পোয়ারোকে অনুসরণ করছিলাম হঠাৎ তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন, আচ্ছা মিঃ মারকাডো ন্যাটা নাকি আর পাঁচজনের মতো ডান হাতেই সব কাজ করেন?
এ যেন এক অদ্ভুত ধরনের প্রশ্ন। বাজে কথা বলার লোক নন পোয়ারো। তাই অনেক ভাবনা-চিন্তার পর নিশ্চিন্ত হয়ে বললাম, ডান হাতই ব্যবহার করে থাকেন উনি।
মিঃ পোয়ারো প্রত্নতত্ত্বের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখালেন, কিন্তু আমি হলপ করে বলতে পারি, বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই তার এ ব্যাপারে। তবে মিঃ মারকাডো সঙ্গে সঙ্গে তার প্রশ্নের জবাব দিয়ে যেতে থাকলেন।
তারপর নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ে মাটির একটা পাত্র থেকে চকমকি পাথরের ছুড়িটা তুলে নিতে গেলে মিঃ মারকাডো হঠাৎ শূন্যে লাফ দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন। আমার দিকে করুণ চোখে তাকালেন তিনি। আর পোয়ারো অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলেন তার দিকে। বাঁ হাত দিয়ে তিনি তার হাতটা আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন।
আগুনে পোড়া লাল ছুঁচের মত কি যেন বিধলো আমার হাতে।
সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হলেন পোয়ারো।
আসুন নার্স লিথেরান, পোয়ারো ব্যস্ত হয়ে বললেন, দেখা যাক ওঁর কি হল?
আমি এগিয়ে গেলাম।
পোয়ারো তার জামার হাতাটা গুটিয়ে কাঁধের উপরে তুলে ধরলেন ক্ষত স্থানটা নিরীক্ষণ করার জন্য।
ওই যে ওখানে–মিঃ মারকাডো অপর হাত দিয়ে নিজের ক্ষতস্থান দেখান।
কাঁধ থেকে প্রায় ইঞ্চি তিনেক নিচে এক জায়গায় রক্তের দাগ লক্ষ্য করা গেল।
আশ্চর্য! তাঁর হাতের সেই রক্তের দাগটার উপরে স্থির দৃষ্টি রেখে অস্ফুটে বললেন–কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না, তবে মনে হয় পিঁপড়ে কেটে থাকবে।
একটু আইডিন লাগিয়ে দিলে ভাল হয়, আমি বললাম।
আইডিন পেন্সিল আমার সঙ্গেই ছিল। মিঃ মারকাভোর ক্ষতস্থানে আইডিন লাগাতে গিয়ে আমি একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে বুঝিবা একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। তার কুনুই থেকে কব্জি পর্যন্ত হাতের উপরে ছোট ছোট ফুটোর দাগ। আমি বেশ ভালো করেই জানি, ওইগুলো কিসের দাগ হতে পারে। অধস্থকে প্রদেয় ইনজেকসনের ছুঁচের দাগ!
মিঃ মারকাডো জামার হাতটা নিচে নামিয়ে দিতে গিয়ে একটু আগের ঘটনাটা পুনরায় ব্যাখ্যা করলেন। মিঃ পোয়ারো তার কথাগুলো শুনলেন বটে, কিন্তু এর মধ্যে লিডনারদের প্রসঙ্গ টানতে কোন চেষ্টাই করলেন না তিনি। সত্যি কথা বলতে কি, কোন প্রশ্নই তিনি করলেন না মিঃ মারকাডোকে।
আপাততঃ মিঃ মারকাডোকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে আমরা আবার উপরে উঠে এলাম।
কাজটা খুব নির্ঝঞ্ঝাটে সারা গেল, তাই না?
কলারের ভাজ থেকে একটা জিনিস টেনে বার করে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করছিলেন পোয়ারো। তার হাতে রিপু করার সুঁচ জাতীয় জিনিস, মোমের আড়ালে ঢাকা, একটা পিনের মতো দেখাচ্ছিল।
মিঃ পোয়ারো? আমি চিৎকার করে উঠলাম, ওটা আপনি সঙ্গে নিয়ে এসেছেন?
