ডিক কার্টার বলেছিলেন, শোনো, গোয়েন্দাসকল! মনে করিয়ে দিল জিনা, ছুটি কাটাতে এসেছি আমরা এবার এখানে, গা শিউরানো কোনও রোমহর্ষক রহস্যের খোঁজে নয়। রহস্য-রোমাঞ্চ অনেক হয়েছে। গত তিন তিনবার যখনই আমরা একসঙ্গে হয়েছি, ঘাড়ে চেপে গেছে বিপদ আর ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতা। এইবার অন্তত আমরা ছুটিটা কাটাতে চাই শান্তিতে।
মনে হচ্ছে, মৃদু হেসে বলল রবিন, চতুর্থবারেও জড়িয়ে গেলাম আমরা। গা শিউরানো বিপদ আর রোমহর্ষক কোনও রহস্যের জালে।
আট
আশপাশে শক্র আছে জানি, বলল রবিন। তারপরেও আমরা আগুন জ্বেলে চলেছি কেন? আমরা কি ওদেরও ইনভাইট করছি?
না, বলল কিশোর। উদ্ধার পেতে হলে আমাদের কোনও না কোনও বিপদসঙ্কেত পাঠাতেই হবে। আঙ্কেলের সিগনাল বন্ধ হয়ে গেছে পরশু রাত থেকে। আমাদের খোঁজে ওঁর ডিপার্টমেন্ট থেকে কেউ না কেউ আসবেই, ধোয়া দেখলে বোট ভিড়াবে এই দ্বীপে।
আর শত্রু এসে বোট ভিড়ালে? প্রশ্ন তুলল জিনা, উত্তরটাও নিজেই দিল। আমরা লুকিয়ে থাকব মুসা যেখানে কল্লা হারিয়েছে, সেই গর্তে। কিন্তু…তন্নতন্ন। করে খুঁজবে ওরা গোটা দ্বীপ।
খুঁজবে, তবে অত বেশি না, জবাব দিল কিশোর। কাউকে না দেখলে ধরেই নেবে, আঙ্কেলের লোকজন এসে আগেই উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। আমাদের।
যুক্তিটা পছন্দ হলো সবারই। আতঙ্ক দূর হয়ে গেল সবার মন থেকে। সন্ধে পর্যন্ত ধোয়ার জন্য শ্যাওলা আর সী-পিঙ্ক ফেলল ওরা আগুনে। তারপর ধোয়া যখন আর দেখা যাবে না, তখন আগুনের উপর অনেকগুলো কাঠ চাপিয়ে দিয়ে নেমে এল ওরা ক্যাম্পসাইটে।
খাওয়া-দাওয়া সেরে চলে এল ওরা মুসার গর্তের কাছে। গর্ত থেকে বেশ কিছুটা দূরে ঘন হিদারের উপর গ্রাউন্ডশীট বিছিয়ে শুয়ে পড়ল ওরা খোলা আকাশের নীচে। আকাশ ভরা ঝলমলে তারা, মৃদুমন্দ হাওয়া আর দূর থেকে ভেসে আসা সাগরের শব্দে ভারী হয়ে এল ওদের চোখের পাতা। একটু দেরি করে চাঁদটা যখন উঠল, ওরা তখন গভীর ঘুমে অচেতন।
পরদিন আবহাওয়া আরও সুন্দর। রবিনকে ছবি তুলবার ছুটি দিয়ে আগুনের পরিচর্যায় থাকল কিশোর আর জিনা। উপত্যকায়, পাহাড়ের উপর, ব্যালকনিগুলোতে গিয়ে কাছ থেকে হরেক জাতের পাখির হরেক পোজের ছবি তুলল রবিন মনের সুখে। আর বিনকিউলার নিয়ে মুসা গিয়ে বসে থাকল সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়। দ্বীপের চারপাশের সাগর বহুদূর পর্যন্ত দেখা যাবে ওখান থেকে। এদিকে কোনও বোট আসতে দেখলেই ও সাবধান করবে সবাইকে। যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে লুকিয়ে পড়বার।
আমাদের আস্তানায় কার্নিশের নীচে রাখা টিনগুলো সরিয়ে না ফেললে কেউ এলেই দেখতে পাবে, বলল জিনা।
খুব খাটনির কাজ, বলল কিশোর। ওগুলো না সরিয়ে আগাছা দিয়ে ঢেকে দিলে কেমন হয়?
