হ্যাঁ, যথেষ্ট কৌতূহল আছে তার কথার মধ্যে, পোয়ারো আমার কথা সমর্থন করে বলেন, তবে এমনও হতে পারে, গতকাল ডঃ লিডনার তাকে চিঠিগুলোর কথা বলাটা স্বাভাবিক, কারণ তারা পরস্পর দুজনের অনেকদিনের বন্ধু। আর তা যদি না হয়, তাহলে ভাববার কথা। মিস জনসন জানলেন কী করে চিঠিগুলোর কথা?
পোয়ারো কৌশলে যে ভাবে চিঠিগুলোর কথা উত্থাপন করলেন, তাতে তার উপরে আমার আরও শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।
মাটি খোঁড়ার কাজে ব্যস্ত ছিল সবাই তখন। ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রথমেই দেখা হল মিঃ রেইটারের সঙ্গে, দেওয়ালের ছবি তুলছিলেন তিনি তখন। ছবি নেওয়ার পর রেইটার তার ক্যামেরা এবং প্লেট সহ বয়ের হাতে তুলে দেন। ছবি তোলার ব্যাপারে তাকে কতকগুলো প্রশ্ন করলেন পোয়ারো। উত্তরগুলো যে তৈরি ছিল, চটপট জবাব দিলেন তিনি। তার কাজের সম্বন্ধে প্রশ্ন করাতে তাকে যেন একটু খুশি বলে মনে হল।
মিঃ রেইটার দুঃখ প্রকাশ করলেন আমাদের তিনি বেশিক্ষণ সঙ্গ দিতে পারছেন না বলে। তারই মাঝে পোয়ারো থেমে থেকে টুকরো টুকরো কয়েকটা কথা বললেন বিক্ষিপ্তভাবে। এ ধরনের কথা বলা পোয়ারোর একটা কৌশল। সরাসরি প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার আগে অন্য কথার মাধ্যমে লোকটাকে বাজিয়ে নেন একবার। যাইহোক, শেষপর্যন্ত কাজের কথাটা তিনি বলেই ফেললেন।
বুঝেছি, বুঝেছি আপনি কি বলতে চাইছেন, মিঃ রেইটার ব্যস্ততার মধ্যেও প্রয়োজনীয় উত্তরটা ঠিক ঠিক দেবার চেষ্টা করে বললেন,–কিন্তু আমার তো মনে হয় না, আপনার কোন সাহায্যে আমি আসতে পারি। সত্যি কথা বলতে কি, কেবল এ বছরই আমি এখানে এসেছি। তাছাড়া মিসেস লিডনারের সঙ্গে বড় একটা কথাবার্তা আমার তখনও হত না। তাই আমি অত্যন্ত দুঃখিত মঁসিয়ে পোয়ারো, এ ব্যাপারে আমি আপনাকে কিছুই বলতে পারছি না।
বেশ তো, পোয়ারো শান্তস্বরে বলেন–আপনি তাকে পছন্দ করতেন কি করতেন না, এর জবাব তো আপনি দিতে পারেন, কেন পারেন না?
মিঃ রেইটারের মুখটা হঠাৎ কেমন লাল হয়ে গেল, কথায় জড়তা প্রকাশ পেল। ও হ্যাঁ, লোককে আকর্ষণ করার মতো বিশেষ গুণ তার অবশ্যই ছিল, এবং বুদ্ধিমতী ছিলেন।
আপনি তাকে পছন্দ করতেন? আর তিনি আপনাকে পছন্দ করতেন?
তখনও লাল দেখাচ্ছিল রেইটারের মুখ।
আ-আমি সেটা লক্ষ্য করিনি। দু’একবার আমি তার সান্নিধ্যে আসার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমার আড়ষ্টতা আমাকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। আমার এই জড়তাই বলুন কিম্বা আড়ষ্টতাই বলুন, এর জন্য আমি তার বিরক্তির কারণ নিশ্চয়ই হয়েছিলাম। কিন্তু আজ অকপটে স্বীকার করছি, সেটা আমার ইচ্ছাকৃত ছিল না।
পোয়ারো তার কথায় করুণাবোধ করলেন।
ঠিক তা ঠিক। এবার অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক। আচ্ছা, এখানকার আবহাওয়ার কী তেমন সুখপ্রদ ছিল?
