আপনি আমাকে লজ্জায় ফেলে দিলেন মাদমোয়াজেল, ফরাসী কায়দায় হাত নেড়ে পোয়ারো বলেন যুবক-যুবতীদের প্রেমের ক্ষেত্রে আমি অত্যন্ত আগ্রহী। আমার পূর্ণ সমর্থন আছে তাদের উপরে।
বড় বিচিত্র চরিত্রের মেয়ে এই শীলা রেলি,মিস জনসন আরো বলে–কাঁচা বয়স, তবে বেসামাল নয় অবশ্যই।
পোয়ারো উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন–আপনাদের স্টাফদের মধ্যে আর কোন সদস্য বাকি আছে?
মেরী মারকাডোকে দেখতে পাচ্ছি না। বোধহয় খনন কার্য দেখতে গেছেন। সবাই তখন এখানেই আছে। মিস জনসন কথা বলতে বলতে বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে আসে, আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে সে বলে নার্স লিথেরান আপনাকে সেখানে নিয়ে যেতে আপত্তি করবেন না বলেই আমার মনে হয়।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই মিস জনসন, আমি তাকে আশ্বস্ত করতে বললাম আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, তারপর পোয়ারোর দিকে ফিরে বললাম, মিসেস মারকাডো এখন ছাদে আছেন। আপনি কী প্রথমে তার সঙ্গে দেখা করতে চান?
হ্যাঁ, সেই ভাল–চলুন উপরে যাওয়া যাক।
সিঁড়ি পথে উঠতে গিয়ে পোয়ারোকে আমি বললাম, আপনার কথা মতো, আমি তো কাজ করলাম। তা আপনি আমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন?
না–কোন শব্দই কানে আসেনি।
মিস জনসনকে তাহলে নতুন করে তার জবানবন্দীর কথা আবার ভেবে দেখতে হবে।
পোয়ারো আমার কথাগুলো খুব মনযোগ সহকারে শুনলেন কিন্তু হা-না কিছুই বললেন না।
প্যারাপেটের উপরে বসেছিলেন মিসেস মারকাডো। নিচের দিকে মুখ, গভীর চিন্তায় এমনি মগ্ন যে পোয়ারো তার সামনে গিয়ে সুপ্রভাত না জানানো পর্যন্ত তার হুঁশ ছিল না। তাকে খুব অসুস্থ বলে মনে হচ্ছিল। চোখের কোলে গভীর কালো আস্তরণ, বিমর্ষ মুখ।
আমি একটা বিশেষ কাজ নিয়ে এখানে এসেছি, বলে পোয়ারো অতঃপর কাজের প্রসঙ্গে চলে গেলেন কোন ভূমিকা না করে। সেই একই প্রশ্ন যা তিনি একটু আগে মিস জনসনের সামনে রেখেছিলেন। অর্থাৎ মিসেস লিডনার সম্বন্ধে প্রকৃত তথ্য তিনি জানতে ভীষণ আগ্রহী।
আমি বেশ ভাল করেই জানতাম যে, মিস জনসনের মতো সত্য কথা কিছুতেই বলতে পারে না মিসেস মারকাডো! মুখে একরকম আর কাজে আর একরকম। মুখে তিনি অবশ্য মিসেস লিডনার সম্বন্ধে ভূয়সী প্রশংসা করলেন পোয়ারোর কাছে, কিন্তু আমি হাল্কা করে বলতে পারি যে, মনে মনে তিনি অকথ্য ভাষায় তার নিন্দা করতে কসুর করেন না।
ওঃ আমাদের প্রিয় লুসি। যারা তাঁকে চাক্ষুস করেনি, কিম্বা তার সংস্পর্শে আসেনি, আমি মনে করি তাদের কাছে তার গুণাবলির ব্যাপারে যত কিছুই বলি না কেন, তবু যেন আক্ষেপ থেকে যায়, হায় কিছুই বুঝি বলা হল না আমার। তার মতো অমন দরদী, পরোপকারী মিষ্টি মহিলা আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। প্রত্নতত্ত্বের ব্যাপারে তার কোন জ্ঞান না থাকলেও, অবাক লাগে সে ব্যাপারে তার সেই অদম্য কৌতূহলের কথা ভাবতে। হ্যাঁ, শুধু এই জন্যই বোধহয় আমরা তার ব্যবহারে সবাই প্রীত ও মুগ্ধ।
ম্যাডাম, তাহলে আমি যা শুনেছি সত্যি নয়? এখানে কিছুদিন আগে যে একটা খারাপ আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, সত্যি নয়?
