কেন? তোমারটায় চড়ে! মনে মনে বলল মুসা। মুখে বলল, সাবধান! পাফিনের খোঁড়া অসংখ্য গর্ত রয়েছে কিন্তু এখানে। বেকায়দা পা পড়লে মচকে যেতে পারে।
আরে, সর্বনাশ! কত পাখি! দাঁড়িয়ে পড়ল ওয়েনস্টেইন। জীবনেও তো এত পাফিন একসঙ্গে দেখিনি আমি! অসাধারণ, সিম্পলি অসাধারণ একটা দৃশ্য! পাহাড়ের ওপরও দেখছি হাজার হাজার রয়েছে হরেক জাতের পাখি! দারুণ ব্যাপার তো! আচ্ছা, সত্যিই কি তোমাদের পোষা পাফিন আছে?
হ্যাঁ। সাগর থেকে মাছ ধরে এনে খেতে দেয় আমাদের, বলল মুসা। গর্তের কাছে চলে এসেছে এবার ওরা।
বলো কী! থমকে দাঁড়াল ওয়েনস্টেইন, তার দুই চোখে অবিশ্বাস। এ-ও কি সম্ভব?
ভয়ে ধুকধুক করছে জিনার বুক। মুসার ল্যাঙ খেয়ে যদি লোকটা গর্তে না পড়ে? যদি তেড়ে মারতে ওঠে ওদের? কিংবা পকেট থেকে রিভলভার বের করে? লোকটার হাফপ্যান্টের পকেট তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে লক্ষ করল ও। কিন্তু হাবিজাবি ভরা প্যান্টের পকেট এমনই ফুলে আছে যে বোঝা গেল না কিছু। ইশারায় ওকে একটু পিছিয়ে থাকতে বলল মুসা। দুই পা পিছিয়ে গেল জিনা।
হ্যাঁ, বলল মুসা। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পা বাড়াল সামনে। চলুন, এক্ষুনি দেখাচ্ছি আপনাকে।
গর্তের পাশে চিহ্ন হিসাবে ওরা যে ছোট্ট খুঁটিটা গেড়ে রেখেছিল, সেটাতে হোঁচট খেল ওয়েনস্টেইন, আর ঠিক সময় বুঝেই ল্যাঙ মারল তাকে মুসা। হুড়মুড় করে গর্তের পাশে পড়ল পক্ষিপ্রেমিক। একটুও দেরি না করে, সামলে উঠবার আগেই ঠেলা দিয়ে গর্তে ফেলে দিল তাকে মুসা। ধুপ করে শব্দ হলো, ককিয়ে উঠল ওয়েনস্টাইন, বাবা রে!
হিদারের ঝোপে লুকিয়ে রাখা লাঠিটা তুলে নিল এবার মুসা। ঝোঁপ। সরিয়ে নীচে তাকাল। আবছা আঁধারে বসে আছে প্রফেসর টমাস আর. ওয়েনস্টেইন। চোখ তুলে মুসাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, পাজি ছেলে কোথাকার! ধাক্কা দিলে যে? এর মানে কী?
