কতদূর? মুসাকে হন্তদন্ত হয়ে এদিকে আসতে দেখেই জিজ্ঞেস করল কিশোর। পৌঁছবে কতক্ষণে?
মিনিট দশেক, বলল মুসা।
উঠে দাঁড়িয়েছে সবাই। গোসল করে পরবে বলে কিছু কাপড় রাখা ছিল কার্নিশের তলায়, ওগুলো বগলদাবা করেই ছুটল ওরা মাটির নীচে গর্তে লুকাবে বলে। ছুটতে ছুটতেই রবিন জিজ্ঞেস করল, আগুন? জ্বলতেই থাকবে?
জ্বলুক, বলল কিশোর। ওটার ধোয়া দেখেই তো আসছে।
আগাছা সরিয়ে জামা-কাপড় ফেলা হলো প্রথমে। রুমালটা খুলে নিয়ে একটা লাঠি পুঁতেছিল মুসা গর্তটা চিনতে সুবিধে হবে বলে, সেই লাঠিও তুলে নিয়ে লুকিয়ে ফেলা হলো হিদার ঝোঁপের নীচে। এই কদিন যেখানে ঘুমিয়েছে তার নীচের হিদার চ্যাপ্টা হয়ে রয়েছে দেখে সেটা ঠিকঠাক করল কিশোর। তারপর চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে সবার শেষে নেমে গেল গর্তে। মুসাকে দুজন মিলে তুলে ধরতেই ও যত্নের সঙ্গে চারপাশ থেকে আগাছা টেনে ঢেকে দিল গর্তের মুখ।
অপেক্ষা করছে ওরা। ধড়াস-ধড়াস লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ড ওদের বুকের ভিতর।
ফিসফিস করে কথা বলতে পারব তো? জানতে চাইল জিনা।
কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো, বলল কিশোর। শোনা দরকার এখন আমাদের। কাছে পিঠে কেউ এলে সবাই কান খাড়া রাখব। ওদের কথা শুনে বুঝতে হবে ওরা শত্রু না মিত্র। মিত্র এসে যদি আমাদের না পেয়ে ফিরে যায়, সেটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হবে।
চুপ হয়ে গেল সবাই। মাঝে মাঝেই শ্বাস চেপে রেখে কান খাড়া করছে।
শ্শ্শ্শ্শ্! ঠোঁটে আঙুল তুলল মুসা। কারা যেন আসছে!
বলতে না বলতেই ওদের পিলে চমকে দিয়ে আগাছা সরিয়ে গর্তে নামল সখা-সখি। আবছা আঁধারে কিশোরকে খুঁজছে।
ইশশ! আর একটু হলেই হার্টফেল করতাম! বলল কিশোর। খবরদার! একটা টু-শব্দ করবি না!
অরররররর! মোটা গলায় বলল সখা।
রেগে গিয়ে ধাক্কা দিল কিশোর ওর গায়ে। অবাক হয়ে সরে গেল সখা। এই প্রথম তার প্রিয় বন্ধুর কাছ থেকে খারাপ ব্যবহার পেল সে। অভিমান করে হেলেদুলে পাফিনের সরু গর্তের দিকে চলল সে, পিছনে সখি। কিশোর ফিরে ডাকল না দেখে গর্ত বেয়ে উঠে গেল ওরা উপরে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সবাই।
আবার কিছু শুনতে পেয়ে ফিসফিস করল মুসা, চু-উ-প! পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি। আসছে এদিকে!
*
একটু পর সবাই শুনতে পেল, এগিয়ে আসছে পায়ের শব্দ। পরমুহূর্তে শোনা গেল গলার আওয়াজ। …গোটা দ্বীপ ভালো মতো খুঁজে দেখতে হবে। আগুন
তো আর আপনিই জ্বলছে না, কেউ না কেউ ইন্ধন জোগাচ্ছে।
কেউ থাকলে অবশ্যই ধরা পড়বে, বলে উঠল আরেকজন। এই ছোট্ট দ্বীপে লুকাবার মত তেমন জায়গা তো দেখি না। পাহাড়ে নেই। আর এই উপত্যকায় তো ওই বিদঘুঁটে পাখিগুলো ছাড়া দেখাই যাচ্ছে আর কেউ নেই।
খশ্শ্ করে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালবার শব্দ শোনা গেল। বোঝা গেল সিগারেট ধরাচ্ছে একজন। কাঠিটা ফেলে দিতেই হিদার ঝোঁপের ফাঁক গলে এসে পড়ল ওটা জিনার হাঁটুর উপর। চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল ও কোনমতে।
একদম কাছে! ভাবছে ওরা। লোকগুলো দাঁড়িয়ে আছে ওদের গোপন গর্তের ঠিক পাশেই!