মিসেস মারকাডো বড় বড় চোখ করে তাকালেন, কে, কে এ কথা বলেছে? নার্স? না কি ডঃ লিডনার? বেচারা ডক্টর! আমার মনে হয় না, আজকাল তিনি ঠিক দেখার মতো করে দেখেন না।
মিসেস মারকাডোর কথায় অবজ্ঞার ভাব। জানেন মঁসিয়ে পোয়ারো, মিসেস লিডনারের মৃত্যুর পর এখন এখানকার সবাই ভান করতে চাইছে, তারা বুঝি অনেক কিছু জানে, কিন্তু আসলে তারা কিছুই জানে না। তারা অনেক ঘটনার কথা বলে, যা আদৌ ঘটেনি। জানেন, অস্বাভাবিক আবহাওয়া, উত্তেজনা, এ সব কী ঘটছে আসলে? না, আমার তা মনে হয় না। এসব হল লোকের গল্প কথা।
তারা অনেক ঘটনার কথা বলে, এর মানে আপনি কী বলতে চান ম্যাডাম? পোয়ারো জিজ্ঞাসা করলেন।
ওসব বাজে কথা ছেড়ে দিন। ওদের কথার মধ্যে বাস্তবতার বড় অভাব। এখানে আমরা সুখী পরিবার ছিলাম।
মিসেস লিডনারের উপর আমার দারুণ ঘৃণা হচ্ছিল। এক্সপিডিসন হাউস থেকে বেরিয়ে এসে পথে পোয়ারোকে বললাম, ওই মহিলার মত ডাহা মিথ্যুক আমি এর আগে কখনো দেখিনি। আমার দৃঢ় ধারণা, সত্যি সত্যি মিসেস লিডনারকে তিনি ঘৃণা করতেন। যাইহোক, ওঁর কথা ছেড়ে দিন। সত্যি কথা ওঁর কাছ থেকে আশা করা বৃথা। মিথ্যে সময় নষ্ট।
তা ঠিক। তা ঠিক। তবে বারবার তিনি মুখে মিথ্যে কথা বললেও একদিন না একদিন তাঁর চোখের তারায় সত্যের ছবি প্রতিবিম্বিত হবে। আচ্ছা তার অতো ভয় কিসের জন্য? ছোট-ম্যাডাম–মারকাডোর জন্য? পোয়ারো তার ধারণার কথা বললেন–আমি তার চোখে ভয়ের ছায়া দেখতে পেয়েছি। হ্যাঁ, তিনি নিশ্চয়ই কোন কিছুর ভয়ে আতঙ্কগ্রস্থ। দারুণ কৌতূহলের ব্যাপার এটা।
আমার না বলা কথাগুলি আমাকে বারবার তাগিদ দিচ্ছিল, সব না বলতে পারলেও কিছু অন্তত বলব। শেষপর্যন্ত বলেই ফেললাম,–মঁসিয়ে পোয়ারো?
কিছু বলবেন আমাকে?
হ্যাঁ, আপনাকে আমার কিছু বলার ছিল।
তারপর আমি আগের দিনের ঘটনার কথা সব খুলে বললাম। আর এও বললাম যে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেই সব বেনামা চিঠিগুলোর লেখিকা হলেন মিস জনসন।
মিস জনসন মিথ্যুক। আমি তাকে বললাম, আজ সকালে ঠাণ্ডা মাথায় তিনি আপনাকে যেমন গুছিয়ে মিথ্যে কথাগুলো বলে গেলেন, একটার পর একটা।
