দেখেছ, কিশোর, রাগে ফুঁসছে কী রকম? এজন্যে ওঁকে দোষ দিতে পারবে না। ওমনিবায়োলজির প্রফেসর-যা-তা কথা না!
অরনিথলজি! হুঙ্কার ভেসে এল গর্তের ভিতর থেকে। বোকা ছেলে কোথাকার! মুসাকে ছেড়ে কিশোরের প্রতি মনোযোগ দিল সে এবার। আমাকে বের করো এখান থেকে! সাবধানে গর্তের মুখ দিয়ে মাথা তুলল সে। একটা চোখ রেখেছে মুসার হাতের লাঠিটার উপর। প্রয়োজন পড়লেই টুপ করে ডুব দেবে।
প্রয়োজন পড়ল। সই যাতে ঠিক থাকে সেজন্য মোটা লাঠিটা প্রফেসরের চাদিতে একবার চুঁইয়ে মাথার উপর তুলল মুসা, কিন্তু নামিয়ে আনতে গিয়ে দেখল টার্গেটটা অদৃশ্য হয়েছে।
শোনেন, জনাব আইনস্টাইন, ভুরু কুঁচকে চেহারাটা ভয়ঙ্কর করে তুলে বলল মুসা, এর পরেরবার আর কোনও ওয়ার্নিং না দিয়েই ডাণ্ডা চালাব আমি। ঠিক যেভাবে আপনি চালিয়েছিলেন ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় আঙ্কেল ডিকের • মাথায়। মিথ্যে বলে লাভ নেই, ডেকের ওপর রক্ত দেখেছি আমরা!
মাথা খারাপ নাকি ছোকরার! বলল লোকটা আপন মনে। কী বলছে। এসব? শোনো, তোমরা ছাড়া আর কেউ নেই এই দ্বীপে? তোমাদের একটা কথাও আর শুনব না আমি। বড় কে আছে ডাকো তাকে, আমি কথা বলব। যদি মনে করে থাকো এখানে আমাকে আটকে রাখতে পারবে, তা হলে বলব বোকার স্বর্গে আছ তোমরা। ছিহ! এইরকম পাজি ছেলেমেয়ে দেখিনি আমি জীবনে!
এতক্ষণ রবিনের কাঁধে বসে তামাশা দেখছিল কিকো, এইবার মুখ খুলল, ঘুমাতে যাও, পাজি ছেলে, ঘুমাতে যাও! রবিনের কাঁধ থেকে নেমে গর্তের কিনারে চলে গেল সে। কড়া গলায় বলল, কী হলো, কথা কানে যায় না?
হাঁ করে চেয়ে রইল ওয়েনস্টেইন কিকোর দিকে। তারপর ফেটে পড়ল রাগে। ধমকে উঠল কিকোর উদ্দেশে।
যা এখান থেকে! একটা পাখিরও বকা খেতে হবে নাকি আমাকে? যা, গেলি!
ঝুঁটিটা একবার খাড়া করে নামিয়ে নিল কিকো, ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, চোপরাও! একদম চুপ! কোনও কথা শুনতে চাই না আমি! যাও, হাত-মুখ ধুয়ে এসো!
তুই যা!
রাগী কুকুরের গর্জন ছাড়ল এবার কিকো। ছিটকে সরে গিয়ে দেয়ালের গায়ে সেঁটে দাঁড়াল ওয়েনস্টেইন।
এমনি সময় একপাশের সরু, ঢালু গর্ত দিয়ে বড়সড়, রঙচঙে ঠোঁট নিয়ে নেমে এল একটা পাফিন। ভিতরে মানুষ দেখে কর্কশ, গম্ভীর গলায় আপত্তি জানাল, অরররররর! অ-অ! ককক!
চমকে ওইদিকে ফিরেই চক্ষুস্থির হয়ে গেল প্রফেসরের।
যাহ! যাহ! শূ! তাড়াবার চেষ্টা করল সে ওটাকে।
পাফিনটা যখন ঢাল বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে, গর্তের কিনার থেকে কিকেও ডেকে উঠল: অরররররর! অ-অ! ককক!