এই দেখো! আচমকা ভিন্ন স্বরে বলে উঠল ওদের একজন। এটা কী? চকোলেটের মোড়ক না? কাছেই কোথাও লুকিয়েছে ডিক কার্টারের সঙ্গী! খুব কাছেই কোথাও!
একটা হার্টবিট মিস হয়ে গেল মুসার। ওর মনে পড়ল, হাত ফসকে বাতাসে উড়ে গেছিল একটা খোসা, অতটা গুরুত্ব দেয়নি তখন-তাই কুড়িয়ে নেয়নি।
আরে! কিকো গেল কোথায়? কিছুক্ষণ আগে নেমে গেছে ওর কাধ থেকে, মনে আছে, কিন্তু আশপাশে হাত বুলিয়ে কোথাও পেল না ওকে মুসা। ওকে চুপ করে থাকবার ইশারা দেওয়া হয়নি। এখন যদি লোকদুজনের পায়ের নীচ থেকে জোরে কথা বলে ওঠে, ওদের কোনও কথার উত্তর দিয়ে বসে, তা হলেই সর্বনাশ।
কিকোকে পাওয়া যাচ্ছে না, তার কারণ অন্ধকার গর্তে বিরক্তি বোধ করায় সখা-সখির পিছন পিছন সে-ও উঠে গেছে ঢালু গর্ত বেয়ে উপরে। গর্তমুখে গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে আছে স্বামী-স্ত্রী, হলুদ চক্র আঁকা ছোট্ট গোল চোখ মেলে নিষ্পলক চেয়ে রয়েছে এখন বাইরে দাঁড়ানো লোক দুজনের দিকে।
দেখো, দেখো! বলল লম্বা লোকটা। জোকারদুটোকে দেখো কী রকম ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রয়েছে! কী বিটকেলে রঙচঙে ঠোঁট দেখো না! কী নাম এগুলোর?
গাল-গিলিমট-পাফিন! চড়া গলায় বলে উঠল কিকো, যেন জবাব দিচ্ছে প্রশ্নের।
লাফিয়ে উঠল লোক দুজন। বিস্ফারিত চোখে দেখছে পাখি দুটোকে। কিকোকে দেখতে পেল না, কারণ সখা-সখির পিছনে বসে আছে ও, ঠোকর খাওয়ার ভয়ে ওদের ঠেলে বাইরে বেরোবার সাহস হয়নি।
শুনলে? ফিসফিস করে বলল লম্বা লোকটা।
মনে হলো যেন কথা বলল কেউ, উত্তর দিল তার সঙ্গের গাট্টাগোট্টা লোকটা।
পাখি দুটো কথা বলল? লম্বুর গলায় অবিশ্বাস।
কী জানি, অনিশ্চিত কণ্ঠে বলল পাশের জন।
আবার কথা বলে! ধমকে উঠল কিকো কড়কড়ে গলায়, কোনও কথা শুনতে চাই না আমি! অহ-হো, অহ-হো!
রীতিমত আঁতকে উঠল ওরা। চোখে ভয়। আর কোনও সন্দেহ নেই-কথা বলছে গর্তের মুখে বসে থাকা শান্তশিষ্ট পাখি দুটো।
আরে! সত্যিই কথা বলছে! কী করে সম্ভব?
হয়তো শিখিয়েছে কেউ। খুব সম্ভব এগুলোকে পাফিন বা সী প্যারট বা। ওই রকম কিছু বলে।
কী হলো, কথা কানে যায় না? আবার এল কর্কশ কণ্ঠের ধমক। তোমাকে কতবার বলেছি, আমার মুখের ওপর কথা বলবে না! রাগী কুকুরের গর্জন ছাড়ল এবার কিকো।
