যাহ!
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বিছানার উপর বসে থাকল ওরা খোলা আকাশের নীচে। মাথার উপর উড়ন্ত মেঘ ছাড়া কিছু নেই। সই-সাঁই বইছে বাতাস। অঝর বৃষ্টিতে ভিজছে সবকিছু।
সবার আগে বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠল মুসা। টর্চ জ্বেলে দেখল, কার্নিশের নীচে গুহামত জায়গাটাও ভিজছে সমানে।
আর বসে থেকে কী হবে? বলল ও বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে, চলো দেখি পশ্চিম-পাহাড়ে আশ্রয় পাওয়া যায় কি না। কিংবা সীগালে।
মুসার হাতে টর্চ জ্বলে উঠতেই সম্বিত ফিরে পেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে সবাই। ঝটপট গ্রাউন্ডশীট সহ যে-যার বিছানা তুলে নিয়ে চাদরের মত করে গায়ে মাথায় জড়িয়ে নিয়ে ছুটল ওরা মুসার পিছন পিছন। বৃষ্টি তো না, যেন বরফগলা পানি পড়ছে আকাশ থেকে। অল্পক্ষণেই শীতে কাপ ধরে গেল ওদের শরীরে।
মুহুর্মুহুঃ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে বলে টর্চের আলো ফেলবার দরকার পড়ছে না। পাফিন কলোনির উপর দিয়ে সী-পিঙ্ক আর হিদার মাড়িয়ে যত দ্রুত সম্ভব চলেছে ওরা পশ্চিমে। মুসার ঠিক পিছনেই রয়েছে জিনা, ওর চাদরের একটা অংশ খামচে ধরে রেখেছে। হঠাৎ একটা টান অনুভব করল ও। হাত থেকে ছুটে গেল চাদর। হাওয়ার হুঙ্কার ছাপিয়ে অস্পষ্ট একটা আর্তনাদ কানে এল। যেন। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল জিনা।
মুসা! মুসা-আ! কী হলো?
কোনও উত্তর নেই। কিশোর ও রবিন এসে পৌঁছল। কী হয়েছে? মুসা। কোথায়?
কিশোরের হাতে জ্বলে উঠল টর্চ। মুসা নেই সামনে কোথাও। চারপাশে আলো বুলিয়েও দেখা গেল না ওকে। এই ছিল, এই নেই-আচমকা গায়েব হয়ে গেছে মুসা। রবিন ভাবছে, তুফানে উড়িয়ে নিয়ে গেল?
মুসা! মুসা! চেঁচিয়ে ডাকল কিশোর। উত্তরে কানে এল শুধু বাতাসের হাহাকার ধ্বনি। এবারে সবাই মিলে তারস্বরে হাঁক ছাড়ল ওরা মুসার নাম। ধরে।
কিশোরের মনে হলো আবছা ভাবে কানে এল মুসার গলা। কিন্তু কোনদিক থেকে? আবার আওয়াজটা এল, মনে হলো কিশোরের পায়ের কাছ থেকে আলোটা নীচের দিকে ফেলেই ভয়ে আতা উড়ে গেল কিশোরের। সী-পিঙ্ক আর আগাছার মাঝখানে মুসার কল্লাটা পড়ে আছে কেবল, ধড়টা নেই! ভয়ে আঁতকে উঠল জিনা।
দেখা গেল ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হাসছে মুসার কাটা মুণ্ডু। চেঁচিয়ে উঠে দৌড়ে সরে গেল জিনা কয়েক পা। তাই দেখে রবিনও পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। মাথার পাশে বসেই ব্যাপারটা টের পেল কিশোর।
চোট লাগেনি তো, মুসা? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
না। তোমার টর্চটা দাও। আমারটা ছুটে গেছে হাত থেকে। মনে হচ্ছে বেশ বড়সড় একটা গর্তে পড়েছি। দেখি, এখানেই আমাদের সবার জায়গা হয়ে যেতে পারে।
