–আমার সঙ্গে মজা করছ? হেস্টিংসয়ের গলায় মেজাজি সুর, আমি একশো শতাংশ নিশ্চিত যে, তুমিও খুব ভালভাবে বুঝতে পারছ, স্যার ক্লডের মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়। এমনকি ওঁর ছেলে রিচার্ডের কথাই ধরো না। যখন ডঃ গ্রাহাম মৃতদেহ পরীক্ষা করে বললেন, ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়, তখন রিচার্ডের পিলে চমকে উঠেছিল। সেও ষোলো আনা নিশ্চিত, তার বাপ হার্ট ফেল করেনি, অতএব পোস্ট মর্টেম করতে বাধা দেয়নি।
-আমি স্বীকার করি, চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল পোয়ারোর বুক থেকে। দেখ, গ্রাহাম এখন এসেছেন ওই পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট জানাতে।
পোয়ারো এখানেই কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। ধীর পায়ে ফায়ার প্লেসের কাছে চলে এলেন। বড় ফুলদানিটা গড়িয়ে পড়েছে, মোম, নানা মাপের কাগজের টুকরো ম্যান্টেলপিসের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, ফায়ারপ্লেসের কাঠে আগুন ধরানোর জন্যই ওগুলো রাখা।
পোয়ারো বস্তুগুলো এক জায়গায় গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করলেন। সেদিকে নজর রেখে ক্যাপ্টেন হেস্টিংস বললেন, সত্যিই পোয়ারো, তোমার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা প্রশংসার দাবি রাখে। কেমন সুন্দর সব গুছিয়ে রাখছ বল তো।
-চুপ, চুপ, পোয়ারো মুখে আঙুল তুলে বললেন, সব কিছুর ঊর্ধে সদৃশতার অবস্থান। এমনকি মগজের প্রতি কোষও, পরিচ্ছন্ন আর শৃঙ্খলা বজায় না থাকলে সেখানে সাদৃশতার প্রকাশ ঘটবে কি করে? নিজের টাক মাথায় আলতো টোকা দিয়ে পোয়ারো বললেন।
তোমার চিন্তা যে কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তা আমার চেয়ে ভাল কেউ জানে না, ক্যাপ্টেন স্মিত হেসে জানতে চাইলেন, তোমার সাথে আমার নতুন পরিচয় হয়নি। অতএব ঝেড়ে কাশো, আসল ঘটনাটা আমাকে স্পষ্ট করে বল।
–আমি শোনাব। তা তোমার মগজের কাজ কি, বন্ধু! নিজের মাথাটা ইশারায় দেখিয়ে পোয়ারো বললেন, এই যে ঘাড়ের ওপর এটা, ঈশ্বরের দান, বয়ে বেড়াচ্ছি সকলে, এটার দাম কি?
কথা থামিয়ে দিলেন পোয়ারো, চোখ দুটো কুঁচকে ছোট হল, যেন ঝিমধরা বেড়াল। প্রসঙ্গ পালটে পোয়ারো বললেন–ডঃ গ্রাহাম যে কোন সময় এঘরে চলে আসতে পারেন, রিচার্ড বাদ যাবে না। বরং এস, এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে নিজেদের একবার ঝালিয়ে নিই, যা যা অস্বাভাবিক ঠেকছে সে সম্পর্কে আলোচনা আর কি!
–গত রাতে এ বাড়িতে আমরা আসার আগে বাড়ির সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল, হেস্টিংস বলে চললেন, স্যার ক্লড বসেছিলেন ওখানে, ইঙ্গিতে আর্মচেয়ারটি দেখিয়ে দিলেন, তখনও মারা যাননি তিনি। নিঃসীম অন্ধকারে এঘর তখন ঢেকে আছে, যেভাবেই হোক একটা চেয়ার উলটে গেল, ওটাতে স্যার ক্লডের সেক্রেটারি এডওয়ার্ড রেনর বসেছিল, ওই চেয়ারের নীচে থেকে একটা চাবি তুমি পেয়েছিলে, যার সাহায্যে স্যার ক্লডের সিন্দুকের তালা সহজে খোলা সম্ভব হয়। ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে, ওই ইটালিয়ান ডাক্তার, কারোলিই হল এই ঘটনার মূল পাণ্ডা। ওকে আমি সবচেয়ে বেশি সন্দেহ করি।
–ডঃ কারোলি, তাই না? পোয়ারোর আনমনে বলে উঠলেন, ওই লোকটাকে আমারও রহস্যজনক বলে মনে হয়।
–তা নয়, তো কি? হেস্টিংস জোরালো কণ্ঠস্বরে বলতে লাগলেন–লোকটা এতদূরে গ্রামের ভেতরে এসে ঢুকেছে। এটা এক বিখ্যাত বিজ্ঞানীর বাড়ি, ওর ডাক্তারির জায়গা নয়। এখানে ওর কি কাজ থাকতে পারে বলে তোমার মনে হয়, পোয়ারো? স্যার ক্লডের ওই বিধ্বংসী ফর্মুলা হাতিয়ে নেবার জন্য অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্রই চেষ্টা করছে, ওরা আমাদের কোন দেশের গুপ্তচর হয়ে এখানে এসে সেঁধিয়েছে। মূল্যবান ফর্মুলা হাতিয়ে নেওয়াই ওর কাজ, বুঝেছ?
