সোজা ছুটবে সাগরের দিকে। তারপর রাত হয়ে গেলে ইঞ্জিন বন্ধ করে। ফিরে আসবে চুপি চুপি। আমরা খুঁজে নেব তোমাদের। তবে এসবের কোনও দরকার পড়বে না, ঠিকই ব্যাটাকে ঢোকাব আমি গর্তে। এ-নিয়ে তোমরা কোনও দুশ্চিন্তা কোরো না।
এবার ফিরল জিনা মুসার দিকে। আমার কী করতে হবে?
তোমার বিশেষ কিছুই করতে হবে না। সঙ্গে মেয়ে দেখলে আমার সব কথা বিশ্বাস করবে ও। তুমি খালি সায় দেবে আমার কথায়, আর ওর প্রতিটি কথা বিশ্বাস করছ, এরকম ভান করবে।
হিংস্র হয়ে উঠবে না তো?
আরে, না। ও যে কত নিরীহ তা-ই প্রমাণ করার জন্যে ব্যস্ত থাকবে। খুব সম্ভব নিজেকে প্রকৃতিবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দেবে। ও যত মিথ্যা বলবে, আমরাও বলব ততই।
বেশ কাছে চলে এসেছে কিন্তু, বলল কিশোর। লোক ওই এক জনই। সানগ্লাস পরে আছে রোদ থেকে বাঁচার জন্যে।
আরে, নাহ! বলল জিনা। ভয়ঙ্কর চোখ দুটো আড়াল করবার জন্যে। ব্যাটা সোজা এগোচ্ছে সীগাল যেখানে রাখা ছিল সেই গোপন চ্যানেলের দিকে। শত্রুপক্ষের লোক না হয়েই যায় না! আমরা কি বেরোব আড়াল থেকে?
হ্যাঁ, তোমরা দুজন। পাগলের মত হাত নাড়বে ওর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে।
উঠে পড়ল মুসা আর জিনা। ধোয়ার পাশে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল লোকটার উদ্দেশে। এইদিকেই তাকিয়ে ছিল লোকটা, হাত নেড়ে সাড়া দিয়ে চলে গেল গোপন চ্যানেলের দিকে। বোঝা গেল খুব ভালো করেই জানে সে এই দ্বীপে কোথায় নোঙর ফেলতে হবে।
ধীরে-সুস্থে পাথরের আড়ালে আড়ালে রওনা হয়ে গেল কিশোর ও রবিন কিকোকে নিয়ে। কিছুটা ঘুরপথে যেতে হবে ওদের, তবে লোকটার চোখের আড়ালে যে থাকতে পারবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
বোট বেঁধে রেখে লোকটা উপত্যকায় নেমে আসছে দেখতে পেয়ে মুসা আর জিনাও নামতে শুরু করল পাহাড় থেকে।
পা কাঁপছে আমার, বলল জিনা। মনে হচ্ছে অবশ হয়ে গেছে হাঁটুজোড়া।
একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে, বলল মুসা। ভয় লাগলে কথা বোলো না, যা বলার আমিই বলব।
উপত্যকা পেরিয়ে মুসা আর জিনার কাছে চলে এল মাঝারি উচ্চতার বঁটার কাঠির মত চিকন লোকটা। হাড়গিলে চেহারা, একটা হাফপ্যান্ট আর পুলওভার পরনে-দেখলেই বোঝা যায়, বদরাগী। হাত-মুখ আর সরু পা-দুটো রোদে পোড়া। চিবুকে অল্প কয়েকটা বেমানান কাঁচা-পাকা দাড়ি। উঁচু কপাল বাড়তে বাড়তে মাথার অর্ধেকটা দখল করে নিয়েছে, চুল শুরু হয়েছে তার পর থেকে।
হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো! হাসিখুশি অমায়িক ভঙ্গিতে শুরু করল লোকটা এই দ্বীপে মানুষ আছে জানতে পেরে একেবারে তাজ্জব হয়ে গেছি!
কে জানাল আপনাকে? জিজ্ঞেস করল মুসা।
কেউ না। ধোয়া দেখে টের পেলাম। কী করছ তোমরা এখানে? পিকনিক, এক্সকারশন, না কি আর কিছু?
