পোয়ারো চোখ বুজে বলে চললেন–এতদূর পর্যন্ত ঠিক আছে। এরপরে প্রশ্ন হল, চুরি করা জিনিসটা কোথায় গেল? অনুমান করা যেতে পারে, স্যার ক্লডের নির্দেশ মেনে অন্ধকার ঘরের মধ্যে তার সামনের টেবিলে ওটাকে রেখে দেওয়া, দ্বিতীয়ত ফর্মুলা চোর আঁধারের সুযোগ নিয়ে অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারে। তবে প্রথম পথে চোর যায়নি, তা আমরা নিশ্চিত। রইল খোলা দ্বিতীয় পথ। অতএব আমি জোর গলায় বলতে পারি, ওই ফর্মুলা এই ঘরের কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
–পোয়ারো, তোমার কথাকেই আমি সমর্থন করছি। তাহলে আর দেরি কেন, উত্তেজিত হেস্টিংস চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, এস, কাজে লেগে পড়ি।
-সত্যিই যদি ইচ্ছে হয়, তাহলে খোঁজার কাজে হাত লাগাও। ওটা খুঁজে বের করতে তোমায় যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হবে, সময়ও লাগবে। কিন্তু আমি একজনকে জানি, পোয়ারোর ঠোঁটে রহস্যপূর্ণ হাসি, যে তোমার চেয়ে কম সময়ে ও কম পরিশ্রমে চট করে দিতে পারে।
–কে সে? হেস্টিংস উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলেন।
–যে চুরি করে ফর্মুলাটা লুকিয়ে রেখেছে, সে। চুরি করা ও লুকিয়ে রাখার মধ্যে একজনেরই হাত আছে। গম্ভীর মুখে পোয়ারো তার গোঁফ জোড়াকে আদর করতে লাগলেন, বোঝা গেল, তিনি এখন তার পুরনো মেজাজে ফিরে এসেছেন।
এর পরের কথা……
–হ্যাঁ, এর পরের কথা হল, চোরবাবাজী আজ-কালের মধ্যেই জিনিসটা এ ঘর থেকে সরিয়ে নেবার চেষ্টা করবে। তাই আমাদের সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। এই ঘরের ওপর নজরদারি চালাতে হবে আমাদের যে কোনো একজনকে।
এই সময় লাইব্রেরির দরজা ভেতর থেকে খুলে গেল, অবশ্য একটুও শব্দ না করে। পোয়ারো সচকিত হলেন। পোয়ারোর ইঙ্গিতে ক্যাপ্টেন গ্রামোফোনের আড়ালে চলে গেলেন।
ঘরে যে ঢুকল, তাকে দেখার জন্য পোয়ারো বা তার সঙ্গী প্রস্তুত ছিলেন না। তারা নজর রাখলেন। দেখলেন, মিস বারবারা অ্যামরি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে এল বইয়ের তাকের কাছে। চেয়ারে উঠে দাঁড়াল, এবার হাত বাড়িয়ে টিনের কালো বাক্সটা নামানোর চেষ্টা করল, যাতে ওষুধপত্রগুলি আছে।
সময় হয়েছে বুঝে পোয়ারো ফাঁচ করে হেঁচে উঠলেন। বারবারা চমকে উঠল। তার হাত থেকে সশব্দে টিনের বাক্সটা মেঝেতে এসে পড়ল।
বারবারা ঘাবড়ে গেল–ও আপনি, মঁসিয়ে পোয়ারো নিজেকে সামলে নিল, ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল, আপনাকে এখানে দেখতে পাব, আশা করিনি।
ক্যাপ্টেন হেস্টিংস এবার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন। হাসতে হাসতে মেঝে থেকে টিনের বাক্সটা তুললেন।
–কিছু মনে করবেন না, মাদমোয়াজেল, পোয়ারো বললেন, ভারী টিনের বাক্সের ভার আপনি সহ্য করতে পারেন নি, তাই হাত ফসকে পড়ে গেছে। বাক্সটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললেন, আরে, এটার তো বেশ ওজন, কী রেখেছেন এতে? পাখির বাসা, নাকি সমুদ্র থেকে কুড়িয়ে আনা ঝিনুকের খোলা?
