পোয়ারোকে এখন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আমাকে তিনি তার রুমাল খুঁজে আনতে পাঠালেন কেন? তবে কি তিনি আমাকে রুমাল খুঁজে আনার অছিলায় দূরে সরিয়ে রাখলেন? আর আমার অনুপস্থিতিতে তিনি তার প্রয়োজনীয় কাজটুকু সেরে নিলেন?
এও যেন সেই অপারেশনের ব্যাপার। বড় বড় সার্জেনরা তাদের কাজের সুবিধার জন্য চরম মুহূর্তে নবাগত নার্সদের মামুলি কাজের অছিলায় অপারেশন থিয়েটার থেকে সরিয়ে দেয়, পাছে তারা ভুল করে বসে, কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে, এখনও পর্যন্ত আমার কাজে কোন ভুল হয়নি। অবশ্য আমি মনে করি না, মিঃ ক্যারির সঙ্গে তার কথা আমাকে শুনতে দিতে তিনি নারাজ। মনে হয় আমার অনুপস্থিতিতে মিঃ ক্যারির সঙ্গে বেশ খোলাখুলিভাবে তার আলোচনা করতে সুবিধা হবে বলেই তিনি আমাকে বুদ্ধি করে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
কারোর ব্যক্তিগত ব্যাপারে মাথা ঘামানো আমার স্বভাব নয়। তবে এ কথাও ঠিক যে, মিঃ পোয়ারো একান্তই যদি তার ব্যক্তিগত কোন ব্যাপারে মিঃ ক্যারির সঙ্গে আলাপ করে থাকতেন তাহলে আমি অমন আগ্রহ নিয়ে তাদের কথায় কান রাখতাম না। একটা সুবিধাজনক স্থানে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। যাইহোক, অনুভূতিশূন্য রুগীর (অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগে) কাজ থেকে অনেক কিছু শুনতে পাবেন। তবে রুগী চাইবে না, আপনি শুনুন সব কথা শুনলেও সে কিছু টের পাবে না। এক্ষেত্রে মিঃ ক্যারিকে আমি রুগী হিসাবে ধরে নিয়েছি।
বিরাট আবর্জনা স্তূপের পিছনে আমি দাঁড়িয়েছিলাম বলে ওরা আমাকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। লুকিয়ে এভাবে আড়ি পেতে অপরের কথা শোনা যদি নিয়ম-বহির্ভূত হয়, সে কথা মানতে আমি রাজী নই। কোন কেসের ভারপ্রাপ্ত নার্সের কাছে কিছুই গোপন করা উচিত নয়। অবশ্য এক্ষেত্রে ডাক্তারের কর্তব্য হল কি করা উচিত, সে কথা বলে দেওয়া।
পোয়ারোর মনে কি আছে, তখনও আমি জানি না। তবে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই আমার প্রথমে নজর পড়ল তার চোখের উপরে। তার সন্ধানী চোখ দুটি যেন কি খুঁজছিল তখন।
ডঃ লিডনার যে তার স্ত্রীর প্রতি অনুগত ছিলেন, সেটা এখানকার কেউই পছন্দ করতেন না, তিনি তখন বলছিলেন–তাই এর থেকে অনুমান করা যায়, একজনের সম্বন্ধে জানতে গেলে তার বন্ধুদের চেয়ে শত্রুর কাছ থেকে বেশি তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, তাদের সতোর থেকেই দোষ-ত্রুটির বেশি গুরুত্বপূর্ণ? প্রশ্ন করলেন মিঃ ক্যারি। তাঁর কথায় বিদ্রুপের ছোঁয়া ছিল।
নিঃসন্দেহে তাই বিশেষ করে খুন সংক্রান্ত কেস হলে তো কোন কথাই নেই।