কিশোর হাতের টর্চটা দিল মুসাকে। রবিনের টর্চের আলোয় দেখা গেল অদৃশ্য হয়ে গেছে মুসার কাটা মুণ্ডুটা। একপা-দুইপা করে এগিয়ে এল জিনা ও রবিন। আগাছার ফাঁকে মাটিতে গর্ত দেখে বুঝতে পারল ঘটনাটা কী ঘটেছে। জানে পানি এল এতক্ষণে। হেসে উঠল ওরা স্বস্তি ফিরে পেয়ে।
সী-পিঙ্ক আর আগাছার ফাঁকে আবার দেখা দিল মুসার মুণ্ডু।
হ্যাঁ। বিরাট গর্ত, বলল ও, সবার জায়গা হবে। একে একে নেমে এসো তোমরা।
প্রথমে জিনা, তারপর নামল রবিন। মুসার টর্চটা মাটিতে পড়ে আছে দেখতে পেয়ে ওটা হাতে নিয়ে নামল কিশোর। টর্চের আলোয় গর্তের ভিতর চারপাশ দেখে খুশি হলো সবাই। ঝড় তুফান থেকে বাঁচতে হলে এই জায়গার তুলনা নেই।
মনে হয়, খরগোশ আর পাফিন মিলে তৈরি করেছে এই গর্ত, বলল রবিন। ওই দেখো, কয়েকটা সরু গর্ত দেখা যাচ্ছে পাফিনের, এখান থেকে বেরিয়ে গেছে বাইরের দিকে।
নাহ, বলল মুসা। আগেই এই গর্তটা ছিল। ওরা খুঁড়ে ওপরের মাটি ভুসকা করে রেখেছে বলে পড়ে গেছি। যেভাবেই হোক, একটা আশ্রয় পাওয়া গেছে কপাল গুণে। একফোঁটা বৃষ্টি ঢুকছে না, মনে হয় নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাকে এখানে।
সারাদিনের পরিশ্রমের পর ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে ওরা সবাই। এখানে ঢুকে ঝড়-বৃষ্টি-বজ্র-বিদ্যুচ্চমক মনে হচ্ছে অনেক দূরের কোনও ব্যাপার। হচ্ছে, হোক। মাটিতে বিছানা ফেলে শুয়ে পড়ল ওরা, ঘুমিয়ে পড়তেও দেরি হলো না একটুও।
*
বেঘোরে ঘুমাল ওরা সারাটা রাত। পরদিন বেশ বেলা হয়ে গেল উঠতে মাটির নীচে অন্ধকার বলে টের পায়নি কখন সকাল হয়েছে। তা ছাড়া ক্লান্তও ছিল খুব।
সবার আগে ঘুম ভাঙল জিনার। প্রথম কিছুক্ষণ ও বুঝতেই পারল না কোথায় আছে। সামান্য আলো আসছে মাথার উপরের গর্ত দিয়ে।
অরররররর! নিচু, মোটা গলার আওয়াজ এল। চমকে উঠে বসল জিনা। আবার আওয়াজ হলো, অরররররর! অঅ, ককক!
টর্চ জ্বালল জিনা। দেখা গেল দুটো পাফিন নেমে এসেছে ঢালু গর্ত বেয়ে, ওদেরকে এখানে দেখে অবাক হয়েছে। আলোটা পছন্দ না হওয়ায় চলে গেল ওরা গর্ত বেয়ে উপরে।
গুড মর্নিং, এভরিবডি! বলল মুসা। উঠে বসল বিছানায়। অবশ্য এখন যদি মর্নিং হয় তবেই। বলা যায় না, দুপুরও হতে পারে। যা খিদে লেগেছে!
সবাই উঠে পড়ল ওরা।
ইশ! বলে উঠল জিনা, তবুটা উড়ে যাওয়ায় কী সাঙ্তিক ভয় যে লেগেছিল…
তারচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলে আমার গলাকাটা মুণ্ডু দেখে, বলল মুসা।
হেসে উঠল সবাই।
আমিও, বলল রবিন। বাপ-রে! তুমি ওই বিটকেল হাসিটা না দিলেও পারতে!
আবার হাসল ওরা মুসার সেই হাসিটা কল্পনার চোখে দেখে।
আরে! পড়ে গিয়ে আমি মরি আমার জ্বালায়, আর একেকজন দৌড় দিচ্ছে একেক দিকে! হাসব না তো কী?
