
-তাই বুঝি? বেশ, যা মন চায় করো।
লুসিয়ার মন্তব্য শুনে বারবারা খুশি হতে পারেনি, বোঝা গেল তার হাঁটা দেখে। সে চলে যাবার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে এল। পোয়ারো দরজাটা খুলে দিলেন। বারবারা বেরিয়ে যেতে যেতে পেছন ফিরে তাকাল, তারপর চলে গেল।
দরজাটা এঁটে বন্ধ করে পোয়ারো লুসিয়ার দিকে এগিয়ে এলেন।
-মঁসিয়ে পোয়ারো….. লুসিয়া কী যেন বলতে গিয়েও বলতে পারছে না।
লুসিয়ার মনের ভয় ও সঙ্কোচ দূর করার জন্য পোয়ারো বললেন মাদাম, বলুন, আপনি কী বলতে এসেছেন। সঙ্কোচ করবেন না, বলুন।
-হ্যাঁ, এই তো বলছি–লুসিয়ার গলা তখন কাঁপছে উত্তেজনায়। তারপর কেটে বলল–আপনাকে আমিই এ বাড়িতে থেকে যাবার জন্য গত রাতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু আজ সকালে সে ভুল আমার ভেঙে গেছে। ওইভাবে আপনাকে অনুরোধ উপরোধ করা উচিত হয়নি আমার।
-সত্যি বলছেন, মাদাম।
–ষোলো আনা সত্যি। লুসিয়া বলে চলল–আসলে গত রাতের ওই আকস্মিক পরিস্থিতিই এর জন্য দায়ী। বিশ্বাস করুন মঁসিয়ে পোয়ারো, আমি কেমন ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, তাই কী বলতে কী বলে ফেলেছি, আজ আমার ভুল ভেঙেছে। তাই আপনাকে অনুরোধ করছি, যা কিছু বলেছিলাম, তা মনে না রেখে এখান থেকে চলে যান, তাতে সকলের মঙ্গল হবে।
–এতক্ষণে ব্যাপারটা পরিষ্কার হল, কেন আপনি আমার কাছে এসেছেন?
-বুঝতেই যখন পেরেছেন, তাহলে আর দেরি কেন? লুসিয়া ভীত চোখে পোয়ারোর দিকে তাকাল আজই এ বাড়ি ছেড়ে নিজের জায়গায় ফিরে যান।
–আপনি কী করে ভাবলেন, আপনার কথা আমি মেনে নেব। পোয়ারো স্থির চোখে লুসিয়ার দিকে তাকালেন, গলার পর্দা একটু চড়ল–গত রাতে আপনিই আমাকে আপনার শ্বশুর স্যার ক্লড অ্যামরির মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয় বলে জানিয়ে ছিলেন, খেয়াল আছে। নিশ্চয়ই।
-বলছি তো, যা বলেছিলাম ভুলে যান না। লুসিয়ার গলায় অসহায়তার সুর। তখন আমি অত শত ভেবে বলিনি। আর কী বলেছি, না বলেছি, তাও মনে নেই।
–আপনার কথা অনুসারে তাহলে বলতে হয়, আপনার শ্বশুরের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে কোনো গলদ ছিল না। তাই তো?
-হ্যাঁ, তাই-ই। জোর গলায় লুসিয়া বলল, কিন্তু আপনি অমন জ্বলজ্বলে শিকারির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?
-কেন জানেন, মাদাম? পোয়ারো একইভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন–আমরা, অর্থাৎ যারা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করেছেন বা করছেন, তাঁরা নিজেদের শিকারি কুকুরের সঙ্গে তুলনা করে থাকে। শিকারি কুকুরকে সহজে শিকারের পেছনে লেলিয়ে দেওয়া যায় না। তবে একবার যদি শিকার অর্থাৎ অপরাধীর গন্ধ পায় তাহলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বা ঘায়েল করে তবেই শান্তি। আমিও ওই শিকারি কুকুরের থেকে কম যাই না, জানবেন।
–এসব আমাকে বলে লাভ নেই। এসব জানতে বা বুঝতে চাই না। আমি একটাই কথা জানি, আপনাকে এ বাড়ি থেকে বিদায় করতে হবে। এখানে থেকে আপনি আমার কী সাংঘাতিক ক্ষতি করছেন, তা জানা নেই আপনার, মঁসিয়ে পোয়ারো।
ক্ষতি? সাংঘাতিক ক্ষতি? কি ভাবে?
-হ্যাঁ, করছেন? লুসিয়া নিজেকে সংযত করল। বলল–কেবল, আমার নয়, এবাড়ির সকলের ক্ষতি করে চলেছেন। আপনাকে বুঝিয়ে বলার আর কিছু নেই। তবে জানবেন, যা বলছি, তার সবটাই সত্যি। গতরাতে আপনাকে দেখে আমার কেমন ভরসা জেগেছিল, আপনার প্রতি আস্থা রাখতে শুরু করেছিলাম। সে কথা মাথায় রেখেই বলছি, এসব অনুসন্ধানের কাজ বন্ধ করে ফিরে যান। এ বাড়ি ত্যাগ করুন।
লুসিয়া নিজেকে সামলাতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
