যাত্রাপথের শেষে চলে এসেছি প্রায়, বলল কিশোর। এদিকে চাঁদটাও উঠি-উঠি করছে। ওদেরকে ত্যাগ করতে হবে আমাদের এখুনি, নইলে দেখে ফেলবে।
বলতে না বলতেই ঝাপসা একটা চাঁদ বেরিয়ে এলো মেঘের আড়াল থেকে। ওই আলোতে সামনের দ্বীপটা তো দেখতে পেলই, অনেকটা বামে আরও একটা দ্বীপ চোখে পড়ল ওদের। দশ-বারো মাইল হবে দুটোর দূরত্ব।
হুইল ঘুরিয়ে বোটের নাকটা তাক করল কিশোর দূরের দ্বীপটার দিকে। মুসাকে বলল সামনের বোটটা ওদের ঘাঁটিতে পৌঁছবার একটু আগে যেন জানায় ওকে। মিনিট বিশেক কাটল চুপচাপ।
ব্যস, হয়েছে, বলল মুসা। এবার ইঞ্জিন বন্ধ করতে পারো, কিশোর। এই গতিতে যতটা পারা যায় যাব, তারপর বৈঠা বাইব। ওরা প্রায় পৌঁছে…
কথা শেষ হওয়ার আগেই ইগনিশন সুইচ অফ করে দিল কিশোর, হুইল ঘুরিয়ে দিক পরিবর্তন করল একটু।
পিছন দিকে গিয়ে নোঙর ফেলব, বলল কিশোর। কেমন বুঝছ, সেকেন্ড, দ্বীপটা?
মনে হচ্ছে, আমাদেরটায় পাহাড়ও আছে, আবার সৈকতও আছে। নামতে কোনও অসুবিধে হবে না, আড়ালও পাওয়া যাবে।
পিছন দিয়ে ঘুরে দ্বীপের কাছে গিয়ে চাঁদের আলোয় মোটামুটি পরিষ্কারই দেখতে পেল ওরা। বেশি পাহাড় নেই বটে, তবে ছোটখাট টিলা রয়েছে মেলাই। বালু আর ছোট নুড়ি পাথরের ঢালু তীর।
দাঁড় বন্ধ করে তৈরি হয়ে নাও তোমরা, বলল কিশোর। সোজা ডাঙায় নাক তুলে দিচ্ছি, বোট থামলেই লাফিয়ে নেমে যাবে তোমরা। টেনে বেশ কিছুটা ওপরে তুলে রাখতে হবে এটাকে।
প্রথমে লাফিয়ে নামল মুসা ও রবিন, দুই সেকেন্ড পর লাফ দিয়ে নামল কিশোর ও জিনা। চারজন মিলে সৈকতের বেশ কিছুটা উপরে তুলে ফেলল বোট, তারপর নোঙর গাড়ল শক্ত করে। ভাটার শেষে জোয়ার এলেও এখন আর ভেসে যাবে না ওদের বাহন।
ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে ওরা। সাগরতীরেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তে যাচ্ছিল মুসা, দুই হাত ধরে টেনে তুলল ওকে কিশোর ও রবিন। মুসা বোঝাবার চেষ্টা করল: কোনও অসুবিধে নেই এখানে ঘুমালে, কেউ জানে না। ওরা এই দ্বীপে, এটা আর একটা পাখির দ্বীপ ছাড়া কিছুই নয় কিন্তু কোনও কথা শুনল না ওরা, ওকে তুলে নিয়ে এগোল সামনের টিলার দিকে। রবিন কাছে পৌঁছে টর্চ জ্বালতেই দেখা গেল টিলার গায়ে চমৎকার একটা গুহার মত গর্ত রয়েছে, ঠিক যেন ওদের ঘুমানোর জন্যই মাপ দিয়ে তৈরি হয়েছে ওটা। মেঝেটা শুকনো, কর্কশ, মোটা বালি। ভিতরে সামুদ্রিক শ্যাওলার কিছুটা সোদা গন্ধ, কিন্তু অসহ্য নয় মোটেও। ধপাস করে বসে পড়ল ওরা বালির উপর।
বোট থেকে বিছানা নিয়ে আসবার কথা বলল জিনা, কিন্তু কেউ আর উঠতে পারল না। ওখানেই ঢলে পড়ল ঘুমে। শোয়াটা একটু বে-কায়দা হওয়ায় হালকা নাক ডাকছে মুসার। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল কিকো মুসার মাথার কাছে, সামনে ঝুঁকে বুঝবার চেষ্টা করল তার প্রাণপ্রিয় মুসা এরকম শব্দ করছে কেন, তারপর সিদ্ধান্ত নিল ব্যাপারটা গুরুতর কিছু নয়। এবার উঠে বসল গুহার ভিতরে পড়ে থাকা একটা পাথরের উপর। এক-আধবার হালকা ভাবে শব্দটা নকল করল, তারপর ডানার নীচে মাথা গুঁজল। আর গুহামুখে গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে পড়ল সখা-সখি, ঠিক যেন পাহারাদার।
পরদিন সকালে হেলেদুলে কিশোরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল সখা-সখি। দুপাশ থেকে ডাকল দুজন, অরররররর!
