হাসতে হাসতে পেট ফাটবার উপক্রম হলো ওদের সবার। প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভাগিয়ে দিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে ক্লাউনের মত দুলে-দুলে পাশে হেঁটে মুসার দিকে চলল কিকো, মুখে কপচে চলেছে, আহা রে, কিকো! আহা রে, কিকো! ব্যাড বয়, নটি বয়!
মুসা ছোট একটা মাংসের টুকরো দিতেই ওটা মুখে পুরে ওর কাঁধে চড়ে বসল কিকো। ওখান থেকে গর্বিত দৃষ্টিতে দেখছে সখা-সখিকে। ওদের উদ্দেশে বলল, অরররররর!
হয়েছে, কিকো, বলল মুসা। আমার কানের কাছে অরররর করতে হবে না।
রাতে কি আমাদের গর্তে ঢুকতে হবে, না কি বাইরে ঘুমাতে পারব? জিজ্ঞেস করল জিনা। মানে, রাতে কোনও বিপদের ভয় আছে?
মনে হয় না, বলল কিশোর। দিনেই পায়নি খুঁজে, রাতে কি আবার ওরা। আসবে এই ভূতুড়ে দ্বীপে? তবে গর্তের কাছাকাছিই আমাদের থাকতে হবে, বিপদ দেখলে যেন চট করে ঢুকে পড়তে পারি।
লোকদুটোর চেহারা দেখতে পারলে হোত, বলল রবিন। গলার আওয়াজ আমার একটুও ভালো লাগেনি। শুনলেই বোঝা যায় বদমাশ লোক।
আমাদের সবারই হাতের কাছে একটা করে লাঠি রাখা দরকার, বলল মুসা। তারপর চলে গেল অন্য প্রসঙ্গে। আগুন তো নিভিয়ে দিয়ে গেছে। আমরা কি আজই আবার জ্বালব?
কাল, জবাব দিল কিশোর।
আগুন জ্বাললেই ওরা কিন্তু পরিষ্কার বুঝে নেবে, কেউ না কেউ এ-দ্বীপে আছেই, প্রশ্ন তুলল জিনা। আমাদের জন্যে রিস্কি হয়ে যাবে না ব্যাপারটা?
তা হবে, মেনে নিল কিশোর। তবে এ-ছাড়া আর কোনও উপায়ও নেই আমাদের। কারও মনোযোগ আকর্ষণের একমাত্র উপায় আগুন আর ধোয়া। আমাদেরকে যদি কেউ উদ্ধার করতে আসে, আঙ্কেল ডিকও উদ্ধার পাবেন। শুধু আমাদেরই নয়, আগুনটা আঙ্কেলেরও একমাত্র ভরসা। ওটা আমরা চালু রাখব।
বেচারা আঙ্কেল, বলল জিনা। উধাও হতে চেয়েছিলেন, তা-ই হয়েছেন।
নয়
পরদিন আবার জ্বলল আগুন। ওই আগুনেই সখা-সখির আনা মাছ ভাজা করবার ব্যবস্থা করল জিনা। দিনে তিনবার কিশোরের জন্য মাছ ধরে আনে ওরা ঠোঁটে করে। চমৎকার লাগে পাহাড়ের উপর খোলা আকাশের নীচে বসে টাটকা মাছ ভাজা করে খেতে। নির্বিকার, নিস্পলক চোখে তাকিয়ে ওদের খাওয়া দেখে পাফিন-জোড়া; সাধলে সখা যদি বা এক-আধটা খায়, সখি একদম না।
সারাক্ষণ বিনকিউলার নিয়ে পালা করে সতর্ক পাহারা দেয় রবিন ও মুসা। ডিউটিতে ঢিল নেই, এটা ওদের বাঁচা-মরার প্রশ্ন। সূর্য যখন মাথার উপর, খিদে-খিদে একটা ভাব মাত্র আসতে শুরু করেছে মুসার; এমনি সময়ে ডাকল সে কিশোরকে। বহুদূরে বিন্দুর মত একটা বোট দেখতে পেয়েছে সে।
আরেকটা বোট! কিশোর, আরেকটা বোট আসছে এই দিকে! বিনকিউলার চোখে তুলে কিশোর জিজ্ঞেস করল, ওই আগের বোটটাই নাকি, মুসা?