-বুঝলাম, পোয়ারো সামান্য হাসলেন, বাঃ অনেকদিন পর এমন একটা নিখুঁত সিনেমার গল্প শুনলাম। আমি কচ্চিৎ কদাচিত সিনেমা দেখতে যাই, জান তো তুমি।
–স্যার ক্লডকে সত্যিই বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে, এটা একবার প্রমাণ করতে পারলে, ডঃ কারোলি তাহলে থাকবেন সন্দেহ ভাজন তালিকায় সবার ওপরে। তোমার নিশ্চয়ই সেই প্রাচীন কাহিনীর কথা মনে আছে বিষপাথর বসানো আংটির গল্প।
বিষক্রিয়াজনিত হত্যার ঘটনা ইটালির জনজীবনে ভুরি ভুরি ঘটেছে। কিন্তু আমার মনে আশঙ্কা কি জান, ধরা পড়ার আগে চোর বামাল সমেত উড়ে না যায়।
বন্ধু, এমন আশঙ্কা কর না। হেস্টিংস জোর দিয়ে বলল কখনো পালিয়ে যাবার সাহস ডঃ কারোলি কখনো দেখাবেন না।
–এত জোর দিয়ে বলার কারণ? ভুরু কুঁচকে পোয়ারো জানতে চাইলেন।
বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। পোয়ারোর জবাবে হেস্টিংস বললেন–কারণ, আমিও সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিত নই। তবে জেনো, ফর্মুলা চুরির ব্যাপারটা আমার মগজকেও তোলপাড় করে তুলেছে।
–আচ্ছা হেস্টিংস, ফর্মুলাটা কোথায় এখন রাখা আছে বলে তোমার মনে হয়?
–বলতে পারছি না।
–ভায়া, মাথাটাকে কাজে লাগাল। মৃদু হেসে পোয়ারো জবাব দিলেন–ওটা একটা জায়গাতেই আছে।
–কোথায়?
–এই ঘর, পোয়ারো বললেন, এ ব্যাপারে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত। এ ঘরের বাইরে এখনো ওটা যায় নি।
-কি বলছ হে?
–হ্যাঁ, ঠিক তাই। পোয়ারোর মুখ কঠিন হল। আমরা যা জেনেছি বা দেখেছি, সবটা পরপর সাজালে কেমন হয়? ট্রেডওয়েলের কাছ থেকে জানা গেছে, ফর্মুলা চুরি হওয়ার আশঙ্কায় স্যার ক্লড অ্যামরি নানারকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এই ঘরের ভেতরটা সুরক্ষিত করার জন্য তিনি নিজে বিশেষ ধরনের তালা আবিষ্কার করেছিলেন, যাতে অন্য কেউ সহজভাবে ওই তালা না খুলতে পারে। সেইমতো ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দুটো বিশেষভাবে তালা এঁটে দিয়েছিলেন, যার চাবি পাওয়া গেছে ওনার চাবির গোছায়। আমরা এখানে পৌঁছনোর আগেই চোর কম্মটি সেরে ফেলেছিল, আমার ধারণা। স্যার ক্লডের মনে সন্দেহ হওয়াতে সিন্দুক খোলেন এবং দেখেন ফর্মুলাটি হাওয়া হয়ে গেছে। তিনি নিশ্চিত বুঝতে পেরেছিলেন যে, ফর্মুলা-চোর এই ঘরেই পরিবারের সকলের মধ্যে মিশে আছে। কথাটা তিনি গোপন না রেখে ফাঁস করে দিয়েছিলেন।
