গরু ও মুরগির মাংস, মশলাদার সেদ্ধ মটরশুটি, মাখন দেওয়া বিস্কিট, ফুট স্যালাড, ভাজা আমন্ড আর সল্টেড কাজুবাদাম দিয়ে পেট পুরে খেয়ে উঠল ওরা। বাদাম পেয়ে কিকো তো মহাখুশি।
রাতেই বেরিয়ে পড়ব নাকি আমরা? নিচু গলায় জানতে চাইল রবিন।
না, জবাব দিল কিশোর। রাতে টের পাব না কোনদিকে চলেছি। কাল খুব ভোরে আইনস্টাইন যখন ঘুমিয়ে থাকবে, তখন রওনা হব আমরা। মুসা, তুমি ডাণ্ডা নিয়ে বসে থাকো গর্তের মুখে, আমি এখনই বোটটা নিয়ে আসি এদিকের লেগুনে। রবিন আর জিনা, আমাদের ব্যাগ-ব্যাগেজ আর কয়েকদিন চলার মত খাবারের টিন নিয়ে গিয়ে রাখো সাগরতীরে। আজই সবকিছু বোটে তুলে ফেলব আমরা। কাল সকালে শুধু বিছানা-বালিশ আর কয়েক বালতি ঝরনার পানি নিয়ে উঠে পড়ব আমরা মোটর-বোটে।
আমরা নেই, টের পেয়ে আইনস্টাইন যখন গর্ত থেকে বেরিয়ে আসবে, আমরা তখন অর্ধেক সাগর পেরিয়ে গেছি! মুচকি হেসে বলল জিনা। বেচারার জন্যে দুঃখই হচ্ছে আমার।
আমার হচ্ছে না, বলল মুসা। লোকটা আঙ্কেলের শত্রু, কাজেই আমারও শত্রু। তারপরেও আমরা ওকে অঢেল খাবার দিয়ে যাব। ওর খোঁজে ওর লোকজন যদি দশদিন পরেও আসে, ও সেই দশটা দিন আরামেই থাকবে।
এত দ্বীপের মধ্যে আঙ্কেলকে খুঁজতে আমরা কোন দ্বীপে যে যাব! বলল রবিন। চেষ্টা না করলে নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে থাকব চিরকাল। কিন্তু তেমন একটা ভরসাও তো পাচ্ছি না।
চেষ্টা করে দেখতে হবে, মাথা ঝাঁকাল কিশোর। আমাদের বিপদে এর আগে কয়েকবার ঝাঁপিয়ে পড়েছেন আঙ্কেল। এখন তাঁর বিপদে আমাদেরও এগিয়ে যাওয়া দরকার। শুধু যদি জানতাম কোনদিকে এগোতে হবে। তবে যতদূর মনে হয়, পশ্চিমের কোনও একটা দ্বীপে হেডকোয়ার্টার করেছে ওরা।
এরপর ব্যস্ত হয়ে পড়ল ওরা। কিশোর বোট নিয়ে এল লেগুনে, রবিন আর জিনা বেশিরভাগ মালপত্র তুলে ফেলল বোটে। কীসে ঘুমাবে ভেবে ওয়েনস্টেইনের বিছানা নিয়ে এল কিশোর বোট থেকে। গর্ত দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হলো সেগুলো নীচে। কথা বলা বৃথা জেনে চুপ হয়ে গেছে পক্ষিবিশারদ। একটি কথা না বলে বিছানা-বালিশ-চাদর বিছিয়ে ঘুমাবার প্রস্তুতি নিয়ে নিল গর্তের ভিতর। অনেকগুলো খাবারের টিন আর একটা ক্যান ওপেনারও নিল সে হাত বাড়িয়ে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই চিৎকার শুরু করল।
তোমাদের খেলাধুলা অনেক তো হলো, এবার আমাকে ওপরে উঠতে দাও! মাটির নীচে কবরের মত লাগছে আমার! দাঁড়াও, বিচ্ছ কোথাকার! একবার তোমাদের পেয়ে নিই হাতের মুঠোয়, উচিত শিক্ষা পাবে তোমরা! এসবের কী মানে, যদি কেউ বলে দিত!
