বাইরে থেকে কোনও আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না, বলল কিশোর। মুসা, তোমার কাটা মুণ্ডুটা একটু উঁচু করে দেখো তো বাইরের কী হাল।
গর্ত দিয়ে মাথা তুলেই চেঁচিয়ে উঠল মুসা, কোথায় ঝড়-বৃষ্টি-অন্ধকার? পরিষ্কার নীল আকাশ। চারপাশে ঝলমলে রোদ। চলো, চলো, বেরিয়ে পড়ি!
আগাছা সরিয়ে দিতেই রোদ এসে পড়ল গর্তের ভিতরে। চট করে ঘড়িটা দেখে নিয়ে কিশোর বলল, দশটা বাজে। চলো, দেখা যাক ক্ষয়-ক্ষতি কী হলো।
প্রথমে ঠেলে তোলা হলো মুসাকে, তারপর টেনে তুলল ও একে একে সবাইকে। আগাছাগুলোকে একটু টেনে-টুনে দিতেই অদৃশ্য হয়ে গেল গর্তটা। বাইরে থেকে বুঝবার উপায় নেই কোথায় ওটা। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রবিন বলল, দারুণ একটা লুকাবার জায়গা পাওয়া গেছে তো! থ্যাংকিউ, মুসা! ভাগ্যিস কাল কাটা পড়েছিলে!
সবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সত্যিই! বলল জিনা। শত্রু এলে আমরা এখানে লুকাতে পারব। একটু দ্বিধায় পড়ল ও, কিন্তু লুকাব যে, মুখটা খুঁজে পাব তো? আমি তো এখনই হারিয়ে ফেলেছি জায়গাটা!
আমি হারাইনি, বলল মুসা। দাঁড়াও, চিহ্ন দিয়ে রাখি। একটা ঝোঁপের ডালে সাদা রুমাল বাঁধল ও। বেশ কয়েক গজ দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে রুমালটা। হারালে চলবে না। আমাদের তাঁবুটা যদি খুইয়ে থাকি, তা হলে হয়তো এখন থেকে এখানেই রাত কাটাতে হবে আমাদের। খানিকটা দূরে সরে গিয়ে গোটা উপত্যকার উপর চোখ বুলিয়ে বুঝে নিল গর্তটার সঠিক অবস্থান, তারপর ঘুরে হাঁটা ধরল আস্তানার দিকে।
আগে দুটো ডুব দিয়ে নিলে হোত না? প্রস্তাব পেশ করল রবিন। কাদা মেখে একেবারে নোংরা হয়ে গেছি।
কোনও জবাব না দিয়ে চলতে চলতেই ঘুরে গেল মুসা সাগরের দিকে। কী শান্ত দেখাচ্ছে আজ সাগরটাকে! অথচ গতরাতে বিজলির আলোয় একমুহূর্তের দেখা উত্তাল সাগরের সেই ভয়ঙ্কর ছবিটা জীবনে ভুলতে পারবে না ওরা।
দূর থেকে ওদের দেখে উড়ে চলে এল সখা-সখি। কুশল জিজ্ঞেস করল, অরররররর! অরররররর!
কিশোরের পাশে পানিতে নামল ওরাও। গোসল শেষে নাস্তা খেতে চলল ওদের সঙ্গে। পটেড মিট খুব পছন্দ সখা-সখির।
যেখানে তাঁবু ছিল, সেইখানে এসে বসল ওরা নাস্তা খাওয়ার জন্য। পেয়ালা-বাসন, চামচ, কাটা যেখানে যা ছিল সেইখানেই পাওয়া গেল সব। কার্নিশের নীচে সাজানো খাবারের টিনগুলোও পাওয়া গেল যেটা যেখানে ছিল। শুধু তাঁবুটা নেই।
পেট পুরে খেয়ে নিল ওরা, তারপর লেগে পড়ল কাজে। প্রথম কাজ: ভেজা জামা-কাপড়-বিছানা-চাদর রোদে দিয়ে শুকিয়ে নেওয়া। তবে প্রধান কাজ: চোখ-কান খোলা রাখা। সাগরে কোনও বোট বা আকাশে উড়োজাহাজ দেখলেই গা ঢাকা দিতে হবে ওদের।
ভেজা কাপড় কড়া রোদে শুকাতে দিয়ে আগুনের কী অবস্থা দেখতে গেল ওরা পাহাড়ের মাথায়। নিভে গেছে আগুন, কাঠগুলোও ভেজা। ওগুলোও শুকাবার জন্য ছড়িয়ে দিল ওরা। স্থির হলো, বিকেলে আবার জ্বালা হবে আগুন। তার আগে আরও কিছু কাঠ ও শ্যাওলা সগ্রহ করতে হবে, খুঁজে দেখতে হবে তাঁবুটা, আর দেখে আসতে হবে ওদের বোটের কী অবস্থা।
একে একে সব কাজই সারা হলো। তবুটা পাওয়া গেল না দ্বীপের কোথাও। রবিন বলল, হয়তো মাইলের পর মাইল উড়ে অন্য কোনও দ্বীপে গিয়ে পড়েছে ওটা-ভয়ে পালিয়েছে দ্বীপের সব পাখি। আজ রাতে কি আমরা আবার ওই গর্তে গিয়ে ঢুকব?