মুসা দেখল, আছাড় খেয়ে সানগ্লাসটা ছিটকে চলে গেছে কোনদিকে। চোখ দুটো দেখে তেমন ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে না আর। ব্যথা পেয়েছে মানুষটা, এক হাতে মাথার একপাশ ডলছে। চেহারায় ভীত-সন্ত্রস্ত, উদ্ভ্রান্ত একটা ভাব।
দুঃখিত, বলল মুসা। তবে এটা না করে আমাদের আর কোনও উপায় ছিল না, ডক্টর আইনস্টাইন। আমাদের ধরতে এসে নিজেই ধরা পড়েছেন, ব্যস, মামলা খতম। এখন আর ভান করে কোনও লাভ হবে না, জনাব। আমরা ভালো করেই জানি কোন বদমাশদের দলে কাজ করছেন আপনি।
কী বকছ আবোল-তাবোল? উঠে দাঁড়াল ওয়েনস্টেইন গর্তের ভিতর। মাথাটা দেখা যাচ্ছে কেবল। সঙ্গে সঙ্গে মাথার উপর লাঠি তুলল মুসা।
খবরদার! বসে পড়েন নীচে! হিংস্র ভঙ্গিতে ধমক দিল ও। নইলে এক বাড়িতে ছাতু করে দেব মাথাটা! আঙ্কেল ডিককে ধরে নিয়ে গেছেন আপনারা-অস্বীকার করতে পারবেন? এবার আমরা ধরেছি আপনাকে। ওঠার চেষ্টা করেই দেখেন না একবার কী করি!মারের ভঙ্গি করল ও এবার।
চট করে বসে পড়ল ভীত-সন্ত্রস্ত ওয়েনস্টেইন।
সত্যিই মারবে তুমি? জিজ্ঞেস করল জিনা। গলাটা কাঁপছে।
একশো বার! বলল মুসা। আঙ্কেল ডিকের কথা চিন্তা করো, চিন্তা করো কীভাবে চুরমার করেছে ওরা আমাদের সীগাল। আমরা আটকা পড়েছি এখানে, কার বা কাদের জন্যে? একে এখন ছেড়ে দিলে কী ঘটবে জানো না? বিশজন লোক নিয়ে ফিরে আসবে আবার। দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিয়ো না একটুও।
অ্যাই, শোনো, এদিকে তাকাও, মুসার বক্তব্য শেষ হতেই চেঁচিয়ে উঠল। ওয়েনস্টেইন। ঘটনাটা কী খুলে বলবে? কী সব প্রলাপ বকছ তোমরা? পাখির দ্বীপে পাখি দেখতে আসা নিশ্চয়ই অপরাধ বা বে-আইনি কিছু নয়? তোমরা দুই ছোঁড়াছুঁড়ি ভুলিয়ে-ভালিয়ে এখানে এনে আমাকে ল্যাঙ মেরে গর্তে ফেলেছ। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছি আমি। এখন বলছ এখান থেকে বের হতে চেষ্টা করলেই মেরে মাথা ফাটাবে! এরকম জঘন্য ছেলেমেয়ে আমি তো জীবনেও দেখিনি!
দুঃখিত, বলল মুসা। এ ছাড়া আমাদের আর কী করবার ছিল? বুঝতেই পারছেন, আপনারা আমাদের মোটর-বোটটা নষ্ট করেছেন, ধরে নিয়ে গেছেন আমাদের গার্জেন আঙ্কেল ডিককে এখন একটা বোট আমাদের খুবই দরকার। বাকি জীবন তো আমরা এখানে থেকে যেতে পারি না!
কথা শুনে বিস্ময়ে এতই বিমূঢ় হয়ে পড়ল যে আধ মিনিট হাঁ করে চেয়ে রইল লোকটা মুসার মুখের দিকে। তারপর লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। পরমুহূর্তে বসে পড়ল আবার মুসাকে লাঠি তুলতে দেখে। ওখান থেকেই গলা ফাটিয়ে চেঁচাল, অ্যাই, শোনো! তোমরা কি সত্যিই আমার বোট নিয়ে চলে যাচ্ছ? এমন বাড়াবাড়ির কথা জীবনে শুনিনি আমি আর! দাঁড়াও, তোমাদের গার্জেনকে একবার পেয়ে নিই! তাকে দিয়ে তোমাদের পিঠের ছাল তুলিয়ে ছাড়ব আমি!
দশ
জিনা, বলল মুসা। আমি তো নড়তে পারছি না এখান থেকে। কিশোর আর রবিনকে খবরটা যে দিতে হয়!
আমি গিয়ে ডেকে আনছি, বলে উঠে দাঁড়াল জিনা।
দৌড়ে চলে গেল সে গোপন চ্যানেলের উদ্দেশে। একটু পরেই ফিরে এল ওদের নিয়ে। ঘটনার মোটামুটি বর্ণনা দেওয়া হয়ে গেছে আগেই। গর্তের মুখে এসে দাঁড়াল সবাই।
কী পরিচয় দিচ্ছে নিজের? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
পক্ষিবিশারদ! বলল মুসা। অ্যালবার্ট আইনস্টাইন…
সত্যিই?
না, সত্যি না! গর্জন ভেসে এল মাটির নীচ থেকে। আমি টমাস রবসন ওয়েনস্টেইন। দয়া করে নামটা মনে রাখার চেষ্টা করো, বে-আদব ছোকরা! এমন অসভ্য ছেলেপিলে জীবনে দেখিনি আমি! দাঁড়াও, নালিশ করলে টের পাবে বেত কাকে বলে!
