ওদের চোখের আড়ালে, জবাব দিল কিশোর। এই বোটই এখন আমাদের একমাত্র ভরসা। ওরা এদিক এলে আমরা যাব ওদিকে, ওদিক গেলে এদিকে। এটা ওদেরকে কেড়ে নিতে দেয়া যাবে না কিছুতেই।
খোলা লেগুন থেকে বোটটা সরিয়ে নিল ওরা পাহাড়ের আড়ালে, তারপর বন্ধ করে দিল ইঞ্জিন।
অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না কিছুই, কিন্তু অগ্রসরমান ইঞ্জিনের শব্দটা শোনা যাচ্ছে পরিষ্কার। অনেক কাছে এসে পড়েছে মোটর-বোট। এখন আর কোনও সন্দেহ নেই, এই দ্বীপ লক্ষ্য করেই আসছে ওটা। ছায়ার মত দেখা গেল ওটাকে, বেশ বড়সড় একটা বোট, সোজা গিয়ে ঢুকল গোপন চ্যানেলে।
ইঞ্জিন বন্ধ হতেই কানে এল ব্যালকনিতে বসা কয়েকটা সামুদ্রিক পাখির প্রতিবাদের শব্দ। যারা ভয় পেয়ে আকাশে উঠে পড়েছিল, তারা ফিরে আসতেই সব চুপ হয়ে গেল আবার।
মনে হয় এতক্ষণে গর্ত থেকে বেরিয়ে পড়েছে আইনস্টাইন, বলল জিনা।
হ্যাঁ, জবাব দিল রবিন। এবার তোমার নামে নালিশ করবে তোমার আব্বার কাছে!
অরররররর! রবিনের কথায় সায় দিল সখা।
চমকে উঠে সবাই দেখল ডেকের একপাশে গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে আছে। সখা-সখি। হেসে উঠল সবাই ওদের আনুগত্যের নমুনা দেখে।
যাই হোক, হাই তুলে জিজ্ঞেস করল জিনা, এবার আমরা কী করব? রওনা হয়ে যাব যে-কোনও একদিকে?
মাথা নাড়ল কিশোর। ভোর না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকব আমরা। আকাশ একটু ফরসা হয়ে এলেই রওনা দেব। বেশ অনেকটা দূর দাঁড় বেয়ে সরে যাওয়ার পর ইঞ্জিন স্টার্ট দেব আমরা, যাতে আওয়াজ শুনে কেউ পিছু ধাওয়া না করতে পারে।
তা হলে নোঙর ফেলে বিশ্রাম নিয়ে নিলেই পারি আমরা, বলল মুসা। একজন পাহারায় থাকলেই যথেষ্ট।
নোঙর নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল রবিন ও মুসা। গ্রাউন্ডশীট বিছিয়ে বিছানা পেতে ফেলল জিনা ডেকের উপর। চমৎকার হাওয়া, মাথার উপর তারা ভরা আকাশ, সাগরের ঢেউয়ে মৃদুমন্দ দোল-কিশোর ঠায় বসে আছে পাহারায়, বাকি তিনজন শুয়ে পড়েছে, কিন্তু ঘুম নেই ওদের কারও চোখে।
আপন মনে মুখস্থ বুলি আওড়াতে শুরু করল কিকো। মুসা ওকে থামতে বলায় উল্টে ধমক দিল, তুই চুক কর!
উঠে বসে মুসা ওর ঠোঁটে টোকা দিয়ে শাসন করতে গিয়ে দেখল, চট করে ডানার নীচে ঢুকিয়ে ফেলেছে মাথাটা। মৃদু হেসে বলল ও, বদমাশ কোথাকার! চালাকের ধাড়ি!
ডানার নীচ থেকে হালকা গলায় জবাব এল, দূরো!
