তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল ওরা সখা-সখির ঠোঁটের দিকে। কিকোকে দেখতে পাচ্ছে না ওরা।
অবিশ্বাস্য, তাই না? বলল ল। এখানে এই দ্বীপে কে কথা শেখাবে ওদের?
ঠোঁট ফাঁক করল সখা, নিচু গলায় বলল, অররররররর!
ওইদ্দ্যাখো! বলে উঠল গাট্টাগোট্টা। এবার আমি নিজের চোখে দেখেছি। ওরাই কথা বলছে এতক্ষণ ধরে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শেখাল কে ওদের? এই সাগরে…।
বাদ দাও তো! বিরক্ত কণ্ঠে বলল বেঁটে, এদের পেছনে সময় নষ্ট না করে চলো, যে-কাজে এসেছি সেটা সারি। তীর ধরে গোটা দ্বীপ একপাক ঘুরব। আমরা। দুজন দুদিক থেকে। কেউ থাকলে ধরা পড়তেই হবে।
চলো, বলল লম্বু। বোটটা চুরমার হয়ে যাওয়ায় খারাপই লাগছে। আস্ত থাকলে প্রচুর খাবার পাওয়া যেত ওতে।
এমনি সময়ে স্টার্ট নিল একটা মোটর সাইকেল। কিকোর শব্দ-ভাণ্ডারে এটা নতুন সংযোজন। রওনা হতে গিয়েও পাথরের মত জমে গেল দুই আগন্তুক। তাজ্জব হয়ে তাকাল পরস্পরের মুখের দিকে।
কসম খেয়ে বলতে পারি, কাছেই কোথাও স্টার্ট নিয়েছে একটা মোটর বাইক! বলল লম্বু।
আমিও শুনেছি, বলল বাটকু। চলো, চলো এখান থেকে। আমরা আজগুবি আওয়াজ শুনতে শুরু করেছি।
পা চালাল ওরা। অস্পষ্ট হতে হতে দূরে মিলিয়ে গেল লোকদুটোর গলার আওয়াজ। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল জিনা ও তিন গোয়েন্দা।
যেন দিগ্বিজয় করেছে এমনি ভঙ্গিতে ফিরে এল কিকো মুসার কাছে। কাতর কণ্ঠে বলল, বাবারে! গেছি এবার! ইশশ, এত্তো আঁধার! খাইছে!
আর একটু হলেই তো দিয়েছিলি সব ফাঁস করে! আয় এদিকে। আর একটা কথা বলবি তো তোর ঠোঁট বেঁধে দেব আমি রুমাল দিয়ে।
অররররররর! পাফিনের ভাষায় জবাব দিল কিকো। মুসার কাঁধে বসে মাথা লুকাল ডানার নীচে। বকা খেয়ে অভিমান হয়েছে ওর।
অনেক-অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল ওরা মাটির নীচের গর্তে। আর কারও পায়ের বা গলার আওয়াজ পাওয়া গেল না।
আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকতে হবে? ফিসফিস করে জানতে চাইল। জিনা। পায়ে ঝিঁঝি ধরে গেছে আমার।
আর আমার লেগেছে খিদে, বলল মুসা। কিন্তু এখন মাথা বের করলে হাতে-নাতে ধরা পড়ে যেতে পারি। ইশশ! কয়েকটা টিন যদি এখানে এনে রাখতাম!