তা বলতে পারেন, বলল মুসা! সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেল। আপনি এসেছেন কেন?
আমি একজন অরনিথলজিস্ট, বলল লোকটা, চোখ পাকিয়ে ভয় দেখাবার ভঙ্গিতে। এর মানে অবশ্য তোমাদের জানার কথা নয়।
মনে মনে হাসল মুসা। ব্যাটা, চাপা মারার জায়গা পাও না। মুখে বলল, অরনি-ওরনি-ওমনিবায়োলজিস্ট? কী সেটা?
মূঢ় মুসার অজ্ঞতায় হাসল আগন্তুক। বলল, এর মানে, পাখিদের জীবনবৃত্তান্তের চর্চা। পক্ষিপ্রেমিকও বলতে পার। যারা পাখি ভালোবাসে, পাখির অভ্যাস ও আচরণ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে। বুঝেছ? পাখি সংক্রান্ত বিদ্যা বলতে পার একে।
তা হলে এইজন্যেই এসেছেন আপনি এখানে? জিজ্ঞেস করল জিনা। পাখিদের আচার-আচরণ সম্পর্কে জানতে?
হ্যাঁ। অনেক বছর আগেও একবার এসেছিলাম, তখন আমি ছাত্র। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সুযোগ পেলে আবার আসব একদিন। তোমাদের ধোয়া দেখে অবাক হয়ে দেখতে এসেছি। তা আগুন কীজন্যে? খেলছিলে? জাহাজডুবিতে বিপন্ন নাবিক?
আবারও এড়িয়ে গেল মুসা লোকটার প্রশ্ন। কৌতূহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, নিশ্চয়ই অনেক-অনেক কিছু জানেন আপনি পাখি সম্পর্কে?
না, মানে, সামুদ্রিক পাখি সম্পর্কে আমি খুব বেশি জানি না, সবিনয়ে বলল পক্ষিবিশারদ। তবে জানব। সেজন্যেই এতদিন পর এসেছি আবার। ডাঙার পাখি সম্পর্কে বলা যায় যৎসামান্য কিছুটা জানি।
ব্যাটা ভয় পেয়েছে, ভাবল মুসা। ধোকাবাজ! রবিন থাকলে এখন পাখি সম্পর্কে প্রশ্ন করে ব্যাটার দুই কান দিয়ে ধোয়া বের করে দিতে পারত।
আমাদের দুটো পোষা পাফিন আছে, বলল জিনা হঠাৎ। দেখবেন ওগুলো?
তাই নাকি? কী বললে, পোষা পাফিন? নিশ্চয়ই দেখব, নিশ্চয়ই দেখব। একগাল হাসি নিয়ে জিনার দিকে চাইল পাখি-বিজ্ঞানী। এতক্ষণে যেন খেয়াল হলো নিজের পরিচয় দেওয়া হয়নি। বলল, ভালো কথা, আমার নাম ওয়েনস্টেইন-প্রফেসর টমাস আর, ওয়েনস্টেইন। তোমাদের?
ওর নাম জিনা পার্কার, আর আমি মুসা আমান। পাফিন দুটো সত্যিই দেখবেন আপনি, মিস্টার আইনস্টাইন? তা হলে এইদিকে যেতে হবে। গর্তের দিকে হাঁটতে শুরু করল মুসা।
আইনস্টাইন নয়, প্রফেসর ওয়েনস্টেইন। চলো, কিন্তু তার আগে তোমাদের গাইড বা গার্জেন হিসেবে যিনি এসেছেন, তার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলে ভালো হোত, আপনভোলা একটা ভঙ্গি ওয়েনস্টেইনের। ভালো। কথা, তোমাদের বোট যে দেখলাম না কোথাও?
বোটটা ঝড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, বলল মুসা। মনে মনে বলল, ন্যাকা! জানো না কিছু!
তাই বুঝি? সেজন্যেই নোঙর ফেলতে গিয়ে ছেঁড়া দড়িদড়া আর কাঠের টুকরো দেখলাম? আহ-হা! কী ভয়ঙ্কর! তা হলে তোমরা বাড়ি ফিরবে কী করে?