অনেকক্ষণ কেটে গেল চুপচাপ। জিনার চোখ লেগে এসেছিল, ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। ইঞ্জিনের আওয়াজ! স্টার্ট নিয়েছে মোটর-বোট।
তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে কিশোর গোপন চ্যানেলের দিকে।
মুসা! ডাকল ও।
বুঝতে পেরেছি, বস, বলেই কনুই চালাল মুসা রবিনের পাঁজরে। উঠে পড়ো, নথি। নোঙর তুলে ফেলতে হবে। ওরা, এদিকে এগোলে সরতে হবে আমাদের।
তার মানে, নোঙরের রশি ধরে টানতে টানতে বলল রবিন, মুসার ওমনিবায়োলজিস্টকে উদ্ধার করে ফেলেছে ওরা। চলে যাচ্ছে এখন। এতক্ষণে জেনে গেছে চারটে ছেলে-মেয়ে ওকে গর্তে ফেলে আটকে রেখে চলে গেছে ওর বোট নিয়ে। শুনে নিশ্চই আচ্ছামত বকেছে ওকে-এবার ফিরে যাচ্ছে নিজেদের আস্তানায়।
জলদি করো! তাগাদা দিল কিশোর। বাতি জ্বেলেছে! এবার যদি আমাদের খুঁজতে আসে তা হলে বিপদ হবে!
ব্যাপারটার গুরুত্ব উপলব্ধি করে দ্রুত হাত চালাল মুসা ও রবিন। বোটের ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে ফেলেছে কিশোর ইতিমধ্যে। গভীর সাগরের দিকে পিছিয়ে। যাচ্ছিল বোট, কিন্তু রিভার্স গিয়ার দিল কিশোর। থেমে দাঁড়াচ্ছে ওদের বোট।
কী হলো! বলে ঘাড় ফিরিয়ে চাইল মুসা ও রবিন কিশোরের দিকে।
চেয়ে দেখো, একটা আঙুল তুলল কিশোর গোপন চ্যানেলের দিকে। দেখা গেল বোট ঘুরিয়ে নিয়েছে ওরা। খোঁজাখুঁজির মধ্যে না গিয়ে সোজা রওনা হচ্ছে আস্তানার দিকে। আমরাও বেঁচে গেলাম অযথা খোঁজাখুঁজির হাত থেকে। ওরা একটু এগোলেই পিছু নেব আমরা, সহজেই জেনে যাব কোথায়। আটকে রেখেছে আঙ্কেলকে।
ভালোই হবে, বলল জিনা! আঁধারে দেখতে পাবে না আমাদেরকে, আমাদের বোটের আওয়াজও শুনতে পাবে না নিজেদের শব্দের জ্বালায়।
ঠিক, হাসল মুসা। তবে সতর্ক থাকতে হবে আমাদের। কোনও কারণে। ওরা যদি ইঞ্জিন বন্ধ করে, আমাদেরও চট করে বন্ধ করতে হবে। নইলে টের পেয়ে যাবে পিছনে লেগেছি আমরা।
পশ্চিম বরাবর রওনা হয়ে গেল শত্রু-বোট। আধমাইল পিছনে থেকে ওদেরকে অনুসরণ করছে আইনস্টাইনের বোট। পালা করে হুইল ধরছে ওরা। যখন যার হাতে হুইল, সতর্কতার সঙ্গে চোখ রাখছে সে সামনের মোটর বোটের উপর-গতি কমলেই বন্ধ করে দেবে ইঞ্জিন।
ডেক-রেইলের পাশে বসে দিব্যি দোল খাচ্ছে সখা-সখি। মাঝে মাঝে গলা লম্বা করে দেখে নিচ্ছে কিশোরকে। বোঝাই যাচ্ছে, মন স্থির করে নিয়েছে ওরা-কিশোর যেখানেই যাক, ওরা থাকবে সঙ্গে। ওদের ভালবাসা দেখে মুগ্ধ জিনা। বলেই ফেলল, আমার রাফিয়ানের থেকে কোনও দিক দিয়ে কম না!
ঘুমের পাট চুকে গেছে বলে মুসার কাঁধে জায়গা নিয়েছে কিকো। বকবক করছে আপন মনে। মাঝে মাঝে হাঁচির মত শব্দ করেই বলে উঠছে, মরে। গেলাম! ডাক্তার! ডাক্তার ডাকো!
.
অনেক-অনেকক্ষণ চুপ করে থাকবার পর রবিন বলে উঠল, আলোটা দেখতে পেয়েছ, মুসা? জ্বলছে-নিভছে?
কোন দিকে?
সামনেই, কিন্তু একটু ডাইনে। মনে হচ্ছে, এসে গেছে ওদের ঘাটি; সিগনাল পাঠিয়ে পথ দেখাচ্ছে কেউ ওদের। ওই দেখো, আলোর দিকে ঘুরে গেল ওদের বোটের নাকটা।