আরও কিছুক্ষণ গেল। কিশোর সবে ভাবছে, এখন বোধহয় ঝুঁকি নিয়ে উঁকি দেওয়া যায়, এমনি সময়ে দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে এসে মধু বর্ষণ করল ওদের কানে। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়েছে ওরা মোটর-বোটের।
রবিন নড়ে উঠতে যাচ্ছিল, ওর হাতে চাপ দিল কিশোর।
আর পাঁচটা মিনিট যেতে দাও। তারপর মুসাকে ঠেলে তুলব ওপরে। কেউ যদি কাছেপিঠে থাকে, ও একটা হাসি দিলেই দৌড়ে পালাবে।
হেসে উঠল সবাই। একই সঙ্গে সবাই কথা বলতে শুরু করল ওরা, কেউ আর আস্তে বলবার প্রয়োজন বোধ করছে না। বুঝে ফেলেছে, কেটে গেছে। বিপদ।
মোটর-বোটের শব্দ শোনা গেল মিনিট দুয়েক, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল দূরে।
আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কিশোর আর রবিন মিলে মুসাকে ঠেলে তুলল বুক পর্যন্ত। প্রথমে কান পাতল ও, তারপর চারদিকে তাকাল। ধারে কাছে কেউ নেই দেখে ইশারা করল মুসা। আর একটু তোলা হলে নিজেই গর্তের দুপাশে হাত রেখে উঠে পড়ল ও উপরে। উঠেই গড়িয়ে দিল শরীরটা, তারপর দুই কনুইয়ে ভর দিয়ে বিনকিউলার তুলল চোখে।
অনেক দূরে দেখা গেল ফুলস্পীডে ছুটছে মোটর-বোটটা, ক্রমে ছোট হয়ে যাচ্ছে আরও। নিশ্চিন্ত হয়ে গর্তের কাছে মুখ নিয়ে ডাকল সবাইকে মুসা।
চলে এসো। অল ক্লিয়ার।
কিশোর বেরিয়ে আসতেই কাছের একটা গর্তের মুখে অপেক্ষারত সখা ও সখি নড়ে উঠল। হেলেদুলে এগিয়ে এসে ওর গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ও একটু আদর করে দিতেই বর্তে গিয়ে নিজেদের ভাষায় ধন্যবাদ জানাল, অরররররর! অ! ককক!
সবাই চলে এল ঝরনার ধারের আস্তানায়, আগাছা সরিয়ে বেশ কয়েকটা টিন বের করে খোলা হলো। খেতে খেতে গল্প করছে ওরা।
একটুর জন্যে বেঁচে গেছি আমরা, বলল কিশোর।
আমার তো সারাক্ষণ ভয় করছিল, এই বুঝি দড়াম করে ঘাড়ের ওপর পড়ে ওদের একটা! বলল রবিন।
আর হঠাৎ হাঁটুর ওপর দেশলাইয়ের গরম ছ্যাকা খেয়ে আমি চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও কী করে যে সামলেছি নিজেকে!
আর আমাদের কিকো মিয়া তো আর একটু হলেই মহা বিপদে ফেলতে যাচ্ছিল সবাইকে, বলল মুসা। ছি, কিকো, লজ্জায় মাথা কাটা গেছে আমার! শত্রুদের সঙ্গে গল্প জুড়লি তুই কোন্ আক্কেলে?
সরে গেল কিকো।
পিছন ফিরে গোমড়া মুখে কেমন গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখো! হাসতে হাসতে বলল জিনা। গোস্সা হয়েছে!
মুচকি হেসে কিশোরের পাশে বসা সখা-সখিকে ডাকল মুসা আদর করে। এই যে, স-খা! স-খি! লক্ষ্মী ছেলে! আমার কাছ থেকে একটু খাবে না? এসো তো, এদিকে এসো।
ঘাড়টা সামান্য একটু ফিরিয়ে কটমট করে Tইল কিকো সখার দিকে। কিন্তু ও হেলেদুলে এগিয়ে এসে মুসার হাত থেকে একটুকরো মাংস নিতে যাচ্ছে দেখে আর সহ্য করতে পারল না।
ব্যাড বয়, ব্যাড বয়, নটি বয়! চেঁচিয়ে উঠল সে। বেচারা কিকো, আহা। রে বেচারা কিকো! ব্যাড বয়, নটি বয়!
ধমকে নিরস্ত করা যাচ্ছে না দেখে বিকট এক চিৎকার ছেড়ে তেড়ে গেল সে বে-আদবটার দিকে। কাছে গিয়েই ঠোকর দিল সে সখার মাথায়। সখা পাল্টা তেড়ে উঠতেই পিছিয়ে গেল দুই পা, তারপর গলা ফুলিয়ে টানেলে ঢোকা রেল-ইঞ্জিনের বিকট আওয়াজ ছাড়ল। এক দৌড়ে কিশোরের পাশে চলে গেল সখা-সখি। ওখান থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে কিকোর দিকে, কিকো এক পা এগোলে ছুটে গিয়ে ঢুকবে নিজেদের গর্তে।