আমার আশঙ্কা, এ ব্যাপারে আমি বোধহয় আপনাকে কোন সাহায্য করতে পারব না, মিঃ ক্যারি বলেন। সত্যি কথা বলতে কি মিসেস লিডনারের সঙ্গে আমার শত্রুতা থাকা দূরে থাক কোন ব্যাপারে তার সাথে আমার কথা কাটাকাটি পর্যন্ত হয়নি। যদিও আমরা কেউ কারোর শত্রু ছিলাম না, তবে ঠিক বন্ধু যে ছিলাম একথাও আবার বলা যায় না। মিসেস লিডনারের স্বামীর পুরানো বন্ধু আমি, সম্ভবত এই সত্যটা স্বীকার করে নিতে তার বোধহয় ঘোরতর আপত্তি ছিল। আমরা স্বীকার করছি, সবাইকে আকর্ষণ করার মতো রূপ, মাধুর্য সবই ছিল, তবু বলব–ডঃ লিডনারের উপরে তাঁর জোর খাটানো, তাকে তার প্রতি একান্ত অনুগত করে তোলার বিরুদ্ধে আমাদের বিরক্তি, ক্ষোভ যথেষ্ট। যার ফলে তার সঙ্গে মিশতে গিয়ে আমরা সবাই নম্রতা, ভদ্রতার একটা মুখোস পরে থাকতাম, কোনদিন তার একান্ত কাছে যাইনি, তাঁর সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠিনি আমরা।
তাহলে আপনার কথামত ধরে নেওয়া যায় যে, মিসেস লিডনারকে আপনি সত্যি-সত্যি পছন্দ করতেন না।
মিঃ ক্যারি নিজের কথায় নিজেই হেসে উঠলেন। পোয়ারোর সজাগ দৃষ্টি তার উপরে নিবদ্ধ।
মিস জনসনের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। ডঃ লিডনারের স্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন মন্তব্য করতে তিনি নারাজ। তবে তার কথাবার্তা শুনে মনে হয় মিসেস লিডনারকে তিনি খুব শ্রদ্ধা করতেন। মিসেস মারকাডোর অভিমতও ঠিক তাই। তাঁর মতে মিসেস লিডনারের মতো অমন চমৎকার মহিলা আর কেউ হতে পারে না। তাই না?
হ্যাঁ, না কোন উত্তর দিলেন না মিঃ ক্যারি। পোয়ারো মিনিট দুই তার মুখের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলেন এবার–কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করি না বলেই আপনার কাছে ছুটে এলাম। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি আপনার কথা শুনেও আমার মন ভরল না। অর্থাৎ আপনার কথাও আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না মিঃ ক্যারি।
ক্যারির চোয়াল দুটো কেমন কঠিন হয়ে উঠল। বেশ বুঝতে পারছিলাম একটু একটু করে তিনি রেগে যাচ্ছেন, তাঁর কথায় সেই রাগটা প্রকাশ পেল।
মিঃ পোয়ারো, একটা কথা আপনাকে বলে রাখি আপনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন কি না, তাতে আমার কিছু এসে যায় না। যা সত্যি তাই বললাম, এখন সেটা গ্রহণ করা না করা আপনার ব্যাপার। এর বেশি কিছু আমি বলতে চাই না।
পোয়ারোর মুখ দেখে মনে হল, ক্যারির কথায় একটু ক্ষুণ্ণ হলেন বটে, কিন্তু রাগের কোন লক্ষণ প্রকাশ করলেন না তিনি। কেমন শান্ত এবং সংযত স্বরে তিনি বললেন–এ আমার অপরাধ, হয়তো বিশ্বাস করতে পারি না বলে। কিন্তু আমিও মানুষ। মনে রাখবেন মিঃ ক্যারি–বুঝতে পারবেন, এখন এখানে নানান গুজবের গল্প আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। তার কিছু কাহিনী আছে যা শুনে সত্যি সত্যি উপলব্ধি করতে হয়। উপলব্ধি করার মতো সেই সব কাহিনীর কথা আমি এখানে বলতে চাইছি, বুঝলেন?
