আমি স্পষ্ট দেখলাম, পোয়ারোর কথায় হয়তো সামান্য একটু বিচলিত হলেন মিঃ ক্যারি, তবে তাতে তার মুখটা আগের চেয়ে আরও সুন্দর হয়ে উঠল। আমি বেশ বুঝতে পারছি, এই কারণেই মেয়েরা বোধহয় তার প্রেমে পড়ে যায়।
তা সেসব কাহিনী কিসের শুনতে পারি?
মিঃ ক্যারির দিকে আড়চোখে তাকালেন পোয়ারো–আপনি হয়তো অনুমান করতে পারেন, সেই চিরন্তন কাহিনী মিসেস লিডনার এবং আপনাকে কেন্দ্র করে সেই সব কাহিনী।
ছিঃ ছিঃ মানুষের মন কত হীন! বিরক্তির ছোঁয়া মিঃ ক্যারির কথায় প্রকাশ পায়। আর আপনি সেই সব কাহিনী বিশ্বাস করেন?
আমি সত্যের প্রকাশ দেখতে চাই মিঃ ক্যারি! আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে কথাটা বললেন পোয়ারো।
আমার সন্দেহ হয়, প্রকৃত সত্য ঘটনা আপনি শুনেছেন কি না?
বেশ তো, আপনি শোনান না সেই সত্য ঘটনার কথা। পাল্টা প্রশ্ন করলেন পোয়ারো।
তাহলে সত্যি কথাটা শুনবেন? মিঃ ক্যারির কথায় ঘৃণা, বিরক্তি ঝরে পড়ে, লুসি লিডনারকে আমি ঘৃণা করতাম। আমি তাকে ঘৃণার চোখে দেখতাম, এখনও দেখি–বুঝলেন?
.
২২.
এমোট ল্যাভিগনি এবং নতুন আবিষ্কার
দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে ক্যারিকে চলে যেতে দেখা যায়। রাগে গজরাচ্ছিল সে তখন। তার দিকে তাকিয়ে পোয়ারো ফিসফিসিয়ে বললেন–হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি।
তারপর মাথা না ঘুরিয়ে তাকে এবার একটু জোরে বলতে শোনা গেল, এখানে মিনিট খানিকের জন্য এসো না নার্স। আমার রুমালটা আপনি পেয়েছেন? অজস্র ধন্যবাদ।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম এই ভেবে আমি এতক্ষণ তাঁদের আলোচনার কথা শুনছিলাম, সে ব্যাপারে কোন উল্লেখই তিনি করলেন না। যাক একটা জবাবদিহির হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেল।
মিঃ পোয়ারো, মিসেস লিডনারকে উনি ঘৃণা করতেন, এ কথাটা সত্যি কী আপনার বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়? থাকতে না পেরে আমি জিজ্ঞেস করে ফেললাম শেষপর্যন্ত।
আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন পোয়ারো, কৌতূহলী চোখ। হ্যা। ঠোঁটটা তার নড়ে উঠল, আমার মনে হয়, সত্যি-সত্যি তিনি তাকে ঘৃণা করতেন।
তারপর তিনি দ্রুত পায়ে উপরে উঠে এসে হাঁটতে শুরু করে দিলেন কাছেই মাটির ঢিবিটার দিকে। দু’একজন আরব দেশীয় লোক ছাড়া অন্য কারোর মুখ আমাদের চোখে পড়ল না। অবশেষে ঢিবির সামনে গিয়ে উপস্থিত হতেই চোখে পড়ল ডেভিড এমোটকে। মুখ তার নিচের দিকে। চোখের সামনে একটা কঙ্কাল ঝাড়পোঁছ করেছিলেন, সবেমাত্র সেই কঙ্কালটা মাটির নিচ থেকে তুলে আনা হয়েছিল।
আমাদের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই একটা মিষ্টি হাসি তার ঠোঁটে ফুটে উঠতে দেখা গেল।
কি ব্যাপার, জায়গাটা ঘুরে দেখতে চান? জানতে চাইলেন এমোট, এক মিনিট, হাতের কাজটা সেরে নিয়েই আপনাদের সঙ্গে কথা বলব, কেমন?