চোখ মেলল কিশোর। দেখল সকালের নাস্তা হাজির। ঠোঁটে করে ছয় সাতটা মাছ ধরে এনেছে ওরা। ভোরবেলাই পেট পুরে মাছ খেয়ে এসেছে ওরা। সাগর থেকে, তারপর নিয়ে এসেছে কিশোরের জন্য। মাছগুলো সাজিয়ে দিল ওরা কিশোরের বুকের উপর, বিশাল চঞ্চু খুলে আর বন্ধ করে দেখাল ওগুলো কী করতে হবে; তারপর, সন্তুষ্টচিত্তে গলার ভিতর থেকে গম্ভীর আওয়াজ বের করল, অরররররর!
জেগে গেছে সবাই। হাসিমুখে চেয়ে রয়েছে কিশোরের দিকে। নাক কুঁচকাল কিশোর খুশি ঢাকবার জন্য। বলল, এহ! মাছের আঁশটে গন্ধ করে দিল গায়ে! এখন গোসল না করে উপায় নেই।
সবাই গিয়ে নামল সাগরে। গোসল সেরে পোর্টেবল চুলো আর গোটা কয়েক খাবারের টিন নিয়ে ফিরে আসবে গুহায়। আমন্ড বাদামের টিন খুঁজতে গিয়েই ট্রান্সমিটারটা পেয়ে গেল জিনা। ওটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল কিশোর, কিন্তু বুঝতে পারল না কীভাবে অপারেট করা যায়। আঙ্কেলেরটা অন্য রকম ছিল। না জেনে এটা ঘাঁটাঘাঁটি করা ঠিক হবে না, এটুকু পরিষ্কার বুঝল ও। হয়তো এটা এমন ভাবে সেট করা আছে, এর মাধ্যমে সাহায্য চাইলে সোজা এসে হাজির হবে শত্রুপক্ষ।
মাছের তেলে মাছ ভেজে খেল ওরা; সেইসঙ্গে বিস্কিট, ফল, দুধ, পনির, জেলি, বাদাম আর সবজি তো আছেই। ভরপেট খেয়ে নিল ওরা সকালেই।
চলো, নাস্তার পর প্রস্তাব দিল রবিন, টিলার ওপর উঠে দেখি ওই দ্বীপে। ওরা কী করে।
সবচেয়ে উঁচু টিলাটায় উঠবে বলে স্থির করল ওরা, কারণ ওখান থেকে এই দ্বীপেরও কোথায় কী আছে দেখে নেওয়া যাবে একনজরে।
প্রথমে একটা ছোট টিলার উপর উঠে চওড়া একটা ঘাসে ছাওয়া উপত্যকা পাওয়া গেল, তারপর সেই উঁচু টিলা। অর্ধেক উঠেই টের পাওয়া গেল বেশ ছোট এই দ্বীপটা-তিন দিকেই সাগর দেখা যাচ্ছে কাছাকাছি। চূড়ায় পৌঁছে। ওপাশটায় নজর দিয়েই তাজ্জব হয়ে গেল ওরা। আশ্চর্য সুন্দর একটা নীল পানির লেগুন, তার ওপাশে আরেকটা দ্বীপ বা এই দ্বীপেরই আরেক অংশ। লেগুনের পানি আয়নার মত স্বচ্ছ, স্থির। খোলা সমুদ্রের দিকের দুই প্রান্ত ছোট বড় নানান আকার-আকৃতির পাথরখণ্ড দিয়ে আটকানো-কোথাও ছোট টিলার সমান উঁচু, কোথাও আবার বাইরের সাগর থেকে মাত্র এক কি দুই হাত উঁচু। লেগুনটাকে দেখে মনে হচ্ছে উত্তাল সমুদ্রের মাঝখানে অপূর্ব সুন্দর একটা নিস্ত রঙ্গ দিঘি। এতই সুন্দর যে মনে হচ্ছে আসলে স্বপ্ন দেখছে ওরা, সত্যি-সত্যি এরকম একটা লেগুন থাকতেই পারে না।