হ্যাঁ, তাই তো বললাম, কাজটা বেশ নিঝঞ্ঝাটে সারা গেল। কেন আপনি লক্ষ্য করেননি?
হ্যা, আমি অকপটে স্বীকার করলাম, আমার নজর এড়িয়ে গেছে এক্ষেত্রে। শুধু আমারই বা কেন বলছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি মিঃ মারকাভোর। মনে হয়, কাজটা খুব তড়িৎগতিতে
কিন্তু কেন মঁসিয়ে পোয়ারো?
পাল্টা প্রশ্ন করলেন তিনি আমাকে, আপনি কোন কিছু লক্ষ্য করেছেন মিস্টার?
মাথাটা আমি নাড়লাম ধীরে ধীরে।
অধঃস্থকে প্রদেয় ইনজেকসন-এর সঁচের দাগ?
হ্যাঁ, ঠিক তাই, পোয়ারো আমাকে সমর্থন করে বললেন, তাহলে এর থেকে বোঝ যাচ্ছে, মিঃ মারকাভোর সম্পর্কে কিছু আমরা জানতে পেরেছি অন্তত। আমার সন্দেহটা যে ঠিক তা অনুমান করতে পারছি না। তবে জানাটা দরকার।
হঠাৎ পোয়ারো পকেটে হাত ঢোকালেন।
এই যা! রুমালটা আমি ফেলে এসেছি সেখানে। সেই রুমাল দিয়ে আপনি ঢেকে নিন পিনটা।
ঠিক এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, এই কেসের ব্যাপারে মিঃ পোয়ারো এবং আমি যথাক্রমে ডাক্তার এবং নার্স হিসাবে নিযুক্ত হয়েছি। অন্তত এক্ষেত্রে মানে, এই অপারেশনের ক্ষেত্রে মিঃ পোয়ারো একজন বিরাট শল্য চিকিৎসকের ভূমিকা নিলেন যেন। সমস্ত ব্যাপারটা আমি বেশ কৌতুকের সঙ্গে উপভোগ করছিলাম। আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম রুমালটা আমি খুঁজে নিয়ে আসছি।
নার্সের ট্রেনিং লাভের পর আমি আমার কর্ম জীবনের রুগীদের অপারেশনের সময় সার্জেনদের সাহায্য করেছি প্রয়োজনীয় মুহূর্তে দরকারী জিনিসগুলোর যোগান দিয়ে কখনও ফরসেপ, কখনও বা ছুরি-কাঁচি। আর এই মুহূর্তে ঠিক সেই রকম একটা পরিবেশের কথা আমার মনে পড়ে গেল। সেই রকম একজন সার্জেনের কথা আমাকে মনে করিয়ে দিলেন পোয়ারো যেন। ঠিক সেই রকম ছোট বেঁটে-খাটো নোক, দেখতে কুৎসিত, বাঁদরের মতো মুখের অবয়ব, কিন্তু সার্জেন হিসাবে অপূর্ব। কখন কি ভাবে কাজে এগুতে হয়, সেটা তিনি বেশ ভাল করেই জানেন। বহু সার্জেনের সান্নিধ্যে আমি এসেছি, এবং তাদের মধ্যে প্রভেদটা যে কোথায়, সেটা আমার বেশ ভাল করেই জানা আছে। কে শ্রেষ্ঠ সার্জেন আমি তাদের কাজ দেখলেই বুঝতে পারি। সেই রকম পোয়ারোর মধ্যে তীক্ষ্ণ মেধার পরিচয় পেয়েই বোধহয় তার উপরে আস্থা আমার আরও বেড়ে গেল।
রুমাল হাতে ফিরে এসে প্রথমে আমি তাকে দেখতে পাই না। তবে শেষপর্যন্ত তাকে দেখতে পেলাম, তখন তিনি কথা বলছিলেন মিঃ ক্যারির সঙ্গে। আর মিঃ ক্যারির লোক তার কাছে দাঁড়িয়েছিল, তাঁর হাতে সেই বিরাট রড, যার উপরে মিটারের দাগ দেওয়া। তবে সেই সময় তিনি সেই লোকটাকে কি যেন বললেন–পর মুহূর্তেই চলে গেল সে। মনে হয়, আপাততঃ সেই রডটার কাজ তাঁর শেষ হয়ে গেছে।