এমোট আবার তার কাজে মন দিলেন। ছুরি দিয়ে সেই কঙ্কালটার উপর থেকে মাটি চেঁছে পরিষ্কার করলেন খুব যত্ন নিয়ে, মাঝে মাঝে কঙ্কালটার উপরে মুখ নামিয়ে ঠু দিচ্ছিলেন ধুলো ঝাড়বার জন্য।
এটা ভাল নয় মিঃ এমোট। ওই কঙ্কালটার মধ্যে কত বিষাক্ত বীজাণু থাকতে পারে। আপনার মুখে বীজাণু যদি–।
ওই সব বিষাক্ত বীজাণু আমার নিত্য খাদ্য নার্স, আমাকে বাধা দিয়ে তিনি আরও বলেন–কোন বীজাণুই প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে ক্ষতিকারক হতে পারে না বুঝলেন!
কঙ্কালটার আকৃতি দেখে মনে হয় কোন মহিলার। ছুরি দিয়ে দাগ কাটছিলেন কঙ্কালটার উপরে। মিঃ রেইটার সেই সব চিহ্নিত অংশের ফটো তুলবে মধ্যাহ্ন ভোজের পরে।
কে, কে এই মহিলা?? পোয়ারোই প্রথম সেই কঙ্কালের প্রসঙ্গে গেলেন।
প্রথম হাজার বছরের কোন এক সময়ের মহিলা হবেন হয়তো। করোটিটা একটু অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। মারকাডোকে ভাল করে পরীক্ষা করে দেখতে বলব। দেখে মনে হয় মহিলার মৃত্যুটা স্বাভাবিক ছিল না।
তবে কি ধরে নিতে পারি, হাজার হাজার বছর আগে আর এক মিসেস লিডনারের মতো?
সম্ভবত, সংক্ষিপ্ত উত্তর মিঃ এমোটের।
বিল কোলম্যান একটা পাথরের টুকরো নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। এমোট তাকে ডেকে সংক্ষেপে কি যেন বলবেন, ঠিক বোঝা গেল না। তারপর এক সময় কব্জি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এমোট ফিরে তাকালেন পোয়ারোর দিকে।
এবার কী বাড়ি ফিরে যাবেন?
গেলে মন্দ হয় না! পোয়ারো এমনভাবে বললেন–যেন এমনটিই চাইছিলেন তিনি।
আস্তে আস্তে হাটছিলাম আমরা। পোয়ারোই প্রথম মুখ খুললেন–আমার বিশ্বাস, পুনরায় কাজে ফিরে এসে আপনারা সবাই বেশ খুশি, তাই না?
হ্যাঁ, ভালই তো, এমোট গর্বভরে জবাব দেন, বাড়িতে বসে খোশ-গল্প করার থেকে এ অনেক ভাল।
আপনাদের মধ্যেই কেউ একজন খুনীর এ কথা জেনেও পোয়ারো প্রশ্নটা করে স্থির চোখে তাকালেন এমোটের দিকে।
এমোট কোন উত্তর দিলেন না, কিম্বা ভিন্নমতও পোষণ করলেন না। এখন আমি বেশ বুঝতে পারছি যে–হাউসবয়দের ডেকে মিঃ পোয়ারো জিজ্ঞাসাবাদ করার পরেই এমোট জেনে গেছেন, তাঁরা সবাই এখন তার চোখে সন্দেহভাজন ব্যক্তি। যে-কোন মুহূর্তে যে-কোন লোককে তিনি খুনী বলে ঘোষণা করতে পারেন–বলতে পারেন, আপনাকে গ্রেপ্তার করা হল, ইত্যাদি—
মিঃ পোয়ারো? শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন মিঃ এমোট–আপনি কোন সূত্রের সন্ধান পাচ্ছেন বলে মনে হয়?
যে-কোন মুহূর্তে পাবার আশা রাখি বৈকি! পোয়ারো বেশ গর্বের সঙ্গেই কথাটা বললেন–তবে সেটা নির্ভর করছে, আপনারা কতটুকু সাহায্য আমাকে করবেন তার উপরে।