দি আইডিয়া! বলল জিনা। আমি এখনই গিয়ে ঢেকে রেখে আসছি।
এত সুন্দর করে ঢাকল যে রবিনকে ডিউটিতে বসিয়ে রেখে আস্তানায়। ফিরেই হায়-হায় করে উঠল মুসা।
আরে! আমাদের খাবারের টিনগুলো গেল কোথায়? আর এই আগাছাগুলোই বা এখানে জন্মাল কখন?
কয়েকটা ঝোঁপ সরিয়ে ওকে তলার টিন দেখানো হতেই শত মুখে প্রশংসা করল মুসা জিনার। ওর নাকি মনে হয়েছিল এই আগাছা ওখানে সবসময়েই ছিল, খেয়াল করেনি ও।
বোঝা গেল, ওগুলো কারও চোখে পড়ে যাওয়ার ভয় নেই।
দুই দিন পেরিয়ে গেল কোনও উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছাড়াই। একবার শুধু। প্লেনের আওয়াজ পাওয়া গিয়েছিল, দেখা যায়নি। সীগালের ভাঙা কাঠের টুকরো ভেসে এল আরও অনেকগুলো। ওরা গোসল করছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, যে-যার ডিউটি পালন করছে নিয়ম ধরে। কিকো কাছে কাছে থাকে মুসার, কিশোরের পায়ে পায়ে ঘোরে সখা-সখি।
একবার আরেকটা পাফিন কিশোরের খুব কাছে চলে আসায় পাফিনের লড়াই দেখবার সুযোগ পেয়ে গেল ওরা। অরররররর! ডাক ছেড়ে প্রথমে হুঁশিয়ার করল ওটাকে সখা, তারপরও কথা শুনছে না দেখে রাজহাঁসের ভঙ্গিতে গলা লম্বা করে মাথা নিচু করে ছুটে গেল সে আগন্তুকের দিকে। সেটাও একই ভঙ্গিতে আক্রমণ প্রতিহত করবার প্রস্তুতি নিল। দুজনই কামড়ে ধরল পরস্পরের চঞ্চ, তারপর শুরু হলো পাছড়া-পাছড়ি। মিনিট তিনেক চলল বাঘে-মোষে লড়াই, তারপর হঠাৎ রণে ভঙ্গ দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল সখার প্রতিদ্বন্দ্বী। ফিরে এসে বসল বিজয়ী কিশোরের পাশে, একদৃষ্টে চেয়ে রইল ওর মুখের দিকে।
তৃতীয় দিন দুপুরে দেখা গেল বোট। খাওয়া-দাওয়ার পর পাহাড়ের মাথায় পাহারায় ছিল মুসা। একটু বাতাস উঠেছে আজ। অলস দৃষ্টিতে ঢেউয়ের মাথায় সাদা ফেনা দেখছিল ও একটা পাথরে হেলান দিয়ে বসে। ভাবছিল আঙ্কেলের কথা। কোথায় এখন আঙ্কেল ডিক? শক্রর কবল থেকে পালাতে পেরেছেন? ওদেরকে উদ্ধার করবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এখন? না কি খুন হয়ে গেছেন ওদের হাতে?
হঠাৎ দূর-সাগরে সামান্য নড়াচড়া চোখে পড়ল ওর। মুহূর্তে সোজা হয়ে বসল মুসা। হাতে চলে এসেছে বিনকিউলারটা। চোখে তুলে ফোকাস অ্যাডজাস্ট করতেই পরিষ্কার দেখতে পেল ও বোটটা। ছোট একটা মোটর বোট। সোজা আসছে এই দ্বীপ লক্ষ্য করে।
এতদিনে আসছে শত্রুপক্ষ! ভাবল মুসা। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বসে পড়ল আবার। ওরাও ফিল্ডগ্লাস দিয়ে তাকিয়ে নেই তো এদিকে? আস্তে করে গড়িয়ে নীচের ধাপে নামল ও। মাথা নিচু করে আরও কিছুদূর নেমে বোটটা দৃষ্টিপথ থেকে আড়াল হতেই দৌড় দিল ও কিশোর-রবিন-জিনাকে সাবধান করতে।