-না না, ওসব কিছু নয়, সামান্য কিছু ওষুধপত্র আছে মাত্র। বারবারা জবাব দিল।
–কিন্তু মাদাম, আপনার স্বাস্থ্য তো বেশ ভালোই দেখছি, কেমন উজ্জ্বল, তাহলে এইসব ছাইপাঁশ বাক্সবন্দী করে রেখেছেন কেন?
-না না, আমার জন্য নয়। বারবারা বলে চলল–এগুলো লাগে রিচার্ডের বউ লুসিয়ার। শুনেছেন তো, ওর একটা অসুখ আছে, যখন তখন জ্ঞান হারায়, একবার মাথা ধরলে আর রক্ষে নেই। ওর কথা ভেবেই এসব ওষুধ। বেচারী লুসিয়া, আজ সকালেও মাথা যন্ত্রণায় কষ্ট পেয়েছে।
-ও, তাই বুঝি আপনি ওর জন্য মাথা যন্ত্রণার ওষুধ নিতে এসেছেন?
–হ্যাঁ, বারবারা বলল। অ্যাসপিরিনের বড়ি আমার কাছে দুটো ছিল, ও খেল, তবুও মাথা যন্ত্রণা কমেনি, বুঝলাম, আরও কড়া ওষুধ চাই। তাই গোটা বাক্সটাই নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আপনারা যে এখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকবেন, তা আগে বুঝতে পারিনি।
টিনের বাক্সের ওপর হাত বুলোতে বুলোতে পোয়ারো জানতে চাইলেন তার মানে আপনার ওষুধের বাক্স নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক? আমি তো বুঝতে পারছি না।
-কী বলি আপনাকে? সামান্য শরীর খারাপ হলেই হল, ওষুধ খুঁজতে চলে আসে এই ঘরে, সব্বাই, কেউ বাদ নেই। এমনকি পিসিমা বা ওই রিচার্ড। ওরা বাক্সের ওষুধের শিশিগুলো ঘাঁটা ঘাঁটি করে, লন্ডভন্ড করে যাচ্ছেতাই করে রাখে।
মাদাম, চোখের ইঙ্গিতে বাক্সটা দেখিয়ে পোয়ারো বললেন, বাক্সটা দেখেছেন, একটুও ধুলো ময়লা নেই, তাই কিনা? আপনাদের বাড়ির কাজের লোকদের রোজ কত খাটতে হয় বলুন তো। যখন তখন চেয়ার টেনে উঠে দাঁড়াতে হয়, অত উঁচুতে বাক্স, ধুলো ময়লা পরিষ্কার করা কম ঝামেলা বলুন।
-মঁসিয়ে পোয়ারো, সত্যিই তাই। বারবারা খুশি মনে বলল–তাইতো গতরাতে এটা পরিষ্কার দেখেছি।
–গত রাতে এই ঢাউস বাক্সটা নামিয়ে ছিলেন নাকি?
পোয়ারোর প্রশ্নের উত্তরে বারবারা বলল–হ্যাঁ, ডিনারের পরে। হাসপাতালের যত পুরোনো ওষুধে এটা বোঝাই।
–দেখি, দেখি, কী কী ওষুধ আছে। কথা শেষ করে পোয়ারো বাক্সটা সামান্য টেনে নিয়ে ঢাকনা খুলে ফেললেন, একটা একটা করে কতগুলো শিশি তুলে ধরলেন, শিশির গায়ে কাগজে সাঁটা ওষুধের নাম দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ, বিস্মিত হলেন–আরে এসব কী দেখছি–স্ত্রিকনিন অ্যাট্রাপিন…… আর এটা? ওষুধের টিউবটা সামনে তুলে নিয়ে আঁতকে উঠলেন, সর্বনাশ, এ তো যেমন তেমন ওষুধ নয়–হিস্কোসিন হাইড্রোক্সোমাইট, অবশ্য সামান্য ওষুধ, রয়েছে টিউবে। বাঃ, মানুষ খুন করার সরঞ্জাম দেখছি থরে থরে সাজানো।