আকাশের দিকে চেয়ে মাথা নাড়ল কিশোর। বৃষ্টি আসার কোনও লক্ষণ নেই। গর্তের ভেতর কেমন যেন ভ্যাপসা গরম, আমরা খোলা আকাশের নীচে বিছানা পাতব।
প্রচুর কাঠ নিয়ে গিয়ে তোলা হলো পাহাড়ের মাথায়। জামা-কাপড় শুকিয়ে গেলে ভাজ করে গ্রাউন্ডশীট দিয়ে ঢেকে রাখা হলো। আগুনটা ভালো মত ধরে যেতেই অল্প অল্প করে ভেজা শৈবাল আর সী-পিঙ্ক ছাড়া হলো ওতে। ঘন, সাদা ধোয়া উঠল আকাশের দিকে।
নীল সাগরের উপর চোখ বুলাচ্ছিল রবিন, হঠাৎ বলে উঠল, দেখো তো, মুসা; কী ওটা, পানিতে ভাসছে? এদিকেই আসছে মনে হয়। কাঠ হলে, জ্বালানো যাবে।
জাহাজ ভাঙা মনে হচ্ছে, খালি চোখে দেখে বলল মুসা। তারপর চোখে তুলল বিনকিউলার। গম্ভীর হয়ে গেল ওর চেহারা। বলল, ওটা সীগালের কাঠ, রবিন। আরও অনেকগুলো টুকরো দেখা যাচ্ছে আশপাশে। জোয়ারের ঢেউয়ে ঢেউয়ে এগিয়ে আসছে এদিকে।
একটু আগে খেয়াল করলে আমরা হয়তো বাঁচাতে পারতাম বোটটাকে, বলল কিশোর।
কীভাবে? জিজ্ঞেস করল জিনা। ইঞ্জিনটা তো চুরমার করে দিয়ে গিয়েছিল ওরা?
হয়তো পাল টাঙিয়ে ওটা আমরা সরিয়ে আনতে পারতাম। যাক গে, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন আর কিছু করার নেই।
সন্ধের একটু আগে কান খাড়া করল মুসা।
আবার অ্যারোপ্লেনের শব্দ পাচ্ছি!
কাউকে বলতে হলো না কোনদিকে তাকাতে হবে। সবাই একসঙ্গে ঘুরে গেল পশ্চিমে। রবিন-মুসা দুজনেই বিনকিউলার তাক করল ওই দিকে।
কী একটা ফেলল প্লেনটা। কী ওটা, মুসা? প্যারাশুট?
হ্যাঁ, ছোট একটা প্যারাশুট, বলল মুসা। কী যেন ঝুলছে নীচে, দুলছে এদিক-ওদিক। মানুষ? না। তা হলে কী? ওই জায়গায় কী ফেলছে ওরা প্যারাশুটে ঝুলিয়ে? নিশ্চয়ই ওখানেই কোথাও শত্রুদের আস্তানা। ওরা আমাদের ধোয়া দেখতে পাচ্ছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কালই যদি এখানে সার্চপার্টি পাঠায় আমি অবাক হব না। তুমি কী বলো, প্রধান?
ঠিক। কাল সারাদিন পালা করে পাহারা দিতে হবে, বলল কিশোর।