অনুগ্রহ করে–
আর একটা প্রশ্ন করব, অতঃপর পোয়ারো জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা সবাই এখানে সুখে-শান্তিতে ছিলেন তো? মানে আপনারা সবাই প্রাণ খুলে হাসতে পারতেন, কথা বলতে পারতেন তো?
না, না, ঠিক তা নয়। একটু অসুবিধা ছিল– রেইটার এখানে একটু থেমে নিজের মনের সঙ্গে বোঝাঁপড়ার চেষ্টা করলেন বোধহয়। তারপর আবার মুখ খুললেন, দেখুন আমি খুব একটা মিশুকে নই। কেমন একটা সংকোচবোধ সব সময় আমাকে ঘিরে রাখে। ডঃ লিডনার আমার প্রতি সদাশয় সব সময়। অথচ আমি কি বোকা দেখুন, আমার এই জড়তা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারি না। সব সময় কেমন ভুল হয়ে যায়। এ আমার দুর্ভাগ্য।
সত্যি সত্যি তাকে কেমন অসহায় শিশুর মতোন দেখাচ্ছিল।
আমরা সবাই ছেলেবেলায় এরকম করে থাকি, পোয়ারো হাসতে হাসতে বললেন পরে নিজেকে বিচার করে থাকি। তারপর বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে পোয়ারো স্থান ত্যাগ করলেন ধীরে ধীরে।
হয় নোকটা অত্যন্ত সরল প্রকৃতির মানুষ, পোয়ারো মন্তব্য করলেন ফিরে আসার পথে, নয় তত তিনি একজন অভিজ্ঞ অভিনেতা। তাই না?
আমি কোন উত্তর দিলাম না। তার কারণ আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এ ধরনের মানুষ দারুণ বিপজ্জনক হয়ে থাকে, এরা ঠাণ্ডা মাথায় খুন করতে পিছপা হয় না। তবে যে কারণেই হোক, এমন সুন্দর সূর্যস্নাত প্রভাতে সেটা অসম্ভব বলেই মনে হল আমার কাছে।
.
২১.
মিঃ মারকাডো এবং রিচার্ড ক্যারি
দেখছি ওঁরা দুজন আলাদা আলাদা জায়গায় কাজ করেন। এক জায়গায় একটু থেমে, কথাটা বললেন পোয়ারো।
ঝুড়ি মাথায় শ্রমিকরা মাটির নিচ থেকে উঠে আসছিল সারিবদ্ধ ভাবে, কণ্ঠে তাদের কোরাস গান, ভাষা আরবি। তেমনি দল বেঁধে কিছু শ্রমিক ঝুড়ি মাথায় ফিরে যাচ্ছিল মাটির নিচে। টুকরো টুকরো মৃত্তিকার বাসনপত্র হলেও ডঃ লিডনার বেশ আগ্রহ নিয়েই সেগুলো মাটি খুঁড়ে তুলে আনার ব্যবস্থা করছিলেন।
চলুন, ওখানে যাওয়া যাক, পোয়ারোর আগ্রহও কম নয়।
সূর্যের তাপ বাড়ছিল, আমাদের চলার গতি তাই শ্লথ হল।
দূর থেকে মিঃ মারকাড়োকে একজন ফোরম্যানের সঙ্গে আলাপরত দেখা গেল। ফোরম্যানের পরনে টুইড কোট, ডোরাকাটা মূর্তির গাউন, কচ্ছপের মতো কতকটা।
সরু পিচ্ছিল মেটো পথ। তবু শ্রমিকরা কেমন অনায়াসে বুড়ি মাথায় ওঠা-নামা করছিল। দূর থেকে তাদের ঝুলন্ত বাদুড়ের মতো দেখাচ্ছিল। কিন্তু আমাদের পক্ষে সেই পথে নামাটা বেশ কষ্টসাধ্য বলে মনে হল।