সেটা না, জবাব দিল মুসা। এটা অন্য একটা মনে হচ্ছে। আসছেও ভিন্ন। দিক থেকে। সেটা অবশ্য চালাকি হওয়ারই সম্ভাবনা; আমরা যাতে মনে করি, শত্রু না, বন্ধু আসছে উদ্ধার করতে।
কী করে বুঝব সেটা? জিজ্ঞেস করল জিনা। আবার লুকাব আমরা মাটির। নীচে? যদি ওদিকে এরা না যায়?
বিনকিউলার এগিয়ে দিল কিশোর জিনার দিকে। মুসার দিকে ফিরে বলল, একজন আসছে এবার, মুসা। আমাদের খুঁজতে যদি নামে, কোথাও নোঙর ফেলতেই হবে ওকে, তখন খুব সহজেই বোটটা দখল করে নিতে পারি। আমরা। তুমি কী বলো?
আরে, তাইতো! চমকে গেল মুসা। ছোট হলেও আমাদের চারজনের সুন্দর জায়গা হয়ে যাবে ওতে। গুড আইডিয়া!
দখল করবে? অবাক হয়ে গেল রবিন। কীভাবে?
সেটা পরে বলছি, তার আগে ভেবে দেখা যাক, এটা কি আমাদের উদ্ধার করতে আসছে? কী মনে হয়, মুসা?
না। সাফ জবাব দিল মুসা। যারা জানে আমরা এখানে চার-পাঁচজন আছি, তারা আমাদের উদ্ধার করবার জন্যে এত ছোট মোটর-বোট পাঠাতেই পারে না। এটা আমাদের মিত্র বোট নয়। শত্রুপক্ষের চালাকি ছাড়া কিছু না।
হ্যাঁ, বলল কিশোর, আমারও তাই ধারণা। চাপের মুখে আঙ্কেল যদি বলে দিয়ে থাকেন চারটে কিশোর ছেলেমেয়ে আছে এই দ্বীপে, ওদের ধরবার জন্যে একজন আসবে এখানে বন্ধুবেশে, নিরাপদ কোথাও নিয়ে যাওয়ার নাম। করে ধরে নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রাখবে আঙ্কেলের সঙ্গে।
আমরা নিশ্চয়ই ওর সঙ্গে কোথাও যাচ্ছি না? বলল জিনা।
না, মাথা নাড়ল কিশোর। প্ল্যানটা বলছি, দেখো তোমাদের পছন্দ হয় কি না। মুসা আর আমি লুকিয়ে থাকব এখানেই, রবিন আর জিনা যাবে ওর সঙ্গে দেখা করতে।
তারপর? ভয়ে বিস্ফারিত হয়ে গেল জিনার দুই চোখ।
তারপর তোমরা কায়দা করে লোকটাকে নিয়ে গিয়ে ফেলবে মুসার গর্তে। ওখানেই অনেকগুলো খাবারের টিন দিয়ে ওকে বন্দি করে রেখে ওর বোট নিয়ে আমরা পগার পার হয়ে যেতে পারি।
প্ল্যানটা হজম করবার জন্য অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল বাকি তিনজন। কিন্তু…কিন্তু ওকে আমি গর্তে ফেলব কী করে! আপত্তি তুলল রবিন। আমি বললেই বা ও ওখানে নামবে কেন?
না, বললে নামবে না, হাসল মুসা। ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে গর্তের কাছে। নিয়ে যেতে হবে, তারপর পায়ে পা বাধিয়ে একটা ল্যাঙ, প্রয়োজনে সামান্য একটু ধাক্কা–এটুকু পারবে না? পানির মতন সহজ কাজ!
সহজ কাজটা তুমিই করো না, বলল রবিন। আমি বরং কিশোরের সঙ্গে কঠিন কাজগুলো করি। মুসাকে বিনা দ্বিধায় মাথা কাত করতে দেখে বলল, কিন্তু, ধরো, ওকে গর্তে ঢোকাতে পারলে না, তখন কী হবে? মোটর-বোট নিয়ে কী করব আমরা?