এসব কী পাগলামি শুরু হলো? এরাই পাগল, না কি আমিই পাগল হয়ে গেছি? একেবারে ভেঙে পড়ল পক্ষিপ্রেমিক।
উপরে চারমাথা এক করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছে তখন ওরা চারজন।
একে নিয়ে এখন কী করা? জানতে চাইল রবিন। এখানেই ফেলে রেখে যাব? কথাবার্তা তো আপনভোলা প্রফেসরের মতই লাগছে অনেকটা।
ওটা অভিনয়, বলল মুসা। অরনিথলজির কিছু জানে না ও! জানলে নিরীহ একটা পাফিনকে দেখে ভয় পেয়ে যা-যা করে তাড়ায়? কপাল ভালো যে। অস্ত্র নিয়ে আসেনি, তা হলে এতক্ষণে কাবু করে ফেলত আমাদের।
কিশোর কী বলে শুনবার জন্য ওর মুখের দিকে চাইল সবাই।
বোটটা সীগালের চেয়ে খানিকটা ছোট হলেও এটার ক্যাবিনে আমাদের চারজনের জায়গা হয়ে যাবে, বলল কিশোর। কয়েক দিনের আন্দাজ খাবারও নেয়া যাবে সঙ্গে।
মুসা জিজ্ঞেস করল, দাডের সুবিধে রয়েছে এতে? প্রয়োজনে ইঞ্জিন বন্ধ করে দাঁড় বেয়ে নিঃশব্দে চলতে পারব আমরা?
পারব। দুই জোড়া দাঁড় দেখলাম পাটাতনে।
ঠিক আছে, বলল রবিন। বোট এখন আমাদের দখলে। ইচ্ছে করলেই এই দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে পারি আমরা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যাব কোথায়? সাহায্যের আশায় আর-কোনও দ্বীপে? সোজা কার্পেন্টেরিয়ায়? নাকি প্রথমে নিজেরাই চেষ্টা করব আঙ্কেলকে উদ্ধার করার?
যা-ই করি, তাড়াতাড়ি করতে হবে, বলল জিনা। এই লোকটা ফিরে না গেলে শীঘ্রি অন্য বোট নিয়ে আসবে আরও লোক।
ঠিক, মন্তব্য করল কিশোর। হাতে সময় বেশি নেই। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের। কার কী মত বলে ফেলো জলদি।
তোমার মতামত শুনি আগে, বলল মুসা।
আমি আগে আঙ্কেলকে উদ্ধার করতে চাই, যদি সম্ভব হয়, স্পষ্ট ভাষায়। জানাল কিশোর। এমনিতেই দেরি হয়েছে অনেক, আরও দেরি হলে খারাপ। কিছু ঘটে যেতে পারে ওঁর কপালে।
আমারও তাই মত, একসঙ্গে বলে উঠল বাকি তিনজন।
ব্যস, সিদ্ধান্ত তা হলে হয়ে গেল। এবার হাতের কাজগুলো ভাগ করে নিয়ে সেরে ফেলা যাক, বলল কিশোর।
কিন্তু কাজ ভাগ করবার আগেই চেঁচিয়ে উঠল বন্দি। খালি কথা, কথা আর কথা! খিদেয় মরে যাচ্ছি আমি, পিপাসাও লেগেছে। তোমরা কি আমাকে না-খাইয়ে মারবে, না কিছু খেতে-টেতে দেবে? যা করবে জানিয়ে দাও সাফ সাফ!
না-খাইয়ে মারাই উচিত ছিল, বলল মুসা। তবে আমরা যেহেতু আপনাদের মত অমানুষ নই, দেব খেতে।
তিনটে টিন খলে গর্ত দিয়ে নামিয়ে দিল জিনা। বেশ কিছু বিস্কিটও দেওয়া হলো, আর এক বালতি পানি। গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল ছদ্মবেশী প্রফেসর। লোকটার খাওয়া দেখে বাকি সবারও খিদে লেগে গেল। রবিন আর জিনা গিয়ে আগাছা সরিয়ে হাতের কাছে যা পাওয়া গেল, কোনও বাছ-বিচার না করে দশ-বারোটা টিন নিয়ে এল। তবে ক্যান ওপেন করে একের পর এক লোভনীয় খাবারই বেরোতে শুরু করল।
