হাঁ করে চেয়ে রইল ওরা এক মাইল লম্বা আর আধ মাইল চওড়া এই প্রাকৃতিক লেকের দিকে। তারপর ঘাড় ফিরিয়ে সবাই চাইল দূর দিগন্তের ছোট্ট দ্বীপটার দিকে। আবছা মত দেখা যাচ্ছে জেটিতে ভিড়ানো কয়েকটা বোট।
হঠাৎ চমকে আকাশের দিকে চাইল সবাই। ভ্রমরের গুঞ্জনের মত শব্দ আসছে। বাড়ছে শব্দটা। দূরে দেখতে পেল ওরা প্লেনটা, সোজা এইদিকেই আসছে। কাউকে কিছু বলতে হলো না, শুয়ে পড়ল সবাই একটা পাথরের আড়ালে। উড়তে উড়তে লেগুনের উপর এসে পড়ল প্লেনটা, তারপর উড়ন্ত অবস্থাতেই কী-একটা পড়ল ওটা থেকে। দেখতে দেখতে ছাতার মত হয়ে গেল জিনিসটা, বড়সড় একটা বস্তা ঝুলছে ছাতার নীচে।
মুহূর্তের মধ্যে নানান কথা খেলে গেল ওদের মাথায়। ব্যাপার কী? কোনওরকম বৈজ্ঞানিক গবেষণা-বোমা-অ্যাটম বোম? কী ওটা?
প্যারাশুটটা দুলতে দুলতে নেমে আসছে লেগুনে। নীচের প্যাকেটটা দেখা গেল চকচকে কী দিয়ে মোড়া, কিশোরের কাছে মনে হলো ওয়াটারপ্রুফ প্ল্যাস্টিক হবে। পানিতে পড়েই তলিয়ে গেল জিনিসটা। প্যারাশুটটা কয়েক মুহূর্ত গোল হয়ে ভেসে থাকল শান্ত পানিতে, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল পানির নীচে।
ওই দেখো, বলল রবিন। চক্কর দিয়ে আবার আসছে। আরও একটা ফেলবে মনে হচ্ছে।
একটা নয়, পরপর আরও দুটো প্যাকেট ফেলা হলো প্লেন থেকে। আগেরটার মত এগুলোও ঠিক একই ভাবে কোনও চিহ্ন না রেখে তলিয়ে গেল লেকের পানিতে। শেষ একটা চক্কর দিয়ে চলে গেল প্লেনটা, মিলিয়ে গেল। দূরে।
নীচের ঠোঁটে চিমটি দিচ্ছে কিশোর।
আশ্চর্য! কী করছে ওরা? বলল ও। পানিতে ফেলছে কেন ওগুলো? কী আছে ওই প্যাকেটগুলোতে?
পারমাণবিক বর্জ্য হতে পারে? প্রশ্ন করল রবিন।
উঁহু, এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল কিশোর। তা হলে স্টীলের কন্টেইনার হাত ওগুলো, ওয়াটারপ্রুফ প্ল্যাস্টিক জড়ানো থাকত না। অন্য কিছু।
চলো না, বোটটা নিয়ে গিয়ে দেখি লেগুনের তলায় কিছু দেখা যায় কি না, বলল জিনা।
হাসল মুসা। বোট নিয়ে ঢুকবে কোন দিক দিয়ে, শুনি? চারদিক ঘেরা না? জিভ কাটল জিনা। তারপর বলল, যাই হোক, ওখানে কোনও ভাবে গিয়ে যদি ডুব দিয়ে দেখা যেত!