হয়েছে, বলল মুসা। আর অভিনয় করতে হবে না মিস্টার আইনস্টাইন! আপনি ভালো করেই জানেন, আমরা পরস্পরের শত্রু। আপনি যদি একটু মুখ খোলেন, আমরাও কিছুটা নমনীয় তো নিশ্চই হবো। আমরা জানতে চাই, ঠিক কোন দ্বীপে আটকে রাখা হয়েছে মিস্টার ডিক কার্টারকে। এ বারবার এই নামটা শুনছি-কে এই ডিক কার্টার? অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলল বন্দি। শোনো, তোমরা যদি ডাকাত-ডাকাত, জলদস্যুর খেলা খেলো, এর তো একটা শেষ আছে, না কি? কয়েকটা দুষ্টু ছেলেমেয়ে একজন ভদ্রলোককে মাটির নীচের গর্তে আটকে রেখেছে, এমন নজির পৃথিবীর কোথাও নেই; আমি তো অন্তত শুনিনি।
আমিও না, বলল মুসা। কিছু যদি স্বীকার করতে না চান, মিস্টার আইনস্টাইন, তা হলে আপনার চুপ করে থাকাই ভালো। শুধু জেনে রাখুন, আমরা সবাই সব জানি।
আচ্ছা বজ্জাত ছেলে দেখছি! বলে মুখ বন্ধ করল বন্দি।
দূরো! বজ্জাত কোথাকার! বলে গর্তের কিনারায় গিয়ে বসল কিকো। দাঁড়াও আসছি! দেখাচ্ছি মজা! অ্যাই, পা বন্ধ করো, দরজা মুছে ঘরে ঢোকো!
নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছে না প্রফেসরের। তার সঙ্গে এই অভদ্র ভাষায় কথা বলছে, ওটা কি সত্যিই কাকাতুয়া? না কি এ সবকিছুই স্বপ্ন?
তোর…তোর ঘাড়টা মুচড়ে দেব আমি! বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ওয়েনস্টেইন।
হা-হা করে হেসে উঠল কিকো। পরমুহূর্তে টানেলে ঢোকা রেল-ইঞ্জিনের বিকট শব্দ করল। মাটির নীচের বদ্ধ জায়গায় ভয়ঙ্কর শোনাল আওয়াজটা। ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল বন্দি। পরাজিত, বিধ্বস্ত। বিড়বিড় করছে: মাথা খারাপ! মাথা খারাপ! মাথা খারাপ হয়ে গেছে সবার!
এগারো
সবকিছু বোটে তুলে গুছিয়ে রেখে ফিরে এল ওরা মুসার কাছে। এখন বাকি থাকল কেবল বিছানা-বালিশগুলো নিয়ে কাল সকালে বোটে উঠে পড়া।
সন্ধে হয়ে গেছে। গর্তের কাছেই ঘুমানোর আয়োজন করতে যাচ্ছিল রবিন ও জিনা, হঠাৎ মুখ দিয়ে শ্শ্শ্শ্শ্শ্ শব্দ করল মুসা।
যে যেখানে যে-ভঙ্গিতে ছিল মূর্তির মত জমে গেল সবাই।
কী! চাপা স্বরে জানতে চাইল কিশোর।
একটা ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এইদিকেই আসছে!
কই, আমি তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না! ফিসফিস করে বলল রবিন। আমার মনে হয়…
চুপ! থামিয়ে দিল ওকে কিশোর। গর্তমুখ থেকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল সবাইকে। বিছানা-বালিশ নিয়ে এখনই উঠে পড়ব আমরা বোটে।
অরররররর! নিজের মতামতটা জানিয়ে দিল সখা।
যে-যার বিছানা তুলে নিয়ে রওনা হয়ে গেল নোঙর ফেলা বোটের দিকে। বিনা বাক্য-ব্যয়ে মেনে নিয়েছে ওরা প্ল্যানের এই হঠাৎ পরিবর্তন। এতক্ষণে সবার কানেই ধরা পড়েছে শব্দটা।
আইনস্টাইনের খোঁজে আসছে তার সাঙ্গপাঙ্গরা, বোটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল মুসা। কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়?