অররররররর! সমর্থন জানাল সখা। সখি বলল, অররররর! কাজটা যে কত সহজ তা বোঝাবার জন্য পাহাড়ের চূড়া থেকে একসঙ্গে কঁপ দিল ওরা দুজন, উড়ে গিয়ে বসল লেগুনের পানিতে। পরমুহূর্তে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মাছ ধরায়।
চলো, আমরাও যাই, বলে ঝাঁপ দেওয়ার ভঙ্গি করল মুসা। তারপর বলল, চলো, কিশোর। গরমে ঘামাচি উঠে যাচ্ছে পিঠে। ওই লেগুনের পানিতে গোটা কয়েক ডুব দিতে না পারলে শান্তি হবে না আমার।
আমারও, তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে নীচের ঠোঁটে শেষ একটা টান দিয়ে বলল কিশোর। চলো, রবিন। পথ দেখাও।
তরতর করে নামতে শুরু করল রবিন, তার পিছন পিছন চলল আর সবাই। বিশ মিনিটেই পৌঁছে গেল ওরা লেগুনের তীরে।
জামা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা স্বচ্ছ, নীল পানিতে। ধীর ভঙ্গিতে সাঁতার কেটে এগিয়ে যাচ্ছে বস্তা তিনটে যেখানে পড়েছিল সেইদিকে।
আগে একটা ডুব দিয়ে দেখে আসি কতটা গভীর, বলেই লম্বা করে দম নিয়ে ডিগবাজি খেয়ে ডাইভ দিল মুসা।
বারো
লেগুনটা বেশ গভীর। অনেকদূর নামল মুসা, কিন্তু তল পর্যন্ত পৌঁছুতে পারল না। দম ফুরিয়ে আসতেই উঠে এল সে উপরে। খানিক হাঁপিয়ে নিয়ে মুখ খুলল।
নীচে যেতে পারিনি। অনেক গভীর। তলে দেখলাম, গাদাগাদা বস্তা পড়ে আছে, চকচকে প্ল্যাস্টিক দিয়ে মোড়ানো। এবার খানিকটা সামনে গিয়ে ডুব দেব। মনে হলো ওদিকটায় পানি কিছু কম। গজ বিশেক এগিয়ে গিয়ে চিত হয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিল মুসা, তারপর বলল, দাঁড়াও, এইবার অন্তত ছুঁয়ে দেখে আসব।
এবার কিশোরও সঙ্গে গেল। ওর সঙ্গে ডুব দিল সখা-সখিও। মুসা ডুব দিতে যাচ্ছে দেখে আগেরবারের মতই ঠিক শেষমুহূর্তে শূন্যে উঠে এদিক ওদিক চেয়ে রবিনের কাঁধে চাপল কিকো। পানিতে নেমে ছেলেদের এই সব ছেলেমানুষি ওর একদম না-পছন্দ। বলল, দূরো!
দুজনই ওরা পৌঁছে গেল এবার, দুজনেই টিপে দেখল নরম প্যাকেটের ভিতর শক্ত কী যেন-কিন্তু ঠিক কী তা বুঝে উঠবার আগেই বুক ভরে বাতাস নেওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠল ওরা। পা দিয়ে নীচের পাথরে ধাক্কা দিয়ে ছুটল উপর দিকে।
খানিক হাঁপিয়ে নিয়ে কিশোর বলল, একটু ওইদিকে চলো। মনে হলো ওখানে উঁচু পাথরের ওপর একটা বস্তা দেখলাম। আঙুল তুলে ডানপাশটা দেখাল ও। সবাই সরে গিয়ে স্থির হয়ে থাকল ওখানে।
কিশোর ও মুসাকে জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়ে এবার ডুব দিল রবিন। বিশ সেকেন্ডের মধ্যেই ফিরে এল ও। রীতিমত ঘাবড়ে গেছে। ওর চোখে-মুখে। ভয়ের চিহ্ন দেখে কাছে এগিয়ে এল কিশোর ও মুসা।
কী দেখতে পেলে?
ফেটে গেছে বস্তা। ভেতরের জিনিস সব ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। কিশোর, এখনই আমাদের পালানো দরকার এখান থেকে!
কী আছে আগে দেখে আসি একবার, বলে একই সঙ্গে ডুব দিল কিশোর ও মুসা। প্রায় এক মিনিট পানির নীচে থাকল ওরা, তারপর উঠে এসেই বিনা বাক্য-ব্যয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করল তীরের দিকে।
কী? কী দেখলে পানির নীচে? অস্থির ভাবে পায়চারি করছিল জিনা লেকের পারে, ওরা কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করল কৌতূহল চাপতে না পেরে।
অস্ত্র! বলল মুসা। পিস্তল-রিভলভার থেকে নিয়ে রাইফেল-মেশিন গান বাজুকা-রকেট লঞ্চার সব রকম! অসংখ্য!
